কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার বাকশিমুল গ্রামের ঘুংঘুর নদে সরকারি তহবিলে নির্মিত একটি সেতু ২৮ বছর ধরে জনগণের চলাচলে ব্যবহারযোগ্য নয়। এর মূল কারণ হলো, সেতুটির দুই পাশে কোনো সংযোগ সড়ক নেই। ফলে প্রায় তিন দশক ধরে এটি পড়ে আছে, যা স্থানীয় প্রশাসনের গুরুতর দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেয়।

১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) মাধ্যমে প্রায় ৬০ ফুট দীর্ঘ এই সেতুটি নির্মাণ করা হয়। তবে সেতুটি হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো যানবাহন বা মানুষ নিরাপদে পারাপার হতে পারছে না। জনগণের অর্থব্যয়ে তৈরি এই অবকাঠামো আজও অকার্যকর থাকায় তা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং কর্তৃপক্ষের দীর্ঘস্থায়ী উদাসীনতার এক গুরুতর দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সেতুটি সচল করার জন্য বিশাল কোনো প্রকল্পের প্রয়োজন নেই। পূর্ব পাশে সেতুর গোড়াতেই পাকা সড়ক রয়েছে, আর পশ্চিম পাশে মাত্র প্রায় ২০ ফুট দূরে আরেকটি পাকা সড়ক। অথচ, এই সামান্য সংযোগ সড়কটি তৈরি করতে ২৮ বছর সময় লেগে যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দাদের নিজস্ব উদ্যোগে সেতুর এক পাশে নয়টি সিঁড়ি এবং অন্য পাশে মাটি ও বালুর বস্তা দিয়ে ওঠানামার ব্যবস্থা করতে হয়েছে। শিশু ও বয়স্কদের ঝুঁকি নিয়ে সেতু পার হতে হয়। সরকারি অবকাঠামো যেখানে মানুষের দুর্ভোগ কমানোর কথা, সেখানে তাই দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এলজিইডির সাবেক এক প্রকৌশলীর বক্তব্য অনুযায়ী, সংযোগ সড়কের জন্য নির্ধারিত জায়গা নিয়ে স্থানীয় দুটি পক্ষের মধ্যে মামলা হওয়ায় কাজটি করা সম্ভব হয়নি। যদিও মামলা একটি বাস্তব সমস্যা হতে পারে, কিন্তু ২৮ বছর ধরে সেটি নিষ্পত্তির উদ্যোগ না নেওয়া কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হতে পারে না।

সংশ্লিষ্ট এলজিইডি কর্মকর্তা, উপজেলা প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিদের কাছে প্রশ্ন থাকা উচিত—এত দীর্ঘ সময়ে তাঁরা কী উদ্যোগ নিয়েছেন? মামলার কারণে কাজ বন্ধ থাকলে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলো না কেন? জমির বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য প্রশাসনিক বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলো না কেন?

সরকারি প্রকল্পের ক্ষেত্রে শুধু নির্মাণ শেষ করাই সাফল্য নয়; প্রকল্পটি মানুষের কাজে লাগছে কি না, সেটিই আসল। সেই বিচারে বাকশিমুলের সেতুটি একটি ব্যর্থ প্রকল্পের স্পষ্ট উদাহরণ। অথচ এই ব্যর্থতার জন্য এখন পর্যন্ত কারও জবাবদিহি নিশ্চিত হয়েছে—এমন কোনো তথ্য নেই।

এখন প্রথমেই প্রয়োজন ২৮ বছর ধরে সেতুটি অকার্যকর থাকার কারণ অনুসন্ধানে প্রশাসনিক তদন্ত। জমিসংক্রান্ত মামলার বর্তমান অবস্থা, সংযোগ সড়কের জন্য নির্ধারিত জমি এবং এত বছরে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নেওয়া পদক্ষেপ—সবকিছু পর্যালোচনা করে দায়িত্বে অবহেলার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দুই পাশের সংযোগ সড়ক নির্মাণ ও সেতুর প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে।

জনগণের অর্থে নির্মিত অবকাঠামো বছরের পর বছর অকেজো পড়ে থাকবে আর এর জন্য কেউ দায়ী থাকবেন না—এই সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া জরুরি।