কক্সবাজারের ঈদগাঁও উপজেলার গজালিয়া এলাকায় ঈদগাঁও নদের ওপর নির্মিত একটি বিশাল সেতু সংযোগ সড়ক না থাকায় দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে অকেজো হয়ে পড়ে আছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ৯০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১৩ মিটার প্রস্থের এই সেতুটি নির্মাণ করলেও, এর সাথে প্রয়োজনীয় সংযোগ সড়ক তৈরি না করায় সাধারণ মানুষ এর কোনো সুফল পাচ্ছেন না।

সেতুটি ব্যবহার উপযোগী না হওয়ায় ঈদগড়, বাইশারী ও গর্জনিয়া—এই তিনটি ইউনিয়নের লাখো মানুষের জীবন চরম দুর্ভোগের সম্মুখীন। জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াতের জন্য তাদের দীর্ঘ পথ ঘুরে ঈদগাঁও-ঈদগড়-বাইশারী সড়ক ব্যবহার করতে হচ্ছে। তবে এই বিকল্প পথটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পাহাড় ও বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে নির্মিত ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কে দিনের বেলাতেও বনদস্যুদের উপদ্রব থাকে। প্রায়ই যাত্রীবাহী যানবাহন জিম্মি করে লোকজনকে অপহরণ করে গভীর বনে নিয়ে যাওয়া এবং মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা ঘটে। বনদস্যুদের গুলিতে অনেক মানুষ হতাহত হয়েছেন। এই চরম নিরাপত্তাহীনতার কারণে সন্ধ্যা থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত এই সড়কে যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে।

এমন প্রতিকূল পরিবেশেও প্রতিদিন দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী কাঠের সিঁড়ি বেয়ে সেতুটি অতিক্রম করে ঈদগাঁও এবং রামু সদরের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় যাতায়াত করেন। বৃষ্টির দিনে এই কাঠের সিঁড়ি ব্যবহার করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও সেতুটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়নি।

সম্প্রতি ঘটনাস্থলে দেখা গেছে, সংযোগ সড়কহীন এই সেতুতে ওঠা-নামার জন্য স্থানীয়রা নিজেদের উদ্যোগে কাঠের সিঁড়ি তৈরি করেছেন। স্থানীয় কৃষক সাদেকুর রহমান বলেন, “সেতুর ওপর দিয়ে লোকজনের চলাচলের সুবিধার্থে গত জুলাই মাসে ব্যক্তি উদ্যোগে কাঠ দিয়ে সিঁড়ি নির্মাণ করা হয়। এলাকার উৎপাদিত ফসল, জরুরি প্রয়োজনে রোগীদের ঝুঁকি নিয়ে কাঠের সিঁড়ি দিয়ে সেতুতে তুলতে হয়। কাঠের সিঁড়ি ভেঙে গেলে পারাপার বন্ধ হয়ে যাবে। তিন ইউনিয়নের লাখো মানুষের যাতায়াত সুবিধার জন্য সরকার কোটি টাকা খরচ করে সেতু নির্মাণ করলেও কোনো কাজে আসছে না।”

ঈদগড়ের স্কুলশিক্ষার্থী মোহাম্মদ উল্লাহ জানান, “প্রতিদিন দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী সিঁড়ি দিয়ে সেতু অতিক্রম করে ঈদগাঁও এবং রামু সদরের বিভিন্ন স্কুল কলেজ মাদ্রাসায় যাতায়াত করে থাকে। বৃষ্টি হলে কাঠে সিঁড়ি অতিক্রম করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। এত দিনেও সেতুটি চালু হলো না।”

সেতুটি চালু হলে ঈদগাঁও উপজেলার সাথে পাহাড়ি জনপদ ঈদগড়, বাইশারী ও গর্জনিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে বলে মনে করেন স্থানীয়রা। ঈদগড় ও গর্জনিয়ার বাসিন্দা আবুল কালাম ও আবদুর রহিম বলেন, “সংযোগ সড়ক নির্মাণে জমি অধিগ্রহণে জটিলতা, সমন্বয়হীনতা এবং ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে সেতুটি পাঁচ বছর ধরে পড়ে আছে। তাতে সেতুর বিভিন্ন অবকাঠামো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।”

স্থানীয় ব্যবসায়ী আজিজুল হক জানান, সেতুটি চালু হলে ঈদগাঁও-ঈদগড়-বাইশারী সড়কে ডাকাতির ঘটনা কমে আসবে। তখন হাজারো মানুষ নিরাপদে যাতায়াত করতে পারবেন এবং যাতায়াত খরচও অনেক কমবে।

ঈদগড় ইউপি সদস্য জুবায়েদ উল্লাহ জানান, সেতুর পশ্চিম পাশের সংযোগ সড়কের কিছু অংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে পড়েছে, যার ফলে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ঠিকাদার কাজ বন্ধ করে চলে যাওয়ায় প্রকল্পটি আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

অন্যদিকে, ইসলামাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম জানান, সেতুটি দ্রুত চালুর জন্য প্রয়োজনীয় তৎপরতা চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, “সেতু চালু করা এখন জনগণের প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়েছে।”

এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ঈদগাঁও উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী আল মুইন শাহরিয়ার বলেন, “সংযোগ সড়কের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় আগের দরপত্র বাতিল করা হয়েছে। অবশিষ্ট কাজের (সংযোগ সড়ক) জন্য নতুন দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া চলছে। এরপর দ্রুত সংযোগ সড়ক নির্মাণকাজ শেষ করে সেতুটি চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।”