বাংলাদেশে ইসলামি ক্যালিগ্রাফির চর্চা এখন আর কেবল আরবি অক্ষরের সৌন্দর্য বিস্তারে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ধীরে ধীরে স্বতন্ত্র এক ভিজ্যুয়াল আর্টের পরিসরে পরিণত হচ্ছে। রাজধানীর শাহবাগে অবস্থিত জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারিতে গত শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) থেকে শুরু হওয়া 'আর্ট অব ফেইথ শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ২০২৬' এই রূপান্তরের একটি জোরালো প্রতিফলন। প্রদর্শনীটি আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে।
একসময় বাংলাদেশে ইসলামি ক্যালিগ্রাফি বলতে মূলত আরবি ও উর্দুর নির্দিষ্ট অক্ষরের চর্চাকেই বোঝানো হতো। তবে মাত্র দুই দশকে সেই ধারা অনেকখানি বদলে গেছে। ক্যালিগ্রাফি পেইন্টিং এবং পেইন্টিং ক্যালিগ্রাফির নতুন প্রবাহ তৈরি হয়েছে, যেখানে রঙ ও তার প্রয়োগে নৈপুণ্যের প্রভাব বহুগুণ বেড়েছে। একসময় যা ড্রয়িংরুম বা ক্যালেন্ডারের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল, তা এখন পৌঁছে গেছে পাবলিক ওয়ালে। জুলাইয়ের গ্রাফিতি উৎসবে দেয়ালে দেয়ালে বাংলা ও আরবি ক্যালিগ্রাফির অনবদ্য ও শক্তিশালী প্রকাশ এরই প্রমাণ।
শিল্পের মাধ্যমেও এসেছে ব্যাপক বৈচিত্র্য। শিল্পীরা আর কাগজ বা ক্যানভাসে সীমাবদ্ধ নেই; তারা চট, কাঠ, রেজিন, স্টিল, বুনন এবং বৈদ্যুতিক লাইটিংয়ের মতো বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করেছেন। বিষয়বস্তুতেও ধর্মীয় বাণীর পাশাপাশি সমকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রসঙ্গ স্থান করে নিয়েছে। অক্ষর থেকে পেইন্টিং, দেয়াল থেকে পাবলিক স্পেস, কাগজ থেকে বহুমাত্রিক মাধ্যম এবং নিছক ধর্মীয় অলংকরণ থেকে সমকালীন ভাবনা—এই যাত্রাই সম্ভবত গত দুই দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
মাত্র দুই দশকে অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে ইসলামি ক্যালিগ্রাফির চর্চা করেন এমন মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সহস্রাধিক। ফলে ৫০ থেকে ১০০ শিল্পীর প্রদর্শনী আয়োজন করা এখন সহজ হয়ে পড়েছে। রাজধানীর গ্যালারিগুলোর সাধারণ আর্ট এক্সিবিশনের তুলনায় জাদুঘরের গ্যালারিতে দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মতো বেশি। এর পেছনে জাদুঘরের অবস্থান ও পরিচিতির পাশাপাশি ধর্মীয় বিষয়বস্তুর প্রতি সাধারণ দর্শকের স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহ কাজ করেছে, যা প্রচলিত সমকালীন শিল্প প্রদর্শনীতে সব সময় দেখা যায় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রদর্শনীর ভালো প্রচার তরুণ দর্শকদের টেনে আনতে সাহায্য করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। পুরো গ্যালারি ছবিতে ভরা ছিল, অধিকাংশ দেয়ালে দুই সারি এবং কিছু অংশে তিন সারি ছবি টানা ছিল।
আয়োজক সংগঠন ইসলামিক কালচারাল অর্গানাইজেশনের সভাপতি ইসমাইল হুসাইন জানালেন, "২০১ জন শিল্পীর ৩১০টি শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে এই প্রদর্শনীতে।" নবীন ও প্রবীণ শিল্পীদের পাশাপাশি ২১ জন শিশুশিল্পীর কাজও এখানে স্থান পেয়েছে।
প্রদর্শিত শিল্পকর্মের বেশির ভাগই ইসলামি ক্যালিগ্রাফি। কোরআনের আয়াত, হাদিসের বাণী এবং মনীষীদের কথামলা আরবি ও বাংলায় নানা রঙে ও নৈপুণ্যে চিত্রিত হয়েছে। কিছু নিসর্গচিত্রও ছিল, যার মধ্যে কিছু রিয়েলিস্টিক, কিছু সেমি-রিয়েলিস্টিক এবং কিছু সম্পূর্ণ বিমূর্ত।
শিল্পী আনাস খান তাঁর স্টিলের শিল্পকর্মে ব্যবহার করেছেন আরবের সুগন্ধি। তাঁর ভাষ্য, ‘শিল্পকর্ম সাধারণত দেখার বিষয়, আমি চেয়েছি সুগন্ধির ব্যবহারে একে বিশেষায়িত করতে। সম্ভবত আমি সফল, দর্শনার্থীরা ভালোই উপভোগ করছেন।’ ঘ্রাণকে শিল্পের উপকরণ বানানোর এই সিদ্ধান্ত প্রদর্শনীর মাধ্যম-বৈচিত্র্যের সবচেয়ে সাহসী উদাহরণগুলোর একটি।
নারী শিল্পীদের অংশগ্রহণও ছিল লক্ষণীয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ক্রাফট বিভাগের শিক্ষার্থী তাবাসসুম আম্বিয়া সামিরা জানান, শিল্পকর্মে বৈপ্লবিক থিমের ব্যবহার তাঁকে অন্য রকম অনুভূতি দেয়। তাঁর একটি ক্যানভাসে এঁকেছেন ফিলিস্তিনের পতাকা ও কেফিয়াহ, মাঝে ব্যবহৃত গ্রেনেটে ফুলগাছে ফুল ফুটে আছে। কেবল বিপ্লব বা প্রতিবাদ নয়, দেশীয় ঐতিহ্যের প্রতিও তাঁর দরদ স্পষ্ট। আরেকটি কাজে এঁকেছেন জামদানির টেক্সচার ও চারপাশে অক্ষরের নানা শৈল্পিক উপস্থাপনা। ধর্মীয় ক্যালিগ্রাফির পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতীক ও দেশীয় কারুকাজের এই মিশেল প্রদর্শনীর সবচেয়ে সমকালীন দিকটি স্পষ্ট করে তোলে।
সিনিয়র শিল্পীদের মধ্যে অধ্যাপক ড. আবদুস সাত্তার, আরিফুর রহমান, ইব্রাহীম মণ্ডল ও আমিনুল ইসলাম আমিনের শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আমিনের একটি কাজ বিশেষভাবে দৃষ্টি কেড়েছে। সাদা কাগজে কালো কলমের ক্রস-হ্যাচিং পদ্ধতিতে তিনি এঁকেছেন সুরা আর-রাহমানের সেই বিখ্যাত পুনরাবৃত্ত আয়াত, গোটা সুরাজুড়ে যা এসেছে ৩১ বার। এর বাংলা ভাবার্থ, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে। কেবল আয়াতের অর্থ নয়, রেখার প্রতিটি স্তর কীভাবে একটির পর একটি বসেছে তার কারুকাজেই বোঝা যায় ধৈর্য আর মনোযোগের কতটা বিনিয়োগ হয়েছে এই একটি কাজে।
শিল্পী জোবায়ের আহমদ জামিলের কাজও আলাদাভাবে বলার দাবি রাখে। তিনি শিল্পকর্ম গড়তে রংতুলির ব্যবহারই করেননি। ছালার চট, টুকরা টুকরা কাঠ ও পাটের রশি দিয়ে গড়েছেন এক অসাধারণ কম্পোজিশন, যার সামনে মুগ্ধ হয়ে লম্বা সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। মোল্লা হানিফ, উসাইদ মুহাম্মাদ, সুলতান আমানুর রহমান, সিফাতুল্লাহ, আব্দুর রহমান রুমি, ত্বাসীন ত্বাহা, ওসমান হায়াত, রেদওয়ান নুর, আজিজুল হক রিয়াজ, আবরারুল হক, আজমিরা মুনা, রাইসা তাসনিম, ইশরাত আমিনা, সাওদা ইসলাম, সুলতানা জয়নব ও মুশফিকা মেহেকের কাজও প্রশংসার দাবি রাখে, যদিও প্রতিটি নিয়ে আলাদা করে বলার সুযোগ এই স্বল্প পরিসরের লেখায় নেই।
গত দুই যুগে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অনেক ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনী হয়েছে, তার অধিকাংশই আমার দেখা। বিষয়, মাধ্যম ও নৈপুণ্যের বৈচিত্র্যের বিচারে এই প্রদর্শনী আমার কাছে বিশেষ মনে হয়েছে। শিল্পীর সংখ্যা ও প্রদর্শিত শিল্পকর্মের পরিমাণ বিবেচনায়, আমার দেখা প্রদর্শনীগুলোর মধ্যে এটি নিঃসন্দেহে অন্যতম বৃহৎ, বরং বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ইসলামি ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনীর মধ্যে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড়গুলোর একটি বলা যায়। বাংলাদেশি শিল্পীদের পাশাপাশি ভারতের দুজন শিল্পীও এবার তাঁদের শিল্পকর্ম পাঠিয়েছেন। আয়োজকদের আশা, আগামী বছর ঢাকায় তাঁরা আন্তর্জাতিক পরিসরে ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনীর আয়োজন করবেন।
এই প্রদর্শনীর সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো শিল্পকর্মের সংখ্যা নয়, বরং ইসলামি ক্যালিগ্রাফিকে নিছক ধর্মীয় অলংকরণের গণ্ডি থেকে বের করে এক বিস্তৃত শিল্পভাষার দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রয়াস। এই ভাষা এখনো তার নিজস্ব নন্দনতত্ত্ব, সীমা ও সম্ভাবনা খুঁজে চলেছে। তবে আর্ট অব ফেইথ শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ২০২৬ দেখিয়ে দিল, সেই অনুসন্ধান ইতিমধ্যে অনেকখানি এগিয়েছে।