সারা বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার নিয়ন্ত্রকদের মধ্যে এক গভীর ঐক্য বিদ্যমান। ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ ও জাতির নামে বিভাজন তৈরি করে তাঁরা সাধারণ মানুষের মধ্যে অনৈক্য বজায় রাখার চেষ্টা করেন বলে মত প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদ ও লেখক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
শুক্রবার বিকেলে রাজধানী ঢাকার জাতীয় জাদুঘরের সামনে 'সলিডারিটি ফ্রম বাংলাদেশ' আয়োজিত একটি সংহতি সমাবেশে তিনি এই কথা বলেন। উক্ত সমাবেশে ভারত, পাকিস্তান, ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের ছাত্র-জনতার চলমান আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করা হয়।
সমাবেশনে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, “বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদী শাসক শ্রেণি সব সময় চেষ্টা করে যেন জনগণের মধ্যে কোনো ঐক্য গড়ে উঠতে না পারে।” তিনি উল্লেখ করেন যে, বিশ্বজুড়ে চলমান শোষণ, নিপীড়ন, বৈষম্য এবং সাম্রাজ্যবাদী শাসন ব্যবস্থার প্রধান নিয়ন্ত্রক বা সুবিধাভোগী হচ্ছে মাত্র ১ শতাংশ মানুষ। যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশ—সব জায়গার শাসক শ্রেণিই নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে এবং সাধারণ মানুষের ওপর বিভিন্ন ধরনের নিপীড়ন চালায় বলে তিনি দাবি করেন।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের উদাহরণ টেনে আনু মুহাম্মদ আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য সামাজিক বা খাদ্যনিরাপত্তা কার্যক্রমে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়, তার শতগুণ বেশি অর্থ ব্যয় করা হয় যুদ্ধ ও সামরিক খাতে।
একইভাবে ভারত ও পাকিস্তানের বিশাল সামরিক বাহিনীর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের জীবন এবং সম্পদের বিনিময়ে একশ্রেণির গোষ্ঠী বৈশ্বিকভাবে নিজেদের ও অন্য দেশের মানুষের ওপর এই নির্যাতন ও দখলদারত্ব বজায় রাখছে।
বিভিন্ন দেশের জনগণের এই লড়াইকে নিজেদের লড়াই হিসেবে অভিহিত করে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, “রাষ্ট্র এবং জনগণ আলাদা, সরকার এবং জনগণ আলাদা, সরকার এবং শাসক শ্রেণির ঐক্যের বিরুদ্ধে জনগণের ঐক্যের মধ্য দিয়েই আমাদের মুক্তি।”
সংহতি সমাবেশে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য হারুন অর রশিদ বলেন, ভারতে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে মানুষের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে বাংলাদেশেও সাম্প্রদায়িক কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করতে হবে। সাম্রাজ্যবাদ ও মৌলবাদী শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াও জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
সাম্যবাদী আন্দোলনের নেতা বেলাল চৌধুরী বলেন, বিশ্বব্যাপী চলমান সংকট কোনো নির্দিষ্ট দেশের সংকট নয়, বরং সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের সংকট। এই ব্যবস্থা মানুষের মৌলিক অধিকার ও শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমিয়ে অস্ত্র উৎপাদন ও সামরিক খাতে ব্যয় বাড়াচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ–সংকটও তীব্র হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সভাপতির বক্তব্যে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক জামশেদ আনোয়ার তপন বলেন, ভারত, পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্র ও অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে দমন-পীড়ন চলছে। বাংলাদেশের ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থান ভারতের গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও প্রেরণা জোগাচ্ছে। বিশ্বের যেখানেই নিপীড়ন-বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম হবে, বাংলাদেশের মানুষের দায়িত্ব সেই আন্দোলনে সংহতি জানানো।
সমাবেশনে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য দেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি রিনা মুর্মু, বাসদ মার্ক্সবাদীর কেন্দ্রীয় নেতা জয়দ্বীপ ভট্টাচার্য, রিকশা শ্রমিক ইজিবাইক ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস, বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সাংগঠনিক সম্পাদক মফিজুর রহমান। এছাড়া বক্তব্য দেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা মন্টু ঘোষ, কবি মোহন রায়হান, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন, সমগীতের শিল্পী অমল আকাশ, গণসাংস্কৃতিক সংঘের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদসহ আরও অনেকে।
সংহতি সমাবেশের সমাপ্তি টানতে একটি মশালমিছিল করা হয়। মিছিলটি জাতীয় জাদুঘরের সামনে থেকে শুরু হয়ে টিএসসি হয়ে শাহবাগে গিয়ে শেষ হয়।