দেশের শিল্প, কৃষি ও পরিবহন খাতে যান্ত্রিকায়নের গতি বাড়লেও এর সুরক্ষার মূল চালিকাশক্তি ‘ইঞ্জিন অয়েল’ বা লুব্রিকেন্ট খাতে এখন ভয়াবহ নৈরাজ্য। কোনো মানদণ্ড মেনে না চলে ব্র্যান্ডের পণ্যের আদলে তৈরি করা নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ইঞ্জিন অয়েল নীরবে ধ্বংস করছে দেশের কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি। এতে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব ঘাটতি এবং পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর নেমে আসছে বিপর্যয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর ‘অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪’ জাতীয় প্রতিবেদনে দেশে মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা ১ কোটি ১৭ লাখ ২ হাজার ৭৯২টি হিসাব করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ বা ১১ লাখ ৬৮ হাজার ৩৪৯টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন চলাকালে ভারী যন্ত্রপাতির ব্যবহার অপরিহার্য। সেবা খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যন্ত্র ব্যবহার হয় পরিবহন খাতে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, গত জুন মাসে জাতীয় সংসদে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশে নিবন্ধিত বৈধ মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৪৯ লাখ ৯৭ হাজার ৯০টি। চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত মোট নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৭ লাখ ২৪ হাজার।

নৌপথ ও কৃষি খাতেও যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। বিবিএস এর ‘নৌযান শুমারি ২০২৬’–এর প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, দেশে ইঞ্জিনচালিত নৌযান রয়েছে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৬০টি। অন্যদিকে, বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জ্বালানি তেলনির্ভর ২১ লাখ ৩০ হাজার কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার হচ্ছে। জেনারেটর ও অন্যান্য ভারী যন্ত্রপাতির অধিকাংশই লুব্রিকেন্ট ছাড়া চলে না।

‘মুক্তকণ্ঠ’ ও মবিলের (এমজেএল বাংলাদেশ পিএলসি)র যৌথ উদ্যোগে ‘নিম্নমানের ইঞ্জিন অয়েলের প্রভাব, ঝুঁকিতে ইঞ্জিন অর্থনীতি পরিবেশ’ শীর্ষক বিশেষ সংলাপে নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের আলোচনা থেকে লুব্রিকেন্ট বাজারের ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে। দেশে লুব্রিকেন্ট অয়েলের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টন। বৈধ ও মানসম্মত কোম্পানিগুলো জোগান দিতে পারছে ১ লাখ ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৫ হাজার টন, যা মোট চাহিদার ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ। বাকি ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করছে অনুমোদনহীন, নকল ও নিম্নমানের ভেজাল লুব্রিকেন্ট।

এমজেএল বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. মুকুল হোসেন বলেন, "দেশে এখন আধুনিক ইঞ্জিন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। অথচ এই ইঞ্জিনে আশির দশকের পুরোনো মানের লুব্রিকেন্ট ব্যবহৃত হচ্ছে।" তিনি পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানান, বর্তমানে মোট ব্যবহৃত তেলের ৫২ থেকে ৬০ শতাংশই এই পুরোনো মানদণ্ডের। আধুনিক ইঞ্জিনে মানহীন ও ভেজাল ইঞ্জিন অয়েল ব্যবহারের ফলে ইঞ্জিনের অভ্যন্তরীণ ঘর্ষণ বহুগুণ বেড়ে যায়। এতে ইঞ্জিনের ক্ষতি হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ ও খাত সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, নকল তেল ব্যবহারের কারণে একটি ইঞ্জিনের গড় আয়ু প্রায় ৫০ শতাংশ কমে যায় এবং জ্বালানি অপচয় বাড়ে অন্তত ১৫ শতাংশ। একটি মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে যেখানে ১৫-২০ বছর বাহনটি সচল থাকার কথা, সেখানে ভেজাল তেলের কারণে মাত্র ৭-৮ বছরেই তার ইঞ্জিন সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দেশে মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশই মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়ায় এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে চরম আর্থিক দুর্ভোগের মুখে পড়তে হচ্ছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সদস্য (পেট্রোলিয়াম) ড. সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া বলেন, "মানহীন লুব্রিকেন্টের কারণে দামি যন্ত্রপাতির অকালমৃত্যু ঘটছে এবং জ্বালানি অপচয় বাড়ছে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে বড় চাপ তৈরি করছে।" সংকট সমাধানে তিনি সংশ্লিষ্ট সব রেগুলেটরি সংস্থার মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ওপর জোর দেন।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, "আসল তেলের চেয়ে নকল তেলে কেন ২০০ টাকা বেশি লাভ থাকে, তা খতিয়ে দেখে আমদানি থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত পুরো সাপ্লাই চেইনে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে।" তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, শুধু খুচরা দোকান নয়, অবৈধ উৎপাদনের মূল উৎসে অন্যান্য সংস্থাকে নিয়ে দ্রুত যৌথ অভিযান চালানো হবে।

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) মহাপরিচালক কাজী ইমদাদুল হক জানান, পুরোনো মান বাতিল করে ইতিমধ্যে আধুনিক ‘বিডিএস ২০২৯’ মানদণ্ড প্রণয়ন করা হয়েছে। তিনি বলেন, সম্প্রতি ঢাকার আটটি স্পটে অভিযান চালিয়ে সব কটিতেই নকল তেলের প্রমাণ মিলেছে। অসাধু চক্রকে রুখতে মোবাইল কোর্ট আইন সংশোধন করে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।

অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি এই নিম্নমানের লুব্রিকেন্ট পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য যে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনছে, তা রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। যানবাহনের ক্ষতিকর ধোঁয়ার কারণে বায়ুদূষণ বেড়ে দেশে প্রতিবছর প্রায় এক লাখ মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বায়ুদূষণের অন্তত ৩০ শতাংশই আসে যানবাহনের বিষাক্ত নির্গমন থেকে। ভেজাল ও নিম্নমানের তেল ইঞ্জিনে সঠিকভাবে পুড়তে পারে না, ফলে বাতাসে অত্যন্ত ক্ষতিকর নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার অক্সাইড এবং শ্বাসতন্ত্র ধ্বংসকারী অতিসূক্ষ্ম পিএম ২.৫ কণা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। শুধু বাতাস নয়, গ্যারেজ, ওয়ার্কশপ বা কৃষিযন্ত্র থেকে অপরিশোধিত পোড়া তেল যত্রতত্র মাটি ও ড্রেনে ফেলার কারণে মাটি ও পানির প্রাকৃতিক ইকোসিস্টেম সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।