দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের জীবনযাত্রার মান কেমন এবং তাঁদের কত শতাংশ দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছেন—সেই বাস্তব চিত্রটি জানতে একটি বিশেষ জরিপ পরিচালনা করছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। দেশে এই প্রথমবার ১ অক্টোবর থেকে এই জরিপ কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যা আগামী ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে।

বিবিএস সূত্রে জানা গেছে, দেশব্যাপী পরিচালিত এই জরিপের মূল লক্ষ্য হলো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিবারগুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা এবং তাঁদের আর্থসামাজিক অবস্থার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কোন সম্প্রদায়গুলো সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে আছে এবং কারা তুলনামূলকভাবে এগিয়ে, তা স্পষ্টভাবে জানা যাবে। সংগৃহীত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দারিদ্র্যের হার নির্ধারণ এবং তাঁদের জীবনমান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বিবিএসের।

জরিপের জন্য প্রস্তুত করা প্রশ্নপত্রে মোট ৫০টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তবে বাঙালি জনগোষ্ঠী এই জরিপের আওতাভুক্ত নয়। তথ্য সংগ্রহের কাজটিকে আরও ফলপ্রসূ করতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্য থেকেই তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেক তরুণ শিক্ষার্থীও রয়েছেন। বিবিএস কর্মকর্তাদের মতে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতা বাঙালিরা পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারেন না। তাই নিজ নিজ সম্প্রদায়ের ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে পরিচিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ব্যক্তিদেরই এই কাজে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

তবে মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে কিছু ক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহকারীদের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। বিবিএসের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহের বেশ কিছু এলাকায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন কর্মীরা। অনেক সদস্য তথ্য দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন অথবা গড়িমসি করেছেন। তাঁরা জানতে চেয়েছেন, কেন তাঁদের এই ব্যক্তিগত তথ্য নেওয়া হচ্ছে। যদিও পরবর্তীতে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার পর তাঁরা তথ্য দিতে রাজি হন।

‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থা ও দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিরূপণ জরিপ’-এর প্রকল্প পরিচালক ফারহানা সুলতানা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘কয়েকটি জায়গায় এ জরিপের তথ্য সংগ্রহে বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। পরে তাঁদের বোঝানো গেছে যে এসব তথ্য তাঁদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্যই নেওয়া হচ্ছে। তখন তাঁরা তথ্য দিতে রাজি হয়েছেন।’ এই প্রক্রিয়ায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়গুলোকে তথ্য দিয়ে পূর্ণ সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি।

প্রকল্প পরিচালক আরও জানান, এই জরিপের মাধ্যমে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার একটি সামগ্রিক ও পূর্ণাঙ্গ চিত্র ফুটিয়ে তোলা হবে। এজন্য পরিবারভিত্তিক তথ্যের পাশাপাশি জীবনমান মূল্যায়নের একটি নির্দিষ্ট সূচকও তৈরি করা হবে। এর ফলে কোন পরিবারগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি অসচ্ছল এবং কারা সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়নমূলক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তা চিহ্নিত করা সহজ হবে।

বিবিএসের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই জরিপের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের জন্য একটি 'বেঞ্চমার্ক ডেটাবেস' তৈরি করা হবে। ভবিষ্যতে তাঁদের জীবনমানের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের অগ্রগতি মূল্যায়নে এই তথ্যভাণ্ডার অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।

জরিপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) জন্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বিভাজিত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা। এর মাধ্যমে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য—‘কাউকে পেছনে ফেলে না রাখা’—বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যাবে। পাশাপাশি জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, মূল্যায়ন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রেও এই তথ্যগুলো ব্যবহৃত হবে।

পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য মোট ২৮ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। ২০২৮ সালের ৩০ জুন এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে। মাঠ পর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ শেষ হলে তা বিশ্লেষণ করে দারিদ্র্যের হার ও জীবনমানের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে এই জরিপের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে কতটা কার্যকর উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া হয় এবং প্রান্তিক পরিবারগুলো সেই পরিকল্পনার সুফল কতটা পায়, তার ওপর।