রংপুর নগরীর মডার্ন মোড় এলাকায় চাঁদা আদায়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তৃতীয় লিঙ্গ (হিজড়া) সম্প্রদায়ের দুই নেতা আনোয়ার হোসেন রানী ও মারুফা আক্তার মিতুর গ্রুপের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এই বিরোধের জেরে রানীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন মিতু গ্রুপের সদস্যরা।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুপুর থেকে দিনব্যাপী মিঠাপুকুর উপজেলা তৃতীয় লিঙ্গ সম্প্রদায়ের সভাপতি মারুফা আক্তার মিতুর নেতৃত্বে ৪৮ জন হিজড়া মডার্ন মোড় এলাকায় অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। আন্দোলনকারী হিজড়ারা অভিযোগ করেন যে, আনোয়ার হোসেন রানী তাদের চাঁদা আদায়ে বাধা দিচ্ছেন এবং হুমকি-ধমকি ও মারপিট করছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, রোববার বিকালে মডার্ন মোড়ের অর্জন ভাস্কর্যের সামনে বিক্ষুব্ধ হিজড়ারা নির্বিঘ্নে চাঁদা আদায়ের দাবিতে আনোয়ার হোসেন রানীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছেন। এই সময় রানীর পক্ষের একটি দল সেখানে উপস্থিত হলে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং দীর্ঘ দুই ঘণ্টা ধরে তীব্র বাগবিতণ্ডা চলে। সন্ধ্যার পর রানীর পক্ষের সদস্যরা চলে গেলে মিতু গ্রুপের সদস্যরা একটি বিক্ষোভ মিছিল করেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, মিঠাপুকুর উপজেলার ৪৮ জন হিজড়া গত ২০ বছর ধরে মডার্ন মোড় এলাকায় চাঁদা তুলে জীবিকা নির্বাহ করছেন। ২০২১ সালে গাইবান্ধার সরদারনি মৌ হিজড়া ও লালমনিরহাটের সরদারনি আকাশি হিজড়ার উপস্থিতিতে আনোয়ার হোসেন রানীর সঙ্গে একটি সমঝোতা হয়। সেই অনুযায়ী, প্রায় ১৪ ভরি স্বর্ণ (সমমূল্য প্রায় ১০ লাখ টাকা) এককালীন প্রদান করে মডার্ন মোড়ের কালেকশন ছেড়ে দেওয়ার চুক্তি হয়। এরপর থেকে তারা নির্বিঘ্নে চাঁদা তুলে আসছিলেন।
তবে ২০২৬ সালের মার্চ মাসের শেষের দিকে আটিয়াটারী এলাকার নীলকণ্ঠের বাসায় এক ঘরোয়া বৈঠকে আনোয়ার হোসেন রানী পুনরায় বড় অঙ্কের অর্থ দাবি করেন। মিঠাপুকুরের হিজড়ারা এই দাবিতে সম্মতি না দেওয়ায় গত সাত মাস ধরে সেখানে চাঁদা তোলা নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়, যার ফলে তাদের জীবিকা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
আন্দোলনরত মিঠাপুকুর উপজেলা সভাপতি মারুফা আক্তার মিতু বলেন, "আমরা মডার্ন মোড়ে দীর্ঘ ১৫ থেকে ২০ বছর থেকে ৪৮ জন হিজড়া কালেকশন করে খাই। বিগত সাত মাস থেকে রানী হিজড়া আমাদের কালেকশন বন্ধ করে দিছে। এখন রানী হিজড়া তার লোক দিয়ে কালেকশন করাচ্ছে। ২০২১ সালে একটি ঘরোয়া বৈঠকে মডার্নে কালেকশন করার অনুমতির জন্য আমাদের কাছে ১৪ ভরি স্বর্ণ দাবি করে রানী হিজড়া। তখন আমার স্বর্ণের দাম হিসাব করে সবাই মিলে ওনাকে ১০ লাখ টাকা দিই। আবার চলতি বছরে রমজানের ঈদের পরে মডার্ন মোাড়ে কালেকশনের জন্য দৈনিক ২ হাজার টাকা করে দাবি করে রানী হিজড়া। এটা দিতে অস্বীকৃতি জানালে রানী হিজড়া আমাদের ৪৮ জন হিজড়ার কালেকশন বন্ধ করে দিছে।"
অন্যদিকে, ন্যায়-অধিকার ট্রান্সজেন্ডার উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি আনোয়ার হোসেন রানী জানান, তারা সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে প্রত্যেকে নিজ নিজ এলাকার নেতৃত্ব দেবেন। তিনি বলেন, "আমরা সাংগঠনিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যে যে এলাকার সে সেই এলাকার নেতৃত্ব দেবে। মিঠাপুকুরের যারা মিঠাপুকুরেই থাকবে। পীরগঞ্জের যারা পীরগঞ্জেই থাকবে। রংপুর সিটি করপোরেশনের যারা সিটি করপোরেশনেই কালেকশন করবে।"
তিনি আরও অভিযোগ করেন, "এরা দীর্ঘদিন থেকে মিঠাপুকুর ডিঙিয়ে রংপুর কালেকশন করতে করতে ওদের লোভ লেগে গেছে। এরা সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত মানবে না। যার কারণে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ দিয়ে মডার্ন নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে। দীর্ঘ সাত মাস থেকে আমার লোকজন মডার্নে কালেকশন করছে। তারা আমার গুরুমাতাকে আক্রমণ করেছে। আমরা আইনি ব্যবস্থা নেবে।"
ঘটনার বিষয়ে রংপুর মেট্রোপলিটনের তাজহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম রফিক জানান, মডার্ন মোড়ের কালেকশনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেওয়ায় উভয় পক্ষের মধ্যে সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সাময়িকভাবে কালেকশন বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।