পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা আগামী ১৬ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে। এই পূজার প্রাক্কালে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ জারি করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, এবার দুর্গাপূজার পরিবর্তে 'শারদোৎসব' শব্দটি ব্যবহার করা যাবে না।
বামপন্থী দলগুলো প্রতিবছর পূজামণ্ডপের আশেপাশে মার্ক্সীয় সাহিত্যের স্টল স্থাপন করে থাকে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, ওই স্টলগুলোর ক্ষেত্রেই এই নির্দেশনা প্রযোজ্য, যেখানে দুর্গাপূজার বদলে 'শারদোৎসব' লেখা হয়ে থাকে। তিনি বলেছেন, এবার আর তা লেখা যাবে না; সেখানে অবশ্যই 'দুর্গোৎসব' লিখতে হবে।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিশেষ অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে মুখ্যমন্ত্রী ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি–মার্ক্সবাদী (সিপিএম)-কে উদ্দেশ্য করে এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘ওরা দুর্গাপূজা বলে না। বলে শারদোৎসব। আমি সব পূজা কমিটিকে অনুরোধ করব, এই তথাকথিত কমিউনিস্টরা পূজার স্টলে দুর্গাপূজার জায়গায় শারদোৎসব লেখে। এবার আর দুর্গাপূজার জায়গায় শারদোৎসব লেখা যাবে না। যদি তা-ই লেখে, তবে ওদের একটা স্টলও করতে দেবেন না। এটা সামাজিক উৎসব নয়, হিন্দুদের পবিত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠান।’
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইছেন যে, পূজায় বাম দল বইয়ের স্টল দিতে চাইলে সেখানে শারদোৎসবের জায়গায় দুর্গোৎসব লিখতে হবে। কারণ, এটি হিন্দুদের কাছে পবিত্র এক ধর্মীয় অনুষ্ঠান। তিনি এই ইঙ্গিতও দিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে পত্রপত্রিকার পূজাসংখ্যাকে শারদসংখ্যা হিসেবে লেখা হচ্ছে। এটা কাম্য নয়।
এই বিষয়ে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বলেন, ‘উনি জানেন না, বাংলায় দুটি শব্দ আছে—লক্ষ্য আর উপলক্ষ। দুর্গাপূজা উপলক্ষে নানা ক্ষেত্রের মানুষ নানা লক্ষ্যে ধাবিত হন। কেউ ম্যাগাজিন করেন, কেউ গানের অ্যালবাম করেন, কেউ অন্য শিল্পকলার প্রদর্শন করেন। সবটা মিলেই এটা হয়ে ওঠে উৎসব। মুখ্যমন্ত্রী বোধ হয় জানেন না, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও শারদোৎসব লিখেছিলেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই সরকার বহুত্ববাদী চিন্তাকে ধ্বংস করার পথে যেতে চাইছে। লড়াই হবে।’
অন্যদিকে, সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী ঘোষণা দিয়েছেন, আগের মতো এবারও তাঁরা পুরোনো ধারা মেনে পূজামণ্ডপের কাছে বইয়ের স্টল দেবেন। তিনি বলেন, ‘উনি অবশ্য বই এবং মুক্তচিন্তাকে ভয় পান। শারদ উৎসবে বইয়ের স্টল হবেই। কেউ ঠেকাতে পারবে না। চ্যালেঞ্জ রইল। তৃণমূল ফ্যাসিবাদীরা বই পুড়িয়েছে। আপনিও তা–ই করবেন। বাংলা, বাঙালির উৎসব এই শারদোৎসব। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শারদোৎসব।’
এ প্রসঙ্গে সাহিত্য একাডেমির সাবেক পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান ও সাহিত্যিক রামকুমার মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘শারদোৎসব শব্দে বাঙালির সমন্বয়ী সংস্কৃতির ধারা বহমান। শ্রীচৈতন্যদেব, শ্রীরামকৃষ্ণদেব এই পথের পথিক। রবীন্দ্রনাথ ধর্মের আচারসর্বস্বতার বাইরে বৃহত্তর ব্যঞ্জনা অনুভব করতেন। শান্তিনিকেতনের শারদোৎসব, বসন্ত উৎসব শব্দগুলো বাঙালির অভিজ্ঞানে মিশেছে।'