পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপূজার উৎসবের আবহে বিভিন্ন পূজামণ্ডপের সামনে বামপন্থী দলগুলোর স্থাপন করা বইয়ের স্টলগুলোতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছে। সিপিএম-এর দাবি, বিজেপির কর্মী ও সমর্থক পরিচয় দিয়ে একদল দুর্বৃত্ত পরিকল্পিতভাবে এই হামলাগুলো চালিয়েছে। এই ঘটনার প্রতিকার চেয়ে সোমবার কলকাতা হাইকোর্টে একটি মামলা দায়ের করেছে দলটি। বিষয়টি দ্রুত শুনানির আবেদন জানানো হলে বিচারপতি পার্থ প্রতীম রায় মঙ্গলবার শুনানির দিন ধার্য করেছেন।
দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে কলকাতা এবং রাজ্যের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ও মেলা প্রাঙ্গণে সিপিএম, সিপিআই, ফরওয়ার্ড ব্লক এবং এসইউসিআই-এর মতো বামপন্থী দলগুলো নিয়মিত বইয়ের স্টল বসিয়ে আসছে। উল্লেখ্য, অতীতে কংগ্রেস, বামফ্রন্ট কিংবা তৃণমূল সরকারের শাসনামলেও এই দীর্ঘ ঐতিহ্যের কোনো ব্যাঘাত ঘটেনি। তবে সিপিএম নেতৃত্বের অভিযোগ, রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিজেপি নেতৃত্ব আর বাংলায় কমিউনিস্টদের বইয়ের স্টল দিতে রাজি নয়। এমনকি বিজেপির শীর্ষ পর্যায় থেকে আগেই বামপন্থীদের বইয়ের স্টল না দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছে বাম দলগুলো। তাঁদের দাবি, সেই পূর্বঘোষণার জেরেই কলকাতা ও রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় মণ্ডপের পাশে স্টল বসাতে গেলে হামলা চালানো হচ্ছে।
গত সোমবার মহা অষ্টমীর দিনেও হাওড়ার চ্যাটার্জিহাট থানা এলাকায় সিপিএম-এর একটি বইয়ের স্টল ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সিপিএম-এর পক্ষ থেকে স্থানীয় থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। এর আগে কলকাতার যাদবপুর ও হরিদেবপুর ছাড়াও ডোমজুড়, শালকিয়া, ফুলিয়া এবং হলদিয়ায় একই ধরনের হামলার ঘটনা ঘটেছে। যাদবপুরে তো এমনকি বুলডোজার এনে স্টল গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালানো হয়; তবে সিপিএম ও সিপিআই কর্মীদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে হামলাকারীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। অনেক ক্ষেত্রে হামলাকারীরা কেবল ভাঙচুর করেই ক্ষান্ত হয়নি, স্টলে অগ্নিসংযোগও করেছে। বর্তমানে বিভিন্ন এলাকায় লাল শালু ঘেরা বহু বইয়ের স্টল এখনো চালু রয়েছে। তবে যেসব জায়গায় ভাঙচুর চালানো হয়েছে, সেখানে সিপিএম কর্মীরা ভ্যানে করে ঘুরে ঘুরে বই বিক্রি করছেন এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন।
বইয়ের স্টলে এই হামলার ঘটনায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। তিনি বলেন, “আদর্শগত ভিন্ন মত থাকতে পারে। কিন্তু বই বিক্রি করতে না দেওয়া বা বইয়ের স্টল ভাঙচুর কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ওরা ভারতবর্ষকে বোঝেনি, চেনেনি। তাই এ ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না। আমরা তো ৩০-৪০ বছর ধরে দেখছি বামরা পূজা এবং বিভিন্ন মেলায় বইয়ের দোকান দিয়ে আসছে। বই কি ময়লার মধ্যে ফেলে দেওয়া ঠিক?”
অন্যদিকে, হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) নেতা জিষ্ণু বসু এই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, “প্রত্যেকেরই বুক স্টল করার অধিকার আছে। আজ যারা বুক স্টল ভাঙছে, তারা কেউ আসল লড়াইয়ে ছিল না। ক্ষমতার দম্ভে এসব করছে।”
ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস নেতা ও বিধায়ক কুণাল ঘোষ বলেন, “আদর্শগতভাবে আমাদের সঙ্গে সিপিএমের সম্পর্ক গভীর না থাকলেও তাদের বইয়ের স্টল ভাঙচুর করার ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না। এটা আর এখন রাজনৈতিক সংকট নয়, সভ্যতার সংকট।”
এদিকে বইয়ের স্টল বিতর্ক এবং বামপন্থীদের ইঙ্গিত করে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আজ এক বক্তব্যে বলেন, “চীনে যাদের বাড়ি, তাদের থেকে সাবধানে থাকতে হবে।”