সারা দিনের ক্লান্তি কাটাতে আমরা শোবার ঘরেই প্রশান্তি খুঁজি। তবে এই ঘরটি যদি যথাযথভাবে ব্যবহার না করা হয়, তাহলে এটি নানা রোগের উৎস বা বিদ্যমান রোগের তীব্রতা বাড়িয়ে দিতে পারে। ধানমন্ডির পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক ডা. সাইফ হোসেন খানের সঙ্গে কথা বলে জানাচ্ছেন রাফিয়া আলম। তিনি জানান, শোবার ঘরের দেয়াল, বিছানা, বালিশ, কার্পেট এবং সুগন্ধির ব্যবহার সরাসরি আমাদের স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ভুল ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়লেও সচেতন থাকলে তা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

বালিশ ও বিছানার নির্বাচনে সতর্ক থাকা জরুরি। ভুল বালিশ ব্যবহারে ঘাড়ব্যথা এবং অনুপযুক্ত বিছানায় ঘুমালে কোমরব্যথার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বালিশ অবশ্যই আরামদায়ক হতে হবে, কিন্তু মাথার চাপে যেন তা নিচু না হয়ে যায়। খুব উঁচু বা খুব নিচু বালিশ এড়িয়ে চলুন। এমন উচ্চতার বালিশ বেছে নিন, যাতে ঘাড়ের স্বাভাবিক বক্রতা বজায় থাকে। বিছানা মাঝারি দৃঢ়তার হওয়া উচিত, যাতে শরীরের ভারে তা সহজে নিচু না হয়। শক্ত জাজিমের ওপর নরম তোশক বিছানো বা অতিরিক্ত শক্ত বিছানা ব্যবহার করাও মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক অবস্থানের জন্য উপযোগী নয়। বালিশ, জাজিম, তোশক ও ম্যাট্রেসের স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট হলে বা অল্প চাপে আকৃতি বদলে গেলেই সেগুলো বদলে নেওয়া উচিত। যত্ন সহকারে ব্যবহার করলে এসব বেশিদিন টিকে থাকে।

নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে জিনিসপত্রের আয়ু বাড়ানো যায়। জাজিম, তোশক বা ম্যাট্রেস—যা-ই ব্যবহার করুন না কেন, প্রতি তিন মাস পরপর এর অবস্থান পরিবর্তন করুন। অর্থাৎ মাথার দিক ঘুরিয়ে পায়ের দিকে আনুন। প্রয়োজনে পুরোপুরি উল্টে দিন, তবে মেমোরি ফোম বা পিলো-টপ ম্যাট্রেসের ক্ষেত্রে এটি সম্ভব নয়। তুলার বালিশ, জাজিম বা তোশক বছরে অন্তত একবার কড়া রোদে দেওয়া ভালো।

শোবার ঘরের পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। বিছানার চাদর, বালিশের কভার, পর্দা, কার্পেট, শতরঞ্জি ও পাপোশে লুকিয়ে থাকে বিভিন্ন অণুজীব ও বাতাসের কণা। এসবের কারণে শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহের ঝুঁকি বাড়ে, যা হাঁপানি বা অ্যালার্জিগ্রস্তদের জন্য বিশেষভাবে ক্ষতিকর। পরিষ্কার দেখালেও প্রতি সপ্তাহে অন্তত বিছানার চাদর ও বালিশের কভার বদলে ফেলা উচিত। ঘরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন, যাতে এটি স্যাঁতসেঁতে না হয়। প্রয়োজনে ডিহিউমিডিফায়ার ব্যবহার করুন। দেয়াল, ছাদ বা আসবাবপত্রে ছত্রাক দেখা দিলে দ্রুত সমাধান করুন।

ঘুমের মান উন্নত করতে পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। ঘুমের হরমোন মেলাটোনিনের ওপর আলোর প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে। আলো, শব্দ ও অস্বস্তিকর তাপমাত্রা গভীর ঘুমে বাধা দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদি নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। ঘুমের সময় ঘর অন্ধকার রাখুন এবং বাইরের আলো ঠেকাতে ‘ব্ল্যাকআউট’ পর্দা ব্যবহার করুন। ডিমলাইটের আলোও ঘুমের অন্তরায় হতে পারে। বাইরের শব্দ থাকলে জানালা বন্ধ রাখুন, তবে বাতাস চলাচলের জন্য দরজা কিছুটা খোলা রাখতে পারেন। ঘরের তাপমাত্রা আরামদায়ক রাখুন। মশা তাড়াতে কয়েল বা স্প্রেয়ের চেয়ে মশারি ব্যবহার করা নিরাপদ। সুগন্ধির জন্য প্রাকৃতিক উপায় যেমন ধোঁয়ায় অ্যালার্জি না থাকলে প্রাকৃতিক মোম, আর পরাগরেণুতে অ্যালার্জি না থাকলে ফুল বেছে নেওয়া ভালো।

শোবার ঘরে কিছু অভ্যাস সম্পূর্ণ বর্জন করা উচিত। ঘরে, বারান্দায় বা বাথরুমে ধূমপান করবেন না। বিছানায় শুয়ে টেলিভিশন দেখা ঠিক নয়, কারণ দীর্ঘক্ষণ ঘাড় বাঁকা রাখলে ঘাড়ব্যথার ঝুঁকি বাড়ে। বিছানা কেবল বিশ্রামের জন্য রাখাই শ্রেয়। বিছানায় খাবার নেবেন না, কারণ খাবারের কণা ঘুমের সময় অস্বস্তি সৃষ্টি করতে পারে। অপরিষ্কার বা ভেজা পায়ে বিছানায় উঠবেন না এবং পাপোশ ব্যবহার করুন।