কক্সবাজারের রামু উপজেলার হিমছড়ি সমুদ্রসৈকতের পার্শ্ববর্তী তিনটি রিসোর্ট ও একটি আবাসিক ভবনে আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারক চক্রের গোপন আস্তানার খবর পাওয়া গেছে। পুলিশের তদন্তে জানা যায়, আড়াই থেকে তিন শতাধিক চীন ও তাইওয়ানি নাগরিক এসব স্থানে অবস্থান করে প্রতারণামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন। গত ২৫ আগস্ট অভিযান চালিয়ে পুলিশ ওই স্থান থেকে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপসহ বিপুলসংখ্যক ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম উদ্ধার করে।
মামলার এজাহার ও ডিএসবির গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মার্চে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ জন চীন ও তাইওয়ানি নাগরিক দেশে প্রবেশ করেন। পরের মাসে তারা রামুর মেরিন ড্রাইভের মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্ট, ড্রিম হলিডে রিসোর্ট, অর্কিড বু রিসোর্ট এবং ইলিয়াস ব্রাদার্সের একটি আবাসিক ভবন ভাড়া নেন। ভাড়া নেওয়ার পর চক্রের সদস্যরা ভবনগুলোর সেটআপ পরিবর্তন, সাজসজ্জা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও জনবল নিয়ন্ত্রণে নেন। মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টের একটি হলরুমে কম্পিউটার ল্যাব ও ছয়টি সাউন্ডপ্রুফ কক্ষ তৈরি করা হয়। পুলিশের ধারণা, এই কক্ষ ও ল্যাব থেকে বিভিন্ন মডেলের মোবাইল ও কম্পিউটার ব্যবহার করে গোপনে প্রতারণা চালানো হচ্ছিল।
এপ্রিল থেকেই বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে। বিদেশি নাগরিকদের পাসপোর্ট কপি ও তথ্য ডিএসবি-কে জানাতে হতো, কিন্তু চারটি প্রতিষ্ঠান ভাড়ার বিষয়টি গোপন রাখে। ডিএসবি কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদ করলে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ জানান, ‘বাবর আলী’ নাম ব্যবহার করে চীনের নাগরিক ঝান ইউয়ান ফান এপ্রিল থেকে রিসোর্টগুলো ভাড়া নেন। তারা দাবি করেন, বাংলাদেশে ‘জিন শিন নির্মাণ কোম্পানি’ নামে একটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানি স্থাপনের কাজের অংশ হিসেবে সেখানে অবস্থান করছেন। তবে ডিএসবির অনুসন্ধানে এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। বিদেশি নাগরিকদের কাছ থেকে ভিসা, উদ্দেশ্য বা বৈধ কাগজপত্র চাওয়া হলেও তারা সন্তোষজনক কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
গত ২৫ আগস্ট অভিযান শুরু হলে চীন ও তাইওয়ানি নাগরিকরা পেছনের সৈকত এলাকা দিয়ে পালিয়ে যান। অভিযানের সময় মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টের হলরুম থেকে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৫০টি মনিটর, ৪৪টি সিপিইউ, ৩০টি কিবোর্ড, দুটি ল্যাপটপ, দুটি প্রিন্টার, ৪০টি মাউস, একটি আইপিএস ও ২৪টি কানেকশন বোর্ডসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া মামলায় চীনা পুলিশের র্যাংক ব্যাজ, চীনের জাতীয় পতাকা এবং পুলিশ লোগোযুক্ত একটি টাই উদ্ধারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আলামত প্রথমে রিসোর্টের জেনারেল ম্যানেজারের হেফাজতে রাখা হয়। পরে ৩ সেপ্টেম্বর সাক্ষীদের উপস্থিতিতে সেগুলো জব্দ তালিকামূলে পুলিশ নিজেদের হেফাজতে নেয়।
ঘটনার পর ২৬ আগস্ট ঢাকায় অবস্থিত চীনা দূতাবাসের তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল ও ২৮ আগস্ট ডিআইজি, সিটিটিসির নেতৃত্বে নয় সদস্যের দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। সিটিটিসি কর্মকর্তাদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে চক্রটি অনলাইনভিত্তিক আর্থিক প্রতারণার সঙ্গে জড়িত বলে ধারণা করা হয়। পুলিশের তদন্তে সাত ধরনের প্রতারণার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে কৃত্রিমভাবে বাজার বিশ্লেষণ দেখানো, ভুয়া প্রলোভন দেখানো, ক্লোন বা ভুয়া ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি, ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে অর্থ জমা নেওয়া, এক্সিট ফ্রড, অর্থ আত্মসাৎ এবং বিভিন্ন ধরনের অনলাইন আর্থিক প্রতারণা। পুলিশের দাবি, কক্সবাজার থেকে চক্রটি ইতিমধ্যে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে থাকতে পারে। তবে এ দাবির পক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্য বা ভুক্তভোগীর সংখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি। উদ্ধারকৃত ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষার পর আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
গত বৃহস্পতিবার রাতে কক্সবাজার শহরের কলাতলী এলাকার দুটি হোটেল থেকে ছয়জনকে আটক করে পুলিশ। তাদের মধ্যে পাঁচজন চীনা এবং একজন তাইওয়ানি নাগরিক। শুক্রবার তাদের কক্সবাজারের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। মামলার এজাহারে আরও চারজন চীনা নাগরিকের নাম উল্লেখ করে তাদের পলাতক দেখানো হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। রামু থানায় সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ২১, ২২, ২৪ ও ২৭ ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়েছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) অহিদুর রহমান বলেন, বিষয়টি নিয়ে পুলিশ তদন্ত করছে। তদন্তের স্বার্থে এখনই বিস্তারিত বলা যাচ্ছে না। পরে বিস্তারিত জানানো হবে। এর আগে শুক্রবার তিনি জানিয়েছিলেন, চক্রটির আরও সদস্য কক্সবাজারে অবস্থান করছেন বলে তথ্য রয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে এবং কয়েকজনের বিরুদ্ধে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে।