বলিউডের লড়াই একসময় সীমাবদ্ধ ছিল সিনেমার পর্দায়। কে ভালো অভিনয় করলেন, কার সিনেমা বক্স অফিসে এগিয়ে গেল কিংবা কোন নির্মাতার ছবি সমালোচকদের প্রশংসা পেল—এসবই ছিল প্রতিযোগিতার মূল জায়গা। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন বলিউডের সবচেয়ে তীব্র লড়াইগুলো চলছে মুঠোফোনের ছোট্ট পর্দায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সেখানে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ভুয়া অ্যাকাউন্ট, বিভ্রান্তিকর পোস্ট, ট্রেন্ডিং হ্যাশট্যাগ, সংগঠিত ট্রোল বাহিনী এবং কখনো কখনো একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক রিপোর্ট। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিদ্বন্দ্বী তারকা কিংবা সিনেমাকে কোণঠাসা করতে এই অদৃশ্য যুদ্ধে কোটি কোটি রুপি পর্যন্ত খরচ করা হচ্ছে। ঝলমলে বলিউডের আড়ালে গড়ে উঠেছে ‘পেইড ট্রোলিং’ বা অর্থের বিনিময়ে পরিচালিত অনলাইন প্রচারণার এক অন্ধকার জগৎ।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই জগতের নানা অভিযোগ ও অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে অনেক তারকার জনসংযোগ কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে অনলাইন রেপুটেশন ম্যানেজমেন্ট বা ওআরএম। একসময় যার প্রধান কাজ ছিল শিল্পীর ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি ও তা ধরে রাখা, কিন্তু অভিযোগ উঠেছে যে, এই কাজের আড়ালে কিছু প্রতিষ্ঠান প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে গুজব ছড়ানো, নেতিবাচক প্রচারণা চালানো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম জনমত তৈরির মতো কাজে জড়িয়ে পড়ছে।
একটি সাধারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট থেকেই শুরু হতে পারে গুজবের ঝড়। উদাহরণস্বরূপ, কোনো জনপ্রিয় অভিনেতা বিদেশে ছুটি কাটানোর ছবি দিলে এবং একই সময়ে অন্য কোনো তরুণীর ছবি সামনে এলে, কেউ যদি দুটির মধ্যে মিল খুঁজে পান, তবেই শুরু হয় জল্পনা। এরপর রেডিট, এক্স কিংবা ইনস্টাগ্রামে ছড়িয়ে পড়ে নানা দাবি। অভিযোগ অনুযায়ী, এরপরই সক্রিয় হয়ে ওঠে সংগঠিত অনলাইন নেটওয়ার্ক। শত শত অ্যাকাউন্ট থেকে একই ধরনের পোস্ট, অভিযোগ ও ইঙ্গিত বারবার সামনে আনা হয়, যাতে মনে হয় সাধারণ মানুষের মধ্যেই ব্যাপক আলোচনা চলছে। অভিনেতা কার্তিক আরিয়ানের ক্ষেত্রে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, যেখানে এক তরুণীকে ঘিরে বিভ্রান্তিকর দাবি ছড়ানো হয়। পরে ওই তরুণী নিজেই জানান, "আমি কার্তিক আরিয়ানকে চিনি না।" তবে ততক্ষণে গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল বহুদূর।
ট্রোলিংয়ের নতুন অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ‘মাস রিপোর্টিং’। অভিনেতা ও নির্মাতা অংশুমান ঝা অভিযোগ করেছেন, তাঁর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে ‘পেইড মাস রিপোর্টিং’ চালানো হয়েছিল। এর মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক অ্যাকাউন্ট থেকে একই সময়ে নির্দিষ্ট প্রোফাইল বা পোস্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানো হয়, যাতে অ্যাকাউন্টের কার্যক্রম সীমিত হয় বা সেটি বন্ধ হয়ে যায়। যেহেতু নতুন সিনেমার প্রচার ও ব্র্যান্ডের কাজের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন অপরিহার্য, তাই এই ধরনের আক্রমণ পেশাগত ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এই অদৃশ্য যুদ্ধের আর্থিক দিকটিও বিশাল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছোট পরিসরের অনলাইন প্রচারণায় কয়েক হাজার থেকে কয়েক লাখ রুপি খরচ হলেও, বড় সিনেমা বা তারকার দীর্ঘমেয়াদি প্রচারণার ক্ষেত্রে এই ব্যয় কয়েক কোটি রুপিতে পৌঁছানোর অভিযোগ রয়েছে। কোনো সিনেমার বিরুদ্ধে নেতিবাচক ধারণা তৈরি বা তারকার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বিতর্ক ছড়াতে দীর্ঘদিন ধরে এই প্রচারণা চালানো হয়।
শুধু তারকা নন, বিজ্ঞাপনও এই আক্রমণের শিকার হচ্ছে। কৃতি শ্যাননের একটি রাখিবন্ধনভিত্তিক বিজ্ঞাপন ব্যাপক নেতিবাচক প্রচারণার মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত প্রত্যাহার করতে হয়। এমনকি চলচ্চিত্র সমালোচকদের বিরুদ্ধেও সংগঠিত ট্রোলিং চালানো হয়; কোনো সমালোচনা পছন্দ না হলে ব্যক্তিগত আক্রমণ বা তাঁদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
এই যুদ্ধের মানসিক প্রভাব অত্যন্ত গুরুতর। অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা বোস জানিয়েছেন, তিনি শুধু প্রকাশ্য পোস্টে নয়, ব্যক্তিগত বার্তাতেও হয়রানির শিকার হয়েছেন। রাজনৈতিক মতপ্রকাশের পর তাঁর ও তাঁর সঙ্গীর ব্যক্তিগত ইনবক্সে আক্রমণ শুরু হয়। অভিনয় প্রশিক্ষক ও নির্মাতা অতুল মঙ্গিয়ার মতে, ভারতে অন্তত এক দশক ধরে এ ধরনের পেইড ট্রোলিংয়ের অভিযোগ রয়েছে, যা অনেক সময় শিল্পীর পরিবার ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে।
বলিউডের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ নতুন নয়। ২০২১ সালে অভিনেতা আরবাজ খান বলেছিলেন, "বলিউডকে লক্ষ্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ঘৃণার ঢেউ তৈরি হয়েছিল, তার একটি বড় অংশ পরিকল্পিত।"
অন্যদিকে ২০২৫ সালে অভিষেক বচ্চনকে ঘিরে ‘পেইড পিআর’ ও ‘পুরস্কার কেনা’র অভিযোগ ওঠে। তিনি তা অস্বীকার করে জানান, তাঁর জবাব একটাই—"কঠোর পরিশ্রম।"
সংগঠিত ট্রোলিংয়ের সাফল্যের পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম বড় ভূমিকা রাখে। বিতর্কিত ও আবেগপ্রবণ পোস্ট দ্রুত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সত্য প্রকাশের আগেই একটি নির্দিষ্ট ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।
বলিউডে প্রতিযোগিতা সবসময়ই ছিল, যা অনেক সময় ভালো সিনেমা ও অভিনয়ের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু এই লড়াই যদি অভিনয় বা নির্মাণশৈলীর বদলে ভুয়া প্রচারণা ও চরিত্রহননে পরিণত হয়, তবে তা পুরো শিল্পের ক্ষতি করে। দর্শক বিভ্রান্ত হন এবং শিল্পীর মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখন প্রশ্ন উঠেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে আমরা কি সত্যিই নিজস্ব মতামত তৈরি করছি, নাকি অদৃশ্য ট্রোল বাহিনী আমাদের বলে দিচ্ছে কাকে ভালোবাসতে হবে আর কাকে ঘৃণা করতে হবে? শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্রের সাফল্য কি দর্শকের রুচি ও মানের ওপর নির্ভর করবে, নাকি কোটি টাকার কৃত্রিম জনমতের ওপর? বলিউডে এই প্রশ্নটি এখন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।