ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও নিয়মাবলির অভাব এবং অন্দরমহলে নজিরবিহীন মতবিরোধের কথা সামনে এসেছে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। তিন সদস্যের এই কমিশনে দুই কমিশনার বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলেও তা অগ্রাহ্য করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এই তথ্যের ফলে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন ছিল না বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বুধবার প্রকাশিত তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ভোটার তালিকায় নাম তোলা, নাম বাদ দেওয়া, নতুন ভোটারদের জন্য ফরম পরিবর্তন, তথ্যের নিয়ন্ত্রণ এবং পশ্চিমবঙ্গে ভোটারদের নাম পুনর্বহাল সংক্রান্ত একাধিক বিষয়ে কমিশনের ভেতরে তীব্র সংঘাত দেখা দিয়েছে। গত ১০ মাসে কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি অন্তত ১৪ বার লিখিতভাবে তাঁদের আপত্তির কথা জানিয়েছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কমিশন এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে যার বিষয়ে ওই দুই কমিশনার সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিলেন। কিছু সিদ্ধান্তকে তাঁরা সরাসরি ‘অননুমোদিত’ ও ‘বেআইনি’ বলে অভিহিত করেছেন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদক এই তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে দিল্লি, কলকাতা, গোয়া ও মুম্বাইয়ের নির্বাচন কমিশনের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছেন এবং অভ্যন্তরীণ নথি পর্যালোচনা করেছেন।

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের তত্ত্বাবধানে দেশজুড়ে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া শুরু হয় বিহার বিধানসভা ভোটের আগে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের সময় এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে আপত্তি আরও তীব্র হয়। জানা গেছে, গত ১০ মাসে সান্ধু ও যোশি আনুষ্ঠানিকভাবে ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন, এমনকি একদিনে চারবার আপত্তি নথিভুক্ত করেছেন তাঁরা।

বিশেষ করে নতুন ভোটারের নাম তোলার জন্য ‘ফরম ৬’-এ পরিবর্তন নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। চলতি বছরের জুলাই মাসে ফরমটিতে একটি নতুন প্রশ্ন যোগ করা হয়, যেখানে আবেদনকারীর পূর্বপুরুষদের নাম ২০০২ সালের এসআইআরের পর তালিকায় ছিল কি না তা জানতে চাওয়া হয়। মে মাসেই কমিশনার বিবেক যোশি জানিয়েছিলেন, কেন্দ্রীয় সরকার নিয়ম না বদলালে এভাবে ফরম ৬-এ পরিবর্তন সম্ভব নয় এবং কমিশনার সান্ধুও এতে একমত ছিলেন। তা সত্ত্বেও পরিবর্তনটি কার্যকর করা হয়। গত ১৩ আগস্ট কমিশনার সান্ধু এই পরিবর্তনকে ‘অননুমোদিত ও বেআইনি’ বলে তা সরানোর অনুরোধ জানান।

ভোটার ডেটাবেজের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আগে ‘ইআরওনেট’ সফটওয়্যারে ভোটার তালিকা থাকলেও এখন তা ‘ইসিআইনেট’-এ রাখা হয়, যা কমিশনের আইটি বিভাগের পরিচালক নিয়ন্ত্রণ করেন। এই কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থার ফলে রাজ্যস্তরের কর্মকর্তাদের অধিকার খর্ব হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন কমিশনার সান্ধু। মে মাসে কমিশনার যোশি এই উদ্যোগকে ‘ক্রমেই কেন্দ্রীভূত’ বলে চিহ্নিত করেন। আইটি ব্যবস্থার এই নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই কমিশনার এতটাই উদ্বিগ্ন ছিলেন যে বিষয়টি তাঁরা কেবিনেট সচিবের কাছেও উত্থাপন করেন।

পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর সংক্রান্ত মামলা বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন। ইসি জানিয়েছে, ট্রাইব্যুনালগুলোতে ৩৮ লাখ আবেদন pending রয়েছে। এর মধ্যে ২২ লাখ ২১ হাজার ভোটার নাম তোলার জন্য এবং ১৬ লাখ ১০ হাজার ভোটার নাম কাটার জন্য আবেদন করেছেন। নাম কাটার আবেদনগুলো কারা করেছেন, তা ইসি খোলসা করেনি। আগস্টে কমিশনার সান্ধু জানতে চান, কমিশনের হয়ে এই আবেদনের অনুমোদন কে দিয়েছেন এবং বাস্তবে কারা আপিল করেছেন। সান্ধুর অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি, যোশি কিংবা পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্য নির্বাচনী কর্মকর্তা—কেউই এই আপিলের ভিত্তি বা প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না।

সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের কাজ সর্বসম্মতভাবে পরিচালিত হওয়ার কথা এবং মতপার্থক্য হলে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত গৃহীত হওয়ার কথা। তবে এখানে দেখা যাচ্ছে, দুই কমিশনারের আপত্তি সত্ত্বেও একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই বিষয়ে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস নির্বাচন কমিশন এবং দুই কমিশনারের কাছে বিস্তারিত জানতে চাইলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।