আদনান আলীর লেখা ‘পতিত পাথর’ শিরোনামের রচনাটি জীবনের গন্তব্যহীন যাত্রা, অন্তরের নিঃসঙ্গতা এবং মানবিক অস্তিত্বের দার্শনিক খোঁজকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে। ট্রেনের দরজা, প্ল্যাটফর্মের জনস্রোত এবং পাথরের প্রতীকী ব্যবহারের মাধ্যমে লেখক আমাদের দৈনন্দিন বেঁচে থাকার সংগ্রামকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন।

রচনায় দরজা খোলার অপেক্ষা ও পিছন থেকে অনুভূত চাপের বর্ণনা দিয়ে শুরুতেই পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগে। অনেকগুলো দৃষ্টির নিবিড়তা ও দরজা না খোলার তাগিদে লেখক অনুভব করেন, যেন প্ল্যাটফর্মে লাফ দিলেই অনন্ত ব্ল্যাকহোলে বা অনন্ত শূন্যতায় পতিত হতে হবে। শেষ পর্যন্ত দরজা খুললেই যেমন সাবলীলভাবে জনস্রোত ভেঙে বেরিয়ে আসা যায়, তেমনি করেই লেখক নিজের অবয়বে ফিরে আসেন। পাহাড়ি ঝরনার ধারের মসৃণ পাথরের কথা মনে পড়ে, যা স্রোতের ধাক্কায় সময়ের সাথে সুগোল হয়ে গেছে। এখানে লেখক প্রশ্ন তোলেন, জনস্রোতের সামনে অনাদিকাল দাঁড়ালে কি এবড়োখেবড়ো জীবনও মসৃণ রূপ নেবে? তবে সংবিৎ ফিরে তিনি মনে করিয়ে দেন, পৌঁছানোই তো প্রতিদিনের প্রধান কাজ। ঘর থেকে, ট্রেন থেকে বা মাতৃগহ্বর থেকে বের হওয়ার পেছনে এই পৌঁছানোর তাগিদই কাজ করে। এই তাগিদ ছাড়া মানুষ হয়তো স্থায়ীভাবে পাথর হয়ে যেত। কিন্তু মানুষ তার মনুষ্যত্ব নিয়ে কোথাও পৌঁছানোর তাড়ায় বেঁচে থাকে, গল্প ও ইতিহাস সৃষ্টি করে।

তবে লেখক স্বীকার করেন, তিনি কখনোই নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন না। দেরি হওয়া, অক্ষমতা ও স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর অভিজ্ঞতা। মানুষ স্রোতের মতো অনায়াসে এগিয়ে যায়, আর তিনি পিছিয়ে পড়েন। আজও তিনি ট্রেন থেকে নামেন, যদিও সে ট্রেনটি হয়তো আগে কখনো আসেনি বা ভবিষ্যতেও আসবে না। শেষ যাত্রী হিসেবেই হোক, পরের স্টেশনে যাওয়ার ঝুঁকি নেওয়া সম্ভব নয়, কারণ তাহলে এমন জায়গায় পৌঁছে যাব, যেখানে না পৌঁছানোর জন্যই প্রতিদিন বাসা থেকে বের হওয়া হয়।

নড়তে পেরে ডানে-বাঁয়ে তাকালে লেখক বুঝতে পারেন, ট্রেন হয়তো দিক ভুল দেখানোর জন্যই দিনে ডানে, দিনে বাঁয়ে এসে থামে। ভুল দিকে বের হয়ে হন্যে হয়ে খোঁজা হয় সেই জায়গা, যা পৌঁছানোর কথা ছিল। মাঝেমধ্যে মনে হয়, প্রতিদিন কি একই জায়গায় যাওয়া হচ্ছে? নাকি জায়গাগুলোই একই থাকছে? যদি জায়গাগুলোরও পৌঁছানোর তাড়া থাকে, তবে থেমে থাকা সম্ভব নয়। লেখক অনুধাবন করেন, হয়তো প্রতিবার আলাদা ট্রেনে ওঠা হয়। আগের ট্রেনগুলো আর ফেরেনি, কারণ ওরা দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে গেছে। জায়গাগুলোও দিকভুল করে পৌঁছানোর খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরছে, আর এর আনাড়িপনার মূল্য দিতে হচ্ছে লেখককে।

তবুও হতোদ্যম হন না লেখক। বিশাল প্রাপ্তির আশা থেকে নয়, বরং পাথর হওয়ার ভয় থেকে। ব্যর্থতা, অপ্রাপ্তি ও না হয়ে ওঠার ভার যখন পাথরের মতো বুকে চেপে বসে, তখন দম আটকে যায়। ঝরনার পানির ঘষায় সুগোল ও ঝঞ্ঝাটহীন পাথর হওয়ার লোভ জাগলেও, অনন্তকাল একই দৃশ্য ও স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকার ভয়ে তিনি পাথর হতে চান না। একঘেয়েমি থেকে বাঁচার আশায়ই বারবার পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। ফলে কোথাও পৌঁছাতে না পারলেও, বের হওয়া ও পরবর্তী গন্তব্যে যাত্রা শুরু করার সফলতায় তিনি পাথর না হয়ে বেঁচে থাকেন।

প্ল্যাটফর্মের সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় জনস্রোতে কদাচিৎ চোখ আটকে যায় কিছু মানুষের দিকে। বহিরাবরণে তারা সাধারণ শহরের মানুষের মতোই মনে হলেও, তাদের চোখই তাদের আলাদা করে দেয়। যেকোনোভাবে নজর পড়লেই চোখগুলো থমকে দিতে বাধ্য করে। কিছু মানুষের চোখ এমন, যা দেখার জন্য সরাসরি তাকাতে হয় না। তারা মাছির চোখের মতো সর্বাঙ্গে বিস্তৃত, এমনকি অন্যের মনের মধ্যেও ঢুকে পড়ে। অদ্ভুত উজ্জ্বলতায় ভরপুর সেই চোখগুলো যেন নিশ্চিত করে দেয়, ডান দিকে যেতে হবে নাকি বাঁ দিকে। লেখক একজনের পিছু নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, যাতে দুশ্চিন্তা দূর হয়। তবে জানেন, দুটো মানুষের একসঙ্গে পৌঁছানোর জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট জায়গা নেই। এই মানুষগুলোর সঠিক গন্তব্য ও ক্রমস্থানান্তরিত অবস্থান নিরূপিত আছে। এদের দেখলে শরীর এলিয়ে দিয়ে অনুসরণ করতে ইচ্ছা হলেও, দীর্ঘ যাত্রায় লেখক শিখেছেন, পাশের জনের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা গন্তব্য নিয়ে আমরা সবাই ছুটে চলছি। হয়তো কোনো মুহূর্ত বা যুগ পাশাপাশি কাটিই, ঠিক যেমন ট্রেনে পাশাপাশি বসে আলাদা স্টেশনে নামি। কারও মনে হতে পারে একই স্টেশনে নামা হচ্ছে, কিন্তু নামা এক হলেও স্টেশনগুলো প্রত্যেকের জন্য আলাদা।

রচনার শেষের দিকে লেখক একটি গভীর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। পৃথিবীতে যদি ৭০০ কোটি মানুষ থাকে, তাহলে একই নামে ও অবস্থানে রয়েছে ৭০০ কোটি স্টেশন, ৭০০ কোটি গন্তব্য ও ৭০০ কোটি গন্তব্যহীনতা। ফলে পৃথিবীতে সর্বদা বিরাজ করে ৭০০ কোটি নিঃসঙ্গতা। কিন্তু এই নিঃসঙ্গতাই মানুষকে তাড়িত করে। একে জয় করার বাসনাই পরের দিন নতুন গন্তব্যের জন্য আশ্রয় থেকে বের করে আনে। শতসহস্র কোটি পৌঁছানো-না-পৌঁছানোর জয়-পরাজয়ের মধ্যে মানুষ বা পাথর আসলে গোটা গ্রহের গন্তব্য ঠিক করে দেয়। মহাকাশের এমন কোনো গ্রহের কথা ভাবা যায়, যেখানে অনেক পাথর আছে, কিন্তু একটি পাথর কেবল আর মাত্র একটি পাথরের দিকেই চেয়ে থাকে। লক্ষ্যহীন আবেশে দুপাশ কেটে বের হওয়া কলকল প্রবাহে সে কেবল সুমসৃণ হয়। হয়তো তারাও একদিন ৭০০ কোটি আকাঙ্ক্ষা বহন করত। কিন্তু সম্মিলিত পৌঁছে যাওয়ার সফলতায় সেই গ্রহে এখন আর প্রাণ বলে কিছু অবশিষ্ট নেই।