বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিস্মৃত মানুষ, পুরোনো সাময়িকপত্র, লোকসংস্কৃতি ও আঞ্চলিক ইতিহাসের নানা অনালোচিত অধ্যায় উদ্ধার করে চলেছেন গবেষক আবুল আহসান চৌধুরী । লালন ফকির, কাঙাল হরিনাথ মজুমদার ও মীর মশাররফ হোসেনকে নতুন করে দেখার পাশাপাশি তাঁর গবেষণার পরিসর ছড়িয়ে আছে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিস্তৃত ভূগোলে। গবেষণার পথ, লালনচর্চা, বিস্মৃত ইতিহাস, বর্তমান গবেষণার সংকটসহ নানা বিষয়ে তাঁর সঙ্গে মুক্তকণ্ঠ র পক্ষে কথা বলেছেন ফিরোজ এহতেশাম ।

মুক্তকণ্ঠ: আপনার সাহিত্য ও গবেষণার জগতে প্রবেশের গল্পটি কেমন? কোন মানুষ, বই বা ঘটনা আপনাকে গবেষণার পথে নিয়ে এসেছিল?

আবুল আহসান চৌধুরী: ছেলেবেলা থেকেই আমার বসবাস বইয়ের সঙ্গে। বলা চলে, আমাদের বাড়িটা ছিল বইয়ের বাড়ি। নানা ধরনের বইয়ের সংগ্রহ ছিল, তার সংখ্যাও কম নয়। আর ছিল প্রচুর দুর্লভ পত্র-পত্রিকা। প্রবাসী , কল্লোল , মোহাম্মদী , সওগাত , নওরোজ , দীপিকা , জাগরণী —এসব ছিল আমার পিতা ফজলুল বারি চৌধুরীর সংগ্রহ—বাঁধানো, থরে থরে আলমারিতে সাজানো। বাড়িতে সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার আবহ ছিল। আমার পিতা ছিলেন সাহিত্যমনস্ক, লেখালেখির সঙ্গেও তাঁর যোগ ছিল। তিরিশের দশকে তিনি কুষ্টিয়ায় অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে মহকুমা হাকিম অন্নদাশঙ্কর রায়ের সহকর্মী ছিলেন। ওই সময়ে লেখা তাঁর কিছু গল্প নিয়ে প্রায় নব্বই বছর পর আগুনের খেলা ও অন্যান্য গল্প (২০২৫) নামে হালে একটি বই বের হয়েছে। কিছুকাল আগে প্রয়াত কথাশিল্পী অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এই বইয়ের একটি অনবদ্য ভূমিকা লিখে দেন। অগ্রজদের মধ্যেও কেউ কেউ সাহিত্য বা সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সাহিত্যের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ ও প্রেরণা বাড়ির পরিবেশ থেকেই এসেছিল। ফি-বছর অন্তত বার-দুই মাতুল ড. কাজী মোতাহার হোসেন কুষ্টিয়ায় আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসতেন। তাঁর আগমনে পরিবারে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হতো। জ্ঞানী পণ্ডিত, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, লেখক, দাবাড়ু—এসব পরিচয়েই আমাদের কাছে তিনি ছিলেন স্মরণীয়। তাঁর সঙ্গ-সান্নিধ্য নিঃসন্দেহে লেখালেখির ব্যাপারে প্রেরণা জুগিয়েছে। লেখার মকশো-খাতা তিনি সাগ্রহে সংশোধন করে দিতেন। এ তো গেল সাহিত্যের ঘরে প্রবেশের অধ্যায়, মানে প্রথম পর্ব। এর পরে লালন ও লোকসংস্কৃতি চর্চায়, বাউলের পরিভাষায়, আমার ‘চক্ষুদানী’র গুরু হারামণি র সংগ্রাহক-সংকলক অধ্যাপক মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন—তিনিই আমাকে হাত ধরে নিয়ে যান লোকায়ত সংস্কৃতির ভুবনে। পরে সমর্থন-সহযোগিতা-নির্দেশনা-উত্সাহ মিলেছে আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, অন্নদাশঙ্কর রায়, সৈয়দ মুর্তাজা আলী ও আমার শিক্ষক ড. আহমদ শরীফের কাছ থেকে। আসলে আমার ক্ষেত্রে লোকসংস্কৃতি চর্চার ভেতর দিয়েই অন্যান্য বিষয়ের প্রতি কৌতূহল ও অনুরাগ জেগেছে—গবেষণার বিষয়বৈচিত্র্য এরপর নানা পথে ডানা মেলেছে।

আসলেই কিংবদন্তি-শাসিত, ধর্মীয় আলখাল্লায় আবদ্ধ, নানা অপব্যাখ্যায় পীড়িত বিপন্ন লালনকে আজ উদ্ধার প্রয়োজন। ভক্তির আতিশয্য ও নির্মম বিদ্বেষের হাত থেকেও তাঁর মুক্তি হোক, এই দাবি করি। জাতপাত, সম্প্রদায়-বিদ্বেষ, শাস্ত্র-ধর্মের দুঃসহ প্রতাপ, শ্রেণিপীড়ন, সামন্তশোষণ, সামাজিক অনাচার, নারীর নিগ্রহ, মনুষ্যত্বের অবমাননা, মানবতার লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে লালন আজীবন তাঁর লড়াই জারি রেখেছিলেন।

মুক্তকণ্ঠ: বিস্মৃত মানুষ, পুরোনো সাময়িকপত্র, আঞ্চলিক ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি—এত বৈচিত্র্যের মধ্যে কোনটি আপনাকে সবচেয়ে বেশি টানে?

আবুল আহসান চৌধুরী: জটিল প্রশ্ন বটে। সপ্তবর্ণের রংধনুর কোন রং সবচেয়ে প্রিয়, এ প্রশ্নের জবাবের মতো এও বলা ভারি মুশকিল যে, বিস্মৃত মানুষ, পুরনো সাময়িকপত্র, আঞ্চলিক ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি—এসব বিষয়ের মধ্যে কোনটির প্রতি আমার অনুরাগ ও আকর্ষণ সবচেয়ে বেশি। দ্বিধা কাটিয়ে যদি বলতেই হয় তবে সে রায় যাবে লোকসংস্কৃতির পক্ষেই। আমার চর্চার কেন্দ্রে লোকসংস্কৃতি থাকলেও পুরনো সাময়িকপত্রের মোহ, বিস্মৃত মানুষের প্রতি অনুরাগ, গ্রাম-জনপদের বিলুপ্ত ইতিহাস উদ্ধার আমাকে নিয়ত নিরন্তর টানে—ভিন্ন অর্থে বিষয়গুলো পরস্পর সম্পর্কিত।

মুক্তকণ্ঠ: অনেক লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে আপনি গবেষণার মাধ্যমে নতুন করে সামনে এনেছেন। পুরোনো ইতিহাস ফিরিয়ে এনে বর্তমানে আমাদের কী লাভ হয়?

আবুল আহসান চৌধুরী: এর জবাব দিতে গিয়ে শুরুতেই জীবনানন্দ দাশের একটি কবিতার আশ্রয় নেব: ‘মানুষের মৃত্যু হ’লে তবুও মানব/থেকে যায়; অতীতের থেকে উঠে আজকের মানুষের কাছে/আরো ভালো—আরো স্থির দিকনির্ণয়ের মতো চেতনার/পরিমাপে নিয়ন্ত্রিত কাজ/কত দূর অগ্রসর হ’য়ে গেল জেনে নিতে আসে।’ আমার মনে হয়, অতীতকে শুধু রোমন্থন বা বন্দনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা অনুচিত, অতীতের অভিজ্ঞতা পুনর্নির্মাণেরও প্রেরণা ও সুযোগ করে দেয়। আমাদের ইতিহাস-দৃষ্টিকে স্বচ্ছ ও ঐতিহ্য-চেতনাকে শাণিত করে তোলে এই ধরনের কাজ। এর মাধ্যমে অতীত ও বর্তমানের তুলনা সম্ভব এবং এর ভিতের ওপরেই ভবিষ্যতের নির্মাণ নির্ভর করে অনেকাংশে।

মুক্তকণ্ঠ: লালন ফকিরকে ঘিরে কিংবদন্তি, ধর্মীয় পরিচয়ের বিতর্ক, গান ও দর্শনের নানা ব্যাখ্যা—এসবের ভেতর থেকে ঐতিহাসিক লালনকে খুঁজে পাব কী করে?

আবুল আহসান চৌধুরী: ফকির লালন সাঁইকে আমি দুইভাবে দেখি—মরমি ও দ্রোহী। বাংলার লোকায়ত ধারার সাধনার শ্রেষ্ঠ মরমি মহাজন তিনি। তাঁর সাধনার বহমান ধারা, অনন্য ভাবচেতনার স্মারক তাঁর পদাবলি ও লোকশিক্ষার সামাজিক ভাষণের ভেতর দিয়ে তিনি আড়াইশো বছরেরও বেশি সময় বাঙালি সমাজে সমাদর পেয়ে আসছেন। লালনচর্চার বয়সও দেড় শতক পেরিয়ে গেছে। লালনকে নিয়ে শতাধিক বই, বোধহয় হাজারেরও বেশি প্রবন্ধ লেখা হয়েছে। এসবের সিংহভাগই অনধিকার চর্চা ও অপচর্চার নিদর্শন। অথচ বাংলার লৌকিক সমাজ ও সংস্কৃতিতে এই মহাত্মার যে ঐতিহাসিক অবদান সেইদিকে তেমন কারও নজর পড়েনি। আসলেই কিংবদন্তি-শাসিত, ধর্মীয় আলখাল্লায় আবদ্ধ, নানা অপব্যাখ্যায় পীড়িত বিপন্ন লালনকে আজ উদ্ধার প্রয়োজন। ভক্তির আতিশয্য ও নির্মম বিদ্বেষের হাত থেকেও তাঁর মুক্তি হোক, এই দাবি করি। জাতপাত, সম্প্রদায়-বিদ্বেষ, শাস্ত্র-ধর্মের দুঃসহ প্রতাপ, শ্রেণিপীড়ন, সামন্তশোষণ, সামাজিক অনাচার, নারীর নিগ্রহ, মনুষ্যত্বের অবমাননা, মানবতার লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে লালন আজীবন তাঁর লড়াই জারি রেখেছিলেন। রামমোহনকে উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের নায়ক বলা হয়ে থাকে—তাঁর কর্মকাণ্ড ছিল মূলত কলকাতা মহানগরীকে কেন্দ্র করে, বিশাল বাংলার গ্রামীণ জনপদ ছিল অন্ধকারে নিমজ্জিত। লালন ছিলেন এই তমসা ছিন্ন করার এক অক্লান্ত মশালচি। তাই শিক্ষিত নগরবাসীর জাগরণে রামমোহনের যে ভূমিকা, নিরক্ষর পিছিয়ে পড়া গ্রামীণ মানুষকে আলোকিত করার ক্ষেত্রে লালনের সেই একই ভূমিকা। অমলেন্দু দে বা অন্নদাশঙ্কর রায় এ বিষয়ে ইঙ্গিত দিলেও এ নিয়ে তেমন কোনো কাজ হয়নি। অপ্রয়োজনীয় আলোচনার আবর্জনা সরিয়ে এখন লালনকে নতুন চোখে দেখা দরকার।

মীর মশাররফ হোসেন খুবই বড় মাপের লেখক। অথচ তাঁকে বরাবর ‘শ্রেষ্ঠ মুসলমান সাহিত্যিক’—এই ধরনের অভিধায় খণ্ডিত ও সীমাবদ্ধ করা হয়। উনিশ শতকের মূলধারার সাহিত্যেই তিনি অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক। এটা বঙ্কিমচন্দ্র, অক্ষয়চন্দ্র সরকার, রাজেন্দ্রলাল মিত্র বুঝেছিলেন, মুসলিম লেখক-সমালোচক-সাময়িকপত্র সম্পাদকেরা বোঝেননি।

মুক্তকণ্ঠ: কাঙাল হরিনাথ মজুমদারকে আমরা সাংবাদিক বা লেখক হিসেবে পড়ব, নাকি উনিশ শতকের সমাজ-বাস্তবতার একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে?

আবুল আহসান চৌধুরী: কাঙাল হরিনাথ মজুমদার উনিশ শতকের নবজাগরণের গ্রামীণ অধ্যায়ের এক স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। কুমারখালীর মতো অজপাড়াগাঁয়ে ছিল তাঁর বাস। সেখানে বসেই তিনি লিখেছেন, লিখিয়েছেন, ছাপাখানা বসিয়ে পত্রিকা করেছেন। জমিদার, নীলকর, মহাজন, প্রশাসক, পুলিশের অত্যাচার-অপকর্মের কথা তাঁর গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা পত্রিকায় প্রকাশ করে যথারীতি বিপন্ন হয়েছেন। এই দুঃসময়ে হরিনাথের সহায় হয়েছেন পরম-বান্ধব লালন ফকির। হরিনাথ ছিলেন মীর মশাররফ হোসেন, জলধর সেন, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, শিবচন্দ্র বিদ্যার্ণব, দীনেন্দ্রকুমার রায়ের মতো সেকালের কীর্তিবাস লেখকের সাহিত্যগুরু। শিবনাথ শাস্ত্রী হরিনাথের বিজয়-বসন্ত আখ্যানকে আলালের ঘরের দুলাল –এর সঙ্গে বন্ধনীভুক্ত করে বাংলা সাহিত্যের ‘প্রথম উপন্যাস’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর বাউলগান এককালে বঙ্গদেশ মাতিয়েছিল। এসব মিলিয়েই তিনি উনিশ শতকের সমাজ-বাস্তবতার সাক্ষী, গ্রামীণ সাংবাদিকতার জনক এবং সেইসঙ্গে সেই রেনেসাঁর অংশও হয়ে উঠেছিলেন।

মুক্তকণ্ঠ: মীর মশাররফ হোসেনের সাহিত্যিক মূল্যায়নে কোন দিকগুলো এখনো যথেষ্ট আলোচিত হয়নি বলে মনে করেন?

আবুল আহসান চৌধুরী: মীর মশাররফ হোসেন খুবই বড় মাপের লেখক। অথচ তাঁকে বরাবর ‘শ্রেষ্ঠ মুসলমান সাহিত্যিক’—এই ধরনের অভিধায় খণ্ডিত ও সীমাবদ্ধ করা হয়। উনিশ শতকের মূলধারার সাহিত্যেই তিনি অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক। এটা বঙ্কিমচন্দ্র, অক্ষয়চন্দ্র সরকার, রাজেন্দ্রলাল মিত্র বুঝেছিলেন, মুসলিম লেখক-সমালোচক-সাময়িকপত্র সম্পাদকেরা বোঝেননি। নজরুলের অনেক আগেই তিনি নিজের সমাজ-সম্প্রদায়ের কাছ থেকে ‘কাফের’ খেতাব পেয়েছিলেন—তাঁর বিপক্ষেও ‘বিবি তালাকের ফতোয়া’ জারি হয়েছিল। জীবিতকালে তাঁকে অনুচিত নিন্দা-সমালোচনা-অপমান-কারাবাস সবই সহ্য করতে হয়েছিল। মুনীর চৌধুরী, কাজী আবদুল মান্নান, মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল বা শামসুজ্জামান খান ছাড়া আর তেমন কারও নাম মনে পড়ে না যাঁদের লেখায় নতুন তথ্য ও মূল্যায়নে মশাররফ চর্চা সমৃদ্ধ হয়েছে। মশাররফের জীবন ও সাহিত্যের অনেক উপকরণই দুষ্প্রাপ্য, ফলে মশাররফকে দেখা স্পষ্ট হয়নি। আমি চেষ্টা করেছি তাঁর দুর্লভ বইগুলো সংগ্রহ ও প্রকাশের। মশাররফের অতি-মূল্যবান অপ্রকাশিত ডায়েরি আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে। মশাররফ-সম্পাদিত হিতকরী পত্রিকা এখন আর কোথাও পাওয়া যায় না। এই পত্রিকা প্রকাশের প্রস্তাব আমাদের মননের প্রতীক বাংলা একাডেমি ফিরিয়ে দেয়। পরে কলকাতার ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ’ সাগ্রহে তা প্রকাশ করে। এখন প্রয়োজন মশাররফের একটি তথ্যবহুল, বস্তুনিষ্ঠ ও বিশদ জীবনী রচনা। প্রয়োজন মশাররফের দুষ্প্রাপ্য বই, অপ্রকাশিত-অগ্রন্থিত রচনা ও সম্পাদিত আজীজন নেহার পত্রিকা সংগ্রহ ও প্রকাশ। সামাজিক প্রেক্ষাপটে তাঁর সাহিত্যের বিচার, মশাররফ-সাহিত্যের তুলনামূলক আলোচনা, উত্তরকালে মশাররফ-রচনার আবেদন—এসব বিষয়ে আলোচনা জরুরি।

লোকসাহিত্যের উপকরণ সংগ্রহ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ সংগৃহীত উপকরণের পদ্ধতিভিত্তিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং সেই সূত্রে প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন উত্থাপন। মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন বা জসীমউদ্‌দীন সংগ্রহ ও ব্যাখ্যা দুই কাজই করেছেন, এক্ষেত্রে আশুতোষ ভট্টাচার্যের নামও করতে হয়।

মুক্তকণ্ঠ: উনিশ শতকের মুসলমান সমাজকে বুঝতে পুরোনো সাময়িকপত্র কতটা গুরুত্বপূর্ণ? আপনার গবেষণায় সাময়িকপত্র ও সংবাদপত্রের ভূমিকা কীভাবে কাজ করেছে?

আবুল আহসান চৌধুরী: মুসলমান কেন, উনিশ শতকের বাঙালি সমাজকেও জানা-বোঝা-চেনার ক্ষেত্রে পুরনো সাময়িকপত্রের কোনো বিকল্প নেই। আমার গবেষণামূলক কাজে সংবাদ-সাময়িকপত্রের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাময়িকপত্রের বিবরণ বা তথ্য আমার বক্তব্যকে পোক্ত এবং বিষয়কে প্রাঞ্জল করে তুলতে সহায়ক হয়েছে। সব সময় মূল পত্রিকা দেখার চেষ্টা করি, না পেলে ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিজয় ঘোষ, আনিসুজ্জামান, মুস্তাফা নূরউল ইসলাম বা অন্যদের সংকলিত বইয়ের সহায়তা গ্রহণ করতে হয়।

মুক্তকণ্ঠ: কুষ্টিয়া বা বাংলার স্থানীয় ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গিয়ে এমন কিছু কি কখনো পেয়েছেন, যা প্রচলিত ইতিহাসের বয়ানকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে?

আবুল আহসান চৌধুরী: কুষ্টিয়ায় নীলচাষ সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে গিয়ে চমকপ্রদ তথ্য পেয়েছি। টি. আই. কেনী ছিলেন কুষ্টিয়ার কুখ্যাত নীলকর। তাঁর নির্মম অত্যাচারে রায়ত-প্রজার জীবন হয়ে উঠেছিল অতিষ্ঠ। আমলা-সদরপুরের জমিদার ছিলেন প্যারীসুন্দরী—তিনি কেনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। মীর মশাররফ হোসেনের উদাসীন পথিকের মনের কথা য় কেনী-প্যারীসুন্দরী দ্বন্দ্বের কথা আছে। আমি ১৯৬৯ সাল থেকে আমলা-সদরপুর যাওয়া-আসা শুরু করি। আশপাশের প্রবীণ মানুষের স্মৃতি-শ্রুতিতে থাকা প্যারীসুন্দরী ও তাঁর পরিবার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়। মৌখিক ইতিহাসও যে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হতে পারে, পরে তা বুঝতে পারি। আমার সংগৃহীত প্যারীসুন্দরী-বিষয়ক তথ্যোপকরণ বিশিষ্ট ইতিহাস-গবেষক সৈয়দ মুর্তাজা আলীও ব্যবহার করেন। নীলবিদ্রোহের ইতিহাসে বেদনাদায়কভাবে প্যারীসুন্দরী অনুপস্থিত। তবে আমার সংগৃহীত তথ্য ও অন্যান্য সূত্রের উপকরণের সহযোগে যে বই প্রকাশিত হতে যাচ্ছে, আশা করি দীর্ঘকাল ইতিহাসে উপেক্ষিতা নীল-আন্দোলনের আঞ্চলিক নেত্রী প্যারীসুন্দরী মূলধারার ইতিহাসে স্থান করে নেবেন।

মুক্তকণ্ঠ: লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও গবেষণার ক্ষেত্রে গবেষকের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব কী—সংরক্ষণ, ব্যাখ্যা, নাকি প্রশ্ন তোলা?

আবুল আহসান চৌধুরী: লোকসাহিত্যের উপকরণ সংগ্রহ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ সংগৃহীত উপকরণের পদ্ধতিভিত্তিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং সেই সূত্রে প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন উত্থাপন। মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন বা জসীমউদ্‌দীন সংগ্রহ ও ব্যাখ্যা দুই কাজই করেছেন, এক্ষেত্রে আশুতোষ ভট্টাচার্যের নামও করতে হয়। তবে আধুনিক দৃষ্টির প্রথাসিদ্ধ আলোচনা পাওয়া যায় মযহারুল ইসলাম, আশরাফ সিদ্দিকী বা শামসুজ্জামান খানের লেখায়—বিবরণধর্মী পদ্ধতি ছেড়ে তাঁরা গ্রহণ করেছেন ফোকলোর-বিশ্লেষণের আধুনিক পদ্ধতি।

এর জবাব দিতে গেলে আফসোস ও হাহাকার জাগবে। সত্যিকার অর্থে আমাদের দেশে এখন আর কোনো গবেষণা হয় না—জাত-গবেষক গড়ে ওঠার সুযোগ নেই। এর জন্যে কমবেশি দায়ী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, বাংলা একাডেমিও তার দায় এড়াতে পারে না। অন্যান্য সারস্বত প্রতিষ্ঠানও এই অভিযোগের আওতার বাইরে নয়।

মুক্তকণ্ঠ: শুষ্ক তথ্যকে প্রাণবন্ত করে তোলার ক্ষেত্রে একজন গবেষকের সাহিত্যিক সংবেদনশীলতা কতটা জরুরি?

আবুল আহসান চৌধুরী: গবেষকের যদি সাহিত্যবোধ বা সাহিত্যদৃষ্টি, আরও স্পষ্ট করে বললে সৃজনশীল সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ না থাকে তবে তাঁর রচনা প্রাণহীন না হয়ে পারে না। মননধর্মী বা গবেষণামূলক যে ধরনের কাজই হোক না কেন ‘সাহিত্যিক সংবেদনশীলতা’ না থাকলে তা হয়ে ওঠে রিপোর্ট বা প্রতিবেদন বা নিছকই বিবরণধর্মী তথ্যপঞ্জি। সাহিত্যবোধ ভাষাকেও সংবেদ্য, ব্যঞ্জনাধর্মী ও গতিময় করে তোলে—বিষয়কে প্রাঞ্জল ও বিশ্লেষণকে যুক্তিনিষ্ঠ হতে সহায়তা করে। দৃষ্টান্ত হিসেবে চটজলদি যদি নাম করতে হয় তবে আসবে মুনীর চৌধুরী, সন্‌জীদা খাতুন, আনিসুজ্জামান, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, গোলাম মুরশিদ বা হায়াৎ মামুদের নাম।

মুক্তকণ্ঠ: আপনার নিজের কোন গবেষণাটি আপনাকে সবচেয়ে বেশি তৃপ্তি দিয়েছে?

আবুল আহসান চৌধুরী: আমি নানা বিষয়ে কাজ করেছি, আমার কাজের ভুবন বিচিত্র বিষয়কে ধারণ করেছে—লালন, কাঙাল হরিনাথ, মশাররফ, সংগীত-সংস্কৃতি, লোকসংস্কৃতি, সাময়িকপত্র, আঞ্চলিক ইতিহাস, বিস্মৃত লেখক এবং আরও অনেক বিষয়। তবে আমার প্রধান দুর্বলতা ও অনুরাগ লালনের প্রতি। তাই বাংলা একাডেমি লালন বিষয়ে যে বইটি প্রায় চল্লিশ বছর আগে বের করেছিল এবং পরে লালনকে নিয়ে আমার আরও যে একগুচ্ছ বই প্রকাশ পায়—এসব বই-ই আমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ, তৃপ্তি ও গৌরব দান করেছে।

মুক্তকণ্ঠ: এমন কোনো কাজ আছে কি, যেটি আপনি এখন নতুন করে করতে চাইতেন?

আবুল আহসান চৌধুরী: প্রায় এক যুগ আগে বাঙালির কলের গান নামে আমার একটি বই বের হয়েছিল। বয়স্ক বাঙালির মধুর স্মৃতি উসকে দেওয়ার নানা উপকরণ এতে আছে। যদি হাতে সময় ও সুযোগ থাকত তাহলে বইটির পুনর্লিখন ও পুনর্বিন্যাস করতে পারতাম।

মুক্তকণ্ঠ: এত বছর গবেষণা করার পর আজ বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা কী বলে মনে হয়?

আবুল আহসান চৌধুরী: এর জবাব দিতে গেলে আফসোস ও হাহাকার জাগবে। সত্যিকার অর্থে আমাদের দেশে এখন আর কোনো গবেষণা হয় না—জাত-গবেষক গড়ে ওঠার সুযোগ নেই। এর জন্যে কমবেশি দায়ী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, বাংলা একাডেমিও তার দায় এড়াতে পারে না। অন্যান্য সারস্বত প্রতিষ্ঠানও এই অভিযোগের আওতার বাইরে নয়। আর কী কখনো মানে-মাপে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. মুহম্মদ এনামুল হক, ড. আহমদ শরীফ, ড. আনিসুজ্জামানের মতো গবেষক পাওয়া যাবে! কবি আবদুল কাদির বা আবদুল মান্নান সৈয়দের মতো নিষ্ঠ সম্পাদনা-কুশলীর জন্যে কত কাল, কত যুগ প্রতীক্ষায় থাকতে হবে! এখন প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার বেশিরভাগই মানহীন, বৈচিত্র্যবর্জিত, পূর্বকথার চর্বিতচর্বণ, আবার কখনোবা কুম্ভিলক বৃত্তির নিকৃষ্ট নিদর্শন। বৈশ্য-সমাজের এই তো অনিবার্য নিয়তি!

মুক্তকণ্ঠ: আপনাকে ধন্যবাদ।

আবুল আহসান চৌধুরী: ধন্যবাদ আপনাকে।