২০২৫ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন লাসলো ক্রাসনাহোরকাই । তিনি হাঙ্গেরির জিউলায় ১৯৫৪ সালের ৫ জানুয়ারি এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর লেখাজুড়ে অন্ধকার, বিশৃঙ্খলা আর প্রলয়ের ঢেউ আধিপত্য বিস্তার করে। মহাজাগতিক ও মানবিক বিপর্যয় তাঁর লেখায় প্রকট হয়ে ওঠে গোলকধাঁধার মতো প্যাঁচানো, দীঘল ও উপবাক্যের বহর নিয়ে চলা বাক্যশৈলী, জটিল বর্ণনাভঙ্গি ও মেলানকলি ভাষায়। নোবেল কমিটির মতে, মহাবিপর্যয়ের মধ্যেও শিল্পশক্তির পুনরুত্থানই তার লেখার বড় শক্তি। লাসলোর উল্লেখযোগ্য বই হচ্ছে ‘শাতানতাঙ্গো’, ‘দ্য মেলানকলি অব রেজিস্ট্যান্স’, ‘ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার’, ‘সেইবো দেয়ার বিলো’, ‘ব্যারন ভেঙ্কহেমই’স হোমকামিং’। নোবেল পুরস্কার লাভের পর লাসলো ক্রাসনাহোরকাই একটি অসাধারণ বক্তৃতা প্রদান করেন। সেই বক্তৃতাটি অনুবাদ করেছেন নকিব মুকশি
সম্মানিত সুধীজন,
আমার আসলে ইচ্ছা ছিল, ২০২৫ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে ‘আশা’ নিয়ে আমার কিছু কথা আপনাদের সঙ্গে ভাগাভাগি করব। কিন্তু আশার যে সঞ্চয়টুকু আমার মধ্যে ছিল, তা যেন আজ ফুরিয়ে গেছে, ফলে আজ আমি আসমানি দূতদের নিয়ে আলাপ বলব।
১
আমি এদিক-সেদিক হাঁটি আর ঐশী দূতদের নিয়ে ভাবি, এমনকি এখনো আমি পায়চারি করছি, তাই নিজেদের চোখকে দয়া করে বিশ্বাস করবেন না—আপনাদের মনে হতে পারে, আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি, আর আপনাদের সামনে মাইক্রোফোনে কথা বলছি—আসলে তা নয়, বাস্তবে আমি হাঁটছি—কক্ষটির এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে, আবার আগের জায়গায় ফিরে আসছি, তারপর আবার, এভাবেই চলছে, ঘুরে ঘুরে, আর হ্যাঁ, আমি ঐশী দূতদের কথাই ভাবছি—আসমানি দূত, এখন মনে হচ্ছে, এরা নিশ্চয়ই নতুন ধরনের স্বর্গদূত, যাদের কোনো ডানা নেই, কারণ তাদের পিঠের ডানা দুটি যদি বাইরের দিকেই বেরিয়ে থাকে, আর যদি সেই দুটি বিশাল ডানা তাদের ঢিলেঢালা আলখাল্লার বাইরে অনেকটা ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে তো প্রশ্ন জাগেই—তাদের স্বর্গীয় দরজি আসলে কাজটা করেছেন কী, আর কী অজ্ঞতাই-বা তার কর্মশালায় ঢুকে পড়েছিল যখন তিনি তাদের পোশাকগুলো তৈরি করছিলেন? ডানা দুটি বাইরে, অবশ্যই বাইরে, তারা সেই অনঙ্গ শরীরের বাইরেই আছে, কিন্তু তাহলে তারা তাদের অনঙ্গ দেহের আলখাল্লার বাইরের সেই ডানাগুলো ভাঁজ করে রাখে কোথায়, যেগুলো তাদের চারপাশে কোমলভাবে জড়িয়ে আছে, কিংবা যদি উল্টোটা ঘটত, যদি তাদের ডানাগুলো বাইরেই বেরিয়ে না থাকত, তাহলে তাদের সেই স্বর্গীয় আলখাল্লা ডানাসহ পুরো শরীরকে কীভাবে ঢেকে রাখত?
আহ, বেচারা বত্তিচেল্লি, লিওনার্দো, বেচারা মিকেলাঞ্জেলো, আহা, সত্যিকারের বেচারা তো ওই জিওত্তো আর ফ্রা অ্যাঞ্জেলিকা! কিন্তু এখন আর তাতে কিছু আসে-যায় না, তারা তো সেকালের দেবদূতদের পিছু পিছু সেই কবেই মিলিয়ে গেছে, আর আমি যেই স্বর্গদূতদের কথা বলছি, তারা নতুন; তবে এটা পরিষ্কার যে আমি যখন পায়চারি শুরু করি আমার কক্ষের মধ্যে—এখন আপনারা যেখানে আমাকে মাইক্রোফোনে বক্তব্য দিতে দেখছেন সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে—চেয়েছিলাম ‘আশা’ নিয়ে কথা বলতে, কিন্তু এখন আর তা নিয়ে কথা বলব না, বরং আমি আসমানি দূতদের নিয়ে কথা বলব; আমি সেই জায়গা থেকেই শুরু করব, আর ইতিমধ্যেই বোধ হচ্ছে আমার ব্রেনে কিছু ঝাপসা রেখাচিত্র তৈরি হচ্ছে, যেহেতু আমি ধ্যানমগ্ন অবস্থায় আছি আমার কর্মকক্ষে, যা খুব বড় নয়, মোটে চার বাই চার মিটার, একটা টাওয়ার ঘর, তবে ওপরে-নিচে যাওয়ার সিঁড়িটা এই হিসাব থেকে বাদ যাবে, আর অবশ্যই হাতির দাঁতের তৈরি রোমান্টিক কোনো টাওয়ারের কথা আপনাদের ভাবা উচিত হবে না, কারণ টাওয়ারটি নরওয়েজিয়ান সস্তা স্প্রুস (পাইনের মতো) গাছের তক্তা দিয়ে তৈরি, আর এর অবস্থান কাঠের তৈরি একতলা একটি ঘরের ডান দিকের কোনায়, এবং এটি আশপাশের সবকিছুকে ছাড়িয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, কারণ আমার জমিটা শুয়ে আছে পাহাড়ের ঢালে, কারণ পুরো ব্যাপারটাই পাহাড়ের শিখরে দাঁড়িয়ে আছে, আর আমার পুরো জমিটাই মূলত একটু ঢালু জায়গায় এবং তা নেমে গেছে নিচের দিকে, একদম গভীর খাদের দিকে।
এদিকে নিচের ঘরটির সম্প্রসারণও প্রয়োজন হয়ে পড়ে, কারণ আমার বইয়ের স্তূপ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে তারা আমার পুরো কক্ষটিকেই যেন গিলে খেতে উন্মুখ, আর এরপর এমন একটা সময় আসে যখন নতুন কক্ষ তৈরি করা ছাড়া আমার আর কোনো গতি ছিল না, জমির এই ঢালুতার কারণেই আমার নবনির্মিত ঘরটি আগের ঘরটিকে ছাড়িয়ে ওপরে উঠে যায়, আর এটা দেখতে অনেকটা টাওয়ারের মতো, যার পুরো ভার যেন আগের ঘরটির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে; যাহোক, আমি এখানে ওই আসমানি দূতদের নিয়েই কথা বলতে চাই, আশা নিয়ে নয়, পুরোনোদের নিয়েও নয়, বিশেষ করে আগেরকার দিনের ফেরেশতাদের নিয়ে তো নয়ই; কারণ সেকেলে ফেরেশতা মানেই ডানাওয়ালা ফেরেশতা—তাদের কথা ভাবলেই বিখ্যাত ‘অ্যানানসিয়েশন’-এর (বাইবেলে বর্ণিত ভার্জিন মেরির স্বর্গপুত্র যীশুর জন্মচিত্রকর্ম) কথা মনে পড়ে যায়, মধ্যযুগ ও রেনসাঁজুড়ে অগণিতবার এই চিত্রকর্ম আঁকা হয়েছে, যা মূলত একটিই বার্তা দিত—‘যার জন্ম হওয়ার কথা, তিনি ঠিকই জন্ম নেবেন’; তারাই ছিল সেই প্রাচীন ফেরেশতা, আসমানি বর্তাবাহক, যারা মানুষ ও পৃথিবীর জন্য নানা ধরনের বার্তা নিয়ে আসত, আর স্বর্গদূততত্ত্ব অনুযায়ী তারা এই বার্তাগুলো মানুষের কাছে মৌখিকভাবে পৌঁছে দিত; অথবা নবম ও দশম শতাব্দীর চিত্রকর্মগুলোর দিকে তাকালে যেমনটা দেখা যায়, তারা একধরনের ঢেউখেলানো ফিতায় লেখা আসমানি বাণীগুলো মানুষকে পড়ে শোনাত, যেখানে প্রতিটি শব্দেরই ছিল অসাধারণ গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য; অন্যান্য দায়িত্ব পালনের সময়েও এই দূতেরা আসমানি সমাচার বহন করে, আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, তারা স্বর্গমালিকের বার্তা তার নির্বাচিত মানব প্রতিনিধির কাছে পৌঁছে দিত, আর সেসব ওহি পৌঁছে দেওয়া হতো আলোয় মুড়িয়ে কিংবা মনোনীত বান্দার কানে ফিসফিস করে, যার মানে দাঁড়ায়—সেই চিত্রায়ণগুলো যেমনই হোক না কেন, ঐশী বার্তা থেকে ঐশী দূতদের আলাদা করা যায় না, আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে, আসমানি দূতদের আসমানি সমাচার থেকে আলাদা করা যেত না—আমাদের আসলে বলা উচিত, পুরাকালের ঐশী দূতেরা যেন নিজেরাই ছিল ঐশী বাণী, সেই আসমানি বাণী—যা আসত এমন এক আসমানি সত্তা থেকে যাকে পরামর্শ দেওয়া যায় না, যার সঙ্গে জোর খাটানো যায় না; তিনি তাদের পাঠাতেন, সেই আসমানি ওহিবাহকদের পাঠাতেন আমাদের কাছে—আমরা যারা ধুলাবালুর সঙ্গে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করি, উদ্দেশ্যহীনভাবে এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করি, অনিশ্চিত পরিণতির জন্য দণ্ডিত হই
আহা, সেই সব যুগ কী দারুণই না ছিল! সংক্ষেপে বলতে গেলে, আগেরকার দিনের প্রত্যেক ওহিবাহকই ছিল একজনের কাছ থেকে আরেকজনের উদ্দেশে পাঠানো বার্তা, সেই বার্তা যা ছিল আদেশ বা প্রতিবেদনমূলক; কিন্তু আমি এখানে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে এই বিষয় টেনে আনতে চাই না, যখন আমি আমার ঘরটিতে চক্কর কাটছি, আর আপনারা তো ইতিমধ্যে জানেন, আমার ঘরটি নরওয়েজীয় সস্তা স্প্রুস কাঠে নির্মিত এবং যা সহজেই গরম হয় না, আর এটি দেখতে অনেকটা টাওয়ারের মতো, আর এর কারণ জমির ঢালুতা; যাই হোক, অন্তর্হিত কাউকে নিয়েই আমি আর কথা বলতে চাই না, যদিও প্রাচীন শিল্পকর্মগুলো এখনো আমাদের হৃদয়ে জীবন্ত, যার জন্য মধ্যযুগ, প্রাক্-আধুনিক যুগের প্রতিভাবানদের, বিশেষ করে জিওত্তো থেকে শুরু করে জিওত্তো পর্যন্ত সবাইকে ধন্যবাদ জানাই, যদিও আগেরকার দিনের ঐশী দূতেরা—যাদের গায়ে সাঁটা আছে সুন্দর সব উপাধি: মোহনীয়, মহিমান্বিত, অন্তরঙ্গ—তারা এখনো যেকোনো মুহূর্তে আমাদের আত্মাকে স্পর্শ করতে পারে; এমনকি তারা সেই সব আত্মাকে নাড়া দিতে পারে যারা বিশ্বাস করার ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে ফেলেছে; আর নিশ্চিতভাবেই তারা ছিল সেই সত্তা, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিরল আবির্ভাবের মাধ্যমে স্বর্গের অস্তিত্ব আছে এমন বিশ্বাসে আমাদের পৌঁছে দিতে পেরেছিল, আর এর ফলে আমাদের অভিমুখ বা দিক সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি হয়—যা মহাবিশ্বের গঠন অনুমান করতে আমাদের সাহায্য করেছিল, কারণ যেখানে দিক আছে, সেখানে স্থান-দূরত্বও বিদ্যমান; আর যেখানে দিক আছে সেখানে দুই প্রান্তের মাঝে দূরত্বও আছে, তার মানে সেখানে সময়ও আছে এবং সেখানে শতকের পর শতক ধরে, ওহহহ, না, হাজার হাজার বছর ধরে এমন এক জগৎ বিদ্যমান, যাকে আমরা মনে করি কোনো এক সত্তা সৃষ্টি করেছে, যেখানে আমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে আগেরকার অ্যাঞ্জেলদের—এসবই আমাদের আকাশ-পাতালের সত্য ও বাস্তবকে বুঝতে ভূমিকা রাখে, আর যদি আমি আগেরকার দিনের ঈশ্বরদূতদের কথা বলতে চাইতাম, আমি চক্রাকারে ঘুরতাম—এক কর্নার থেকে অন্য কর্নারে গিয়ে আবার সেই কর্নারে ফিরে আসতাম; কিন্তু না, সেই সব ঐশী বার্তাবাহক এখন আর নেই, এখন কেবল নতুন ওহিবাহকদের কাল।
আমি এখন এক কর্নার থেকে অন্য কর্নারে পায়চারি করছি না তাদের কথা ভাবতে ভাবতে, বরং আমি এখানে আপনাদের মনোযোগের কেন্দ্র হয়ে আছি, এর কারণ আগেও বলেছি—আমাদের অ্যাঞ্জেলরা নতুন, তাদের কোনো ডানা নেই, ফলে আলতো করে সেই ডানা লুকানোর কোনো আলখাল্লাও নেই; তারা সাধারণ পোশাক পরেই আমাদের সঙ্গে রাস্তায় হাঁটে, আমরা জানি না তাদের সংখ্যা কত, তবে অনুমান করা হয়, তাদের সংখ্যা অপরিবর্তিত—আগের দিনে আসমানি দূতেরা যেমন হঠাৎ হঠাৎ এসে হাজির হতো, তেমনি এই নতুন স্বর্গদূতেরাও যেখানে-সেখানে আচমকা রহস্যজনক এক উপায়ে আবির্ভূত হয়, তারা আমাদের জীবনের সেই একই ধরনের পরিস্থিতিতে এসে উপস্থিত হয়, যেসব মুহূর্তে আগেরকার দিনের ঐশী দূতেরা এসে সাক্ষাৎ দিত; সত্যি বলতে, তাদের চেনা সহজ যদি তারা তা চায়, যদি তারা নিজেদের কোনো কিছু লুকাতে না চায়, তাহলে এটা সহজ, কারণ আমাদের জগতে তাদের চলাফেরা ভিন্ন, তারা ভিন্ন গতিতে, অজানা ছন্দে, অন্য রকম শব্দ করে চলাফেরা করে—আমরা যেভাবে হাঁটাচলা করি মোটেই সেভাবে নয়; আর আমরা তো সেই মানুষ, যারা এই ধুলাবালুর দুনিয়ায় যাযাবরের মতো ঘুরে মরছি, ধুলায় গড়াগড়ি খাচ্ছি; তবে এটাও তো নিশ্চিত নই যে এই নতুন স্বর্গদূতেরা স্বর্গ বা অধরা জগৎ থেকেই আসছে, কারণ এখন তো মনেও করা হয় না—স্বর্গ বা ওপর দুনিয়া বলে কিছু আছে, সেই পুরাকালের দেবদূতদের মতোই ওই দুনিয়াও হারিয়ে গেছে অসীম কোনো এক পরিসরে, যেখানে এখন কেবল এই দুনিয়ার ইলন মাস্কদের মতো মানুষেরা স্থান ও সময়কে নিজেদের মতো অদ্ভুতভাবে সাজিয়ে নিচ্ছে; আর এ কারণেই হয়তো আপনারা আপনাদের সামনে কোনো ধরনের পরিবর্তন ছাড়া সেই একই বৃদ্ধ মানুষটিকে দেখছেন, তার কথা শুনছেন, যে কিনা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করতে এসে তার নিজস্ব আনকোরা ভাষায় কথা বলছে, অথচ বৃদ্ধ ব্যক্তিটি এখন তার স্প্রুস কাঠের তৈরি ঠান্ডা টাওয়ার ঘরে পায়চারি করছে, অর্থাৎ এই বৃদ্ধ আর কেউ নয়—আমি নিজেই, যে কিনা এখন তার পায়চারির মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে যাতে নতুন আসমানি দূতদের নিয়ে তার ভাবনা প্রকাশ করা সহজ হয়, আর তার জন্য দরকার নতুন ধরনের পদক্ষেপ ও ভিন্ন ধরনের চলনগতি, আর এ জন্যই এখন আমি আমার পায়চারির গতি বাড়িয়ে দিয়েছি।
আমি সহসা উপলব্ধি করি, এই নতুন আসমানি পয়গামবাহকদের শুধু ডানাই নেই তা নয়, তাদের কোনো ঐশী বার্তাও নেই—একদমই নেই, তারা সাদামাটা পোশাক পরে আমাদের মাঝে কেবল ঘুরে বেড়ায়, আর তারা যদি না চায় তাদের সাক্ষাৎও পাওয়া যায় না, কিন্তু যদি চায় তাহলে আমাদের মধ্য থেকে যেকোনো একজনকে তারা বেছে নেয় এবং তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, তখন মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু পাল্টে যায়—যেন তার চোখের ছানি দূর হয়ে যায়, তার হৃদয়ের সব দূষিত বস্তু ঝরে যায়; অর্থাৎ এক পবিত্র সত্তার সঙ্গে তার আচমকা সাক্ষাৎ ঘটে, আর বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে—‘হায় ঈশ্বর, এ তো এক ঐশী দূত, আমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে, শুধু দাঁড়িয়েই আছে, কিন্তু কোনো কিছু দিচ্ছে না, এমনকি আমার চারপাশে কোনো ঐশী বার্তার তরঙ্গও অনুভব করছি না, কানে কানে ফিসফিস করে বলার মাধ্যম নুরের অস্তিত্বও টের পাচ্ছি না’, মানে তারা একটি শব্দও বলে না—যেন তাদের মুখ মিউট করা, তারা শুধু দাঁড়িয়ে থাকে আর দরদ নিয়ে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, যেন আমরা তাদের দিকে গভীরভাবে তাকাই, যাতে আমরা নিজেরাই তাদের কাছে কোনো বার্তা পৌঁছে দিতে পারি, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের কাছে তাদের দেওয়ার মতো কোনো পয়গামই নেই, কারণ তাদের সেই আবেগপ্রবণ দৃষ্টির জবাবে আমরা বড়জোর তা-ই বলতে পারতাম, যা বহু আগে প্রশ্নের জবাবে বলা হয়েছিল; কিন্তু এখন কোনো প্রশ্ন নেই, নেই উত্তরও; তাহলে এ কেমন সাক্ষাৎ, এ কেমন আধ্যাত্মিক ও পার্থিব দৃশ্যপট! তারা আমাদের সামনে কেবল দাঁড়িয়ে থাকে, আমাদের পর্যবেক্ষণ করে, আর আমরাও দাঁড়িয়ে থাকি, তাদের দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি; এই পুরো ঘটনার মধ্য দিয়ে তারা হয়তো কিছু বুঝতে পারে, কিন্তু কী ঘটছে আমরা নিশ্চিতভাবে তার কিছুই বুঝে উঠতে পারি না; বোবার সামনে বধির, বধিরের সামনে বোবা—এদের মধ্যে কীভাবে কথা চালাচালি সম্ভব, আর পরস্পরের মধ্যে বোঝাপড়াই-বা হবে কীভাবে, স্বর্গীয় উপস্থিতিরি কথা নাহয় বাদই দিলাম; এমন সব মুহূর্তে নিঃসঙ্গ, অবসন্ন, বিষণ্ন ও সংবেদনশীল মানুষের মনে হঠাৎ একটি উপলব্ধি জন্মায়, এ মুহূর্তে যেমনটা হচ্ছে—আমি যদি নিজেকে আপনাদেরই একজন হিসেবে গণ্য করি, তাহলে আমার মনেও সেই একই উপলব্ধি তৈরি হবে।
আপাত মনে হতে পারে, আমি আপনাদের সামনে মাইক্রোফোনে কথা বলছি, কিন্তু বাস্তবে আমি আছি আমার সেই টাওয়ার ঘরে, আর আপনারা জানেন যে সেই ঘরটি তাপরোধী নরওয়েজীয় সস্তা স্প্রুস কাঠে তৈরি এবং বেশ সাদামাটা; যাই হোক, আমার উপলব্ধি হচ্ছে—এই নতুন আসমানি পয়গামবাহকেরা সীমাহীন নীরবতায় নিমজ্জিত, ফলে এখন আর তারা বোধ হয় ফেরেশতার কাতারে নেই, বরং তারা একেকটা বলি, আভিধানিক ও আধ্যাত্মিক অর্থেই বলি (আত্মোৎসর্গীকৃত)।
আমি আমার স্টেথোস্কোপটি তৎক্ষণাৎই বের করে ফেলি, তৎক্ষণাৎ—কারণ এটি সব সময় আমার সঙ্গেই থাকে, এখনো আছে—যখন আমি আমার সেই টাওয়ার ঘর থেকে কথা বলছি, দ্রুত পায়চারি করছি, এরপর খুব আলতো করে আপনাদের প্রত্যেকের বুকে স্টেথোস্কোপটির ডায়াগ্রাম ও বেল রাখি, আর সঙ্গে সঙ্গেই শুনতে পাই—নিয়তিধ্বনি, আপনাদের ভাগ্যধ্বনি, আর সেই সঙ্গে আমিও এক অমোঘ নিয়তির মধ্যে ঢুকে পড়ি, আর এমন এক ভাগ্যস্পন্দন শুনতে পাই যা মুহূর্তটিকেই বদলে দেয়, কিন্তু সবচেয়ে বেশি বদলে দেয় এর ঠিক পরের মুহূর্তটিকে যা আমার সামনে এসে দাঁড়ানোর কথা ছিল, কিন্তু না, যে মুহূর্তটিকে পরবর্তী মুহূর্ত বলে মনে হয়, সেটি আসলে আসে না, তার বদরে আসে সম্পূর্ণ এক ভিন্ন মুহূর্ত—বিস্ময় ও বিপর্যয়কর মুহূর্ত, যা আমার ওপর আছড়ে পড়ে, আর এই স্টেথোস্কোপই আমাকে বলে দেয় এই নতুন অ্যাঞ্জেলদের অত্যন্ত ভীতিপ্রদ কাহিনি, সেই কাহিনি যা বলে আত্মবিসর্জনের কথা, কিন্তু সেটা বলা হয় আমাদের জন্য নয়, বরং আমাদের কারণেই, আমাদের প্রত্যেকের কারণেই; ডানাহীন এই আসমানি দূতেরা, বার্তাহীন এই ঐশী বার্তাবাহকেরা অলক্ষ্যে জেনে যায়—যুদ্ধ, যুদ্ধ, আর যুদ্ধ—প্রকৃতিতে যুদ্ধ, সমাজে যুদ্ধ, আর এই যুদ্ধ কেবল অস্ত্র দিয়ে হয় না, শুধু নির্যাতন করে নয়, শুধু ধ্বংস দিয়ে হয় না: অবশ্যই এগুলো যুদ্ধের একটা দিক, কিন্তু যুদ্ধের আরেকটি দিকও রয়েছে, কারণ এমন যুদ্ধের জন্য একটি মাত্র কটু কথাই যথেষ্ট—এই নতুন দেবদূতদের দিকে ছুড়ে দেওয়া একটিমাত্র কুৎসিত বাক্যই যথেষ্ট, একটি অন্যায়-বিবেচনাহীন-মর্যাদাহীন কাজই যথেষ্ট, শরীর আর আত্মায় একটি আঘাতই যথেষ্ট, কারণ জন্মানোর সময় তো তাদের জন্য এমন কিছু নির্ধারিত ছিল না, তারা এর সামনে অসহায়, বড্ড নিরুপায় পিষে যাওয়ার কাছে, নীচতার কাছে; তাদের নিরীহতা ও সরলতার বিপরীতে বিদ্রূপপূর্ণ নিষ্ঠুরতাই একটি বড় হাঙ্গামার জন্য যথেষ্ট, একটা কুৎসিত কথাই মনে আজীবনের ক্ষত তৈরিতে যথেষ্ট—যার আরোগ্য হাজারো কথা দিয়েও সম্ভব নয়, কারণ এটা আরোগ্যাতীত।
২
আচ্ছা, অ্যাঞ্জেলদের কথা যথেষ্ট হয়েছে, এবার বরং মানুষের মর্যাদা নিয়ে আলাপ করা যাক—
মানুষ—বিস্ময়কর সৃষ্টি—কে তুমি? তুমি চাকা আবিষ্কার করেছ, তুমি আগুন আবিষ্কার করেছ, আর উপলব্ধি করেছ—তোমার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার একমাত্র উপায় পারস্পরিক সহযোগিতা এবং তুমিই আবিষ্কার করেছিলে মৃতভোজিতা (মৃতদেহ ভক্ষণের কৌশল) যাতে এই পৃথিবীর ওপর তোমার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারো, আর তুমিই অর্জন করতে পেরেছ বিস্ময়কর বুদ্ধিমত্তা, আর তোমার রয়েছে মস্ত এক মস্তিষ্কও—বহুস্তরবিশিষ্ট, জটিল, আর এ ব্রেনের জোরেই তুমি এত ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছ জীবজগতে—যদিও তার একটা সীমা রয়েছে এ পৃথিবীতে, যে পৃথিবীর নামটিও তোমরাই দিয়েছ, তোমাদের এই শক্তিই কিছু স্বীকৃত সত্যের দিকে নিয়ে গিয়েছিল যার অধিকাংশই পরে ভুল প্রমাণিত হয়, তবে সেগুলো তোমাদের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতেও সহযোগিতা করেছিল।
তোমার বিকাশ, তোমার ক্রমাগত অগ্রগতি পৃথিবীতে তোমার প্রজাতিকে শক্তিশালী করেছে, স্থিতিশীল করেছে, আর তোমরা সংখ্যায় বাড়তে থাকলে, সুবিশাল দলে পরিণত হতে থাকলে, তোমরা সমাজ গড়ে তুললে, সভ্যতা নির্মাণ করলে, এমনকি পৃথিবী থেকে যাতে তোমাদের পুরো প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে না যায়, তার অলৌকিক ক্ষমতা-কৌশলও আয়ত্ত করলে—যদিও তোমাদের বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল, কিন্তু না, তোমরা তোমাদের দুই পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ালে, তারপর একসময় হোমো হ্যাবিলিস প্রজাতিতে রূপ নিলে এবং পাথর কেটে বিভিন্ন হাতিয়ার বা সরঞ্জাম বানাতে শিখলে, এবং তোমরা সেগুলো কীভাবে ব্যবহার করতে হয় সেটাও রপ্ত করলে; তারপর একসময় তোমরা হোমো ইরেক্টাস মানুষে পরিণত হলে, আগুন আবিষ্কার করলে, এরপর ছোট্ট একটা পরিবর্তন দেখা যায় তোমাদের মধ্যে—তোমাদের স্বরযন্ত্র ও নরোম তালুর মধ্যে পরস্পরকে স্পর্শ করা অসম্ভব হয়ে ওঠে, অথচ তখনো শিম্পাঞ্জির ক্ষেত্রে উল্টো ঘটনাটাই ঘটত, আর এ কারণেই তোমাদের বাক্কেন্দ্রের বিকাশের পাশাপাশি ভাষাও সৃষ্টি হতে থাকল, আর ওল্ড টেস্টামেন্ট অনুযায়ী দেখা যায়, তোমরা স্বর্গপ্রভুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে; এবং তিনি তার সৃষ্ট সবকিছুর নাম দিতে বললেন তোমাদের, আর তোমরা সেসবের নামও দিয়েছিলে, তারপর একসময় তোমরা লিখনপদ্ধতি আবিষ্কার করলে, তবে তত দিনে তোমরা দার্শনিক চিন্তাভাবনা করার সক্ষমতাও অর্জন করে ফেলেছিলে; প্রথমে তোমরা বিভিন্ন ঘটনাকে একই সুতায় বাঁধতে শিখলে, তারপর ধীরে ধীরে সেগুলোকে তোমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে আলাদা করতে থাকলে, নিজেদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থেকে আবিষ্কার করলে সময়, তৈরি করলে বিভিন্ন যানবাহন আর জলযান, পৃথিবীর অজানা সব জায়গায় ঘুরে বেড়ালে আর যা কিছু লুণ্ঠন ও তছরুপ করা সম্ভব তার সবই করলে, যেহেতু তোমরা বুঝতে পেরেছিলে শক্তি ও ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করার মানেটা আসলে কী, যেসব গ্রহ একসময় অধরা-অজানা ছিল সেসবের মানচিত্রও তোমরা আঁকলে; তত দিনে তোমরা সূর্যকে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে এবং তারাপুঞ্জকে ভাগ্যনির্ধারক হিসেবেও মানা বাদ দিলে; তোমরা যৌনতাকে আবিষ্কার করলে, এরপর নানা রূপে একে বদলেও দিলে—নারী-পুরুষের ভূমিকায়ও আনলে নানা পরিবর্তন, এরপর দেরিতে হলেও আবিষ্কার করলে ভালোবাসা, অনুভূতি, সহানুভূতি, আর গড়ে তুললে জ্ঞান অর্জনের নানা স্তর ও শ্রেণিবিন্যাস, এবং অবশেষে তোমরা মহাকাশে উড়াল দিলে পাখিদের পেছনে ফেলে, তোমরা পৌঁছে গেলে চাঁদে এবং মহাশূন্যে তোমাদের প্রথম পদচিহ্নটি সেখানেই রাখলে, তারপর তোমরা এমন সব অস্ত্র আবিষ্কার করতে শুরু করলে যা পুরো পৃথিবীকে কয়েকবার ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে।
সবশেষে তোমরা বিজ্ঞানের এমন এক বিকাশ ঘটালে, যার অগ্রগতি এত দ্রুতগতির যে আজ যা কেবল কল্পনা করা যায়, আগামীকাল তা বাস্তবে রূপ নেয়, অর্থাৎ আগামীকাল আজকের কল্পনাকে মাড়িয়ে যায়, একে পুরোনো করে দেয়; তোমাদের শিল্পযাত্রা গুহাচিত্র থেকে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ‘দ্য লাস্ট সাপার’ চিত্রশিল্পকেও অতিক্রম করেছে, তোমাদের সংগীতযাত্রা আদিম সম্মোহনী রহস্যময় ছন্দ-সুর থেকে শুরু করে জোহান সেবাস্তিয়ান বাখ পর্যন্ত ছড়িয়েছে, অবশেষে ঐতিহাসিক বিকাশের ধারাকে মেনে নিয়ে অপত্যাশিতবাবে তোমরা সব আধ্যাত্মিক বিশ্বাস হারাতে শুরু করলে এবং প্রযুক্তির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে শুরু করলে, যেটা তোমরাই আবিষ্কার করেছিলে একদিন, যা তোমাদের কল্পনাশক্তিকে ধ্বংস করছে, তোমাদের মধ্যে এখন শুধু স্বল্পমেয়াদি স্মৃতিটুকুই (শর্ট-টার্ম মেমোরি) অবশিষ্ট থাকে, আর তাই তোমরা পরিত্যাগ করেছ জ্ঞান, সৌন্দর্য ও নৈতিক মঙ্গলের সেই মহৎ ও সর্বজনীন উত্তরাধিকার; আর এখন তোমরা এগিয়ে যেতে প্রস্তুত আধ্যাত্মিক গভীরতাহীন দুনিয়ার দিকে (ফ্ল্যাটল্যান্ড), যেখানে কাদায় তোমাদের পা দেবে যাবে, সুতরাং যেয়ো না; তোমরা কি মঙ্গল গ্রহে যেতে চাও? আমি বলি কী—যেয়ো না, কারণ তোমাদের আবিষ্কার ওই মাটিই তোমাদের গিলে খাবে, ওই জলাভূমিই তার গহিন অন্ধকারে টেনে নিয়ে যাবে; তবে তোমাদের এই বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের যাত্রা কিন্তু দারুণই ছিল—বিবর্তনের এই পথে তোমাদের অগ্রযাত্রা ছিল শ্বাসরুদ্ধকর, বিস্ময়কর; কিন্তু দুঃখের বিষয়—তোমাদের এই অপূর্ব অগ্রযাত্রার সাক্ষাৎ আর হয়তো মিলবে না।
৩
ঠিক আছে, মানবমর্যাদা নিয়ে তো অনেক কথা বললাম, এবার বরং বিদ্রোহ নিয়ে কিছু বলা যাক।
আমার ‘দ্য ওয়ার্ল্ড গোজ অন’ বইটিতে এ বিষয়ে কিছু বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমি যা লিখেছি তাতে সন্তুষ্ট নই, আমি আবার লেখার চেষ্টা করব; উনিশ শতকের নব্বইয়ের দশকের প্রারম্ভিক এক বিকেল—স্যাঁতসেঁতে, ভ্যাপসা—তখন আমি বার্লিনে, পাতাল রেলস্টেশনের নিচের একটি কক্ষে ট্রেনের অপেক্ষায় ছিলাম; সব জায়গার পাতাল রেলব্যবস্থার মতোই এই প্ল্যাটফর্মও নির্মিত—ট্রেন টানেলের মধ্য দিয়ে যে স্থান থেকে প্ল্যাটফর্মে ঢুকতে শুরু করে, সেখান থেকে কয়েক মিটার দূরে রেলযাত্রার সংকেতবাতিসহ বেশ বড় একটি আয়না রয়েছে, যেটা রেলচালককে ট্রেনের বাইরের পুরোটা পর্যবেক্ষণে সহায়তা করে এবং স্টেশনে পৌঁছানোর পর ট্রেনের সম্মুখভাগ ঠিক কোথায়, ঠিক কত সেন্টিমিটারের মধ্যে থামলে যাত্রীরা ঠিকমতো ওঠানামা করতে পারবে, সেটারও নির্দেশনা দেয়।
অবশ্য রেলচালকের জন্যই আয়নাটি স্থাপন করা হয়েছে; লাল বাতি নির্দেশনা দেয়—যাত্রীদের নিরাপদে ওঠানামার জন্য ঠিক কোথায় কোন স্থানে ট্রেনকে থামাতে হবে, এরপর যাত্রীদের ওঠানামা সম্পন্ন হলে সবুজ বাতি জ্বলে ওঠে, তখন সঙ্গে সঙ্গে পাতালরেলটি সুড়ঙ্গপথ ধরে তার যাত্রা অব্যাহত রাখে; তো ওই সময় আমার গন্তব্যস্থল ছিল রুলেবেন; সেই প্ল্যাটফর্মে দুর্ঘটনা পরিহার ও নিয়মশৃঙ্খলা ঠিক রাখার জন্য সংকেতবাতি ও সুড়ঙ্গমুখের মাঝের স্থানে আঁকা ছিল একটি পাতলা দৃশ্যমান হলুদ লাইন, পাশাপাশি স্থাপন করা ছিল সতর্কবাতা সাইনবোর্ড; এই হলুদ রেখার মূল বার্তা ছিল—যাত্রীরা যাতে কোনো অবস্থাতেই এই লাইন অতিক্রম না করে, যদিও প্ল্যাটফর্মটি আরও কয়েক মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল; অন্যান্য স্টেশনের মতোই সেখানেও হলুদ লাইন ও টানেলের প্রবেশমুখের মাঝে একটি নিষিদ্ধ এলাকা ছিল, যেখানে কোনো অবস্থাতেই কোনো ব্যক্তি, বিশেষ করে সাধারণ যাত্রীরা প্রবেশ করতে পারত না।
আমি ক্রয়ৎসবের্গ থেকে আসা ট্রেনটির জন্য অপেক্ষা করছিলাম, তখন হঠাৎ খেয়াল করলাম—ওই নিষিদ্ধ জোনটিতে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছে, যে ছিল গৃহহীন ভবঘুরে (ক্লোশার্ড), সম্ভবত ব্যথায় তার পিঠ কুঁজো হয়ে যাচ্ছে, তার মুখটা আমাদের দিকে ঘোরানো ছিল—দেখে মনে হচ্ছিল সে কারও সহানুভূতির প্রত্যাশায় আছে, আর রেললাইনের পাশের পথটিতে প্রস্রাব করার চেষ্টা করছে; কিন্তু দেখে বোঝা যাচ্ছিল—প্রস্রাব করতে তার বেশ কষ্ট হচ্ছে—ফোঁটা ফোঁটা করে প্রস্রাব হচ্ছিল, ফলে এই যন্ত্রণা থেকে বেচারা নিজেকে মুক্তিও দিতে পারছিল না। আমি পুরোপুরি বুঝতে পারলাম, তার সঙ্গে আসলে কী ঘটছে; আর বিষয়টি আশপাশের লোকদের নজরও এড়ালো না, তারাও বুঝতে পারল—একটি অস্বাভাবিক ঘটনা কীভাবে এই বিকেলের ঠান্ডা ও মোলায়েম পরিবেশ নষ্ট করে দিচ্ছে। তখন লোকেরা হঠাৎই ফিসফিস করে প্রায় একই কথা বলে উঠল, ‘এহহে, কী কেলেঙ্কারি রে বাবা’—এর অবসান এখনই করতে হবে, ওই হতচ্ছাড়াকে এখনই সরিয়ে দিতে হবে এবং হলুদ লাইনের বৈধতা ও কর্তৃত্ব পুনর্বহাল করতে হবে।
ভবঘুরে লোকটি যদি সবার অজান্তে দ্রুত তার প্রস্রাব সেরে আবার আলগোছে ভিড়ের মধ্যে মিশে যেত এবং সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যেতে পারত, তাহলে তো কোনো সমস্যাই ছিল না; কিন্তু হতচ্ছাড়াটা সেটা পারল না, মানে পারার মতো অবস্থায় সে ছিল না; আর যা এ ঘটনাকে আরও বিপদের দিকে ঠেলে দিল, সেটি হলো—হঠাৎ প্ল্যাটফর্মের বিপরীত পাশে এক পুলিশ সদস্য এসে হাজির, লোকটির বিপরীত দিকে প্রায় মুখোমুখি অবস্থানে সে, চিৎকার দিয়ে ভবঘুরে লোকটি ডাকছে—‘ওখানে তুমি কী করছ, থামো’; নিরাপত্তার স্বার্থেই ইউ-বান স্টেশনগুলো এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে পরস্পর বিপরীতমুখী ট্রেনগুলো পরস্পর সম্পূর্ণ আলাদা থাকে এবং নির্দিষ্ট স্থানে এসে থামে, যাত্রীর ওঠানামা শেষে আবার চলে যেতে পারে নির্বিঘ্নে, অর্থাৎ দুটি ট্রেনলাইন বসানো থাকে ১০ মিটার প্রস্থ ও প্রায় ১ মিটার গভীর এক খাদের দুই পাশে, যাতে কোনো যাত্রী চাইলে তার গন্তব্য পরিবর্তন করে বিপরীত দিকের ট্রেনে উঠতে পারে।
এর জন্য ওই যাত্রীকে প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তের সিঁড়ি দিয়ে হেঁটে ওপরে উঠতে হতো, তারপর রেললাইনের ওপর দিয়ে যাওয়া করিডর দিয়ে ধীরে-সুস্থে প্ল্যাটফর্মের ওপর প্রান্তে যেতে হতো, এরপর আবার সিঁড়ি বেড়ে নিচে নামতে হতো, আর এভাবেই সে তার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের ট্রেনে উঠতে পারত; কিন্তু সে দুই রেললাইনের খাদ লাফ দিয়ে পার হতে পারত না, কিংবা ১০ মিটার চওড়া রেললাইন দুটি হেঁটে পার হতে পারত না। যদি নিষেধাজ্ঞার নানা মাত্রা থেকে থাকে, তাহলে এভাবে পার হওয়া কঠোরতর নিষিদ্ধ কাজ, প্রাণঘাতীও বটে।
আমি এত বিস্তারিত বলছি কেন, এর একটা কারণ ওই পুলিশ কর্মকর্তা—যিনি প্ল্যাটফর্মের বিপরীত পাশে দাঁড়িয়ে খানিকটা পেশাদারত্ব বজায় রেখেই রাগে ফুঁসছিলেন আর নিজের জনকল্যাণমূলক দায়িত্বটিও পালন করতে চাইছিলেন; কিন্তু এর জন্য তাকে প্রথমে প্ল্যাটফর্মের ওপরের হাঁটাপথে ওঠার সিঁড়ির দিকে যেতে হতো, তারপর সিঁড়ি বেয়ে পদ-চারী সেতুতে উঠতে হতো, দৌড়ে ওপাশে গিয়ে আবার সিঁড়ি বেয়ে নামতে হতো, তারপর আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেখানে আসতে হতো—এটাই ছিল প্রচলিত নিয়ম, আর পুলিশ কর্মকর্তাও তা মানতে বাধ্য ছিল; যে মুহূর্তে তার নজরে এসেছে ওই ভবঘুরে, তখন থেকেই গম্ভীর উচ্চ স্বরে চিৎকার করে যাচ্ছে, কিন্তু লোকটির কানেই যেন যাচ্ছিল না, তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছিলই না; লোকটি তখনো আমাদের দিকেই মুখ করে ছিল, তার চোখেমুখে মুক্তির সেই একই যন্ত্রণার ছাপ স্পষ্ট, আর ফোঁটা ফোঁটা প্রস্রাব তখনো ঝরছিল রেলপথের ওপর; সত্যি বলতে, সে সাধারণ নিয়ম-শৃঙ্খলার প্রতি অবজ্ঞার পাশাপাশি আইনও ভঙ্গ করছিল, সাধারণ বোধবুদ্ধিও যেন তার নেই, পাত্তাই দিচ্ছিল না ওই পুলিশ সদস্যের নির্দেশকে; ভবঘুরের এমন অবজ্ঞাসূচক আচরণে বেশ আহত ও ক্ষুব্ধ হলো পুলিশটি, ওই মুহূর্তে তার মুখের ভাষাটা হয়তো এমন হতো: লোকটি এমনভাবে আচরণ করছে যেন সে বধির।
অবশ্য ভবঘুরের হিসাব-নিকাশে পুলিশটি ছিল, সে বুঝতে পেরেছিল—তার যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে পুলিশ তার থেকে বেশি দ্রুতগামী হবে, ফলে তার কিংবা প্রকৃতির ইচ্ছাতেই হোক, সে তার নিষিদ্ধ কাজটি সম্পন্ন করতে পারবে না, কারণ সে দেখল—পুলিশটি খুব তৎপর হয়ে উঠেছে, এমনকি প্ল্যাটফর্মের অপর পাশে রীতিমতো দৌড় শুরু করেছে সিঁড়ির দিকে, সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে রেললাইন পার হয়ে, আবার সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে আমাদের দিকে চলে আসবে এবং লোকটির কান ধরে বের করে আনবে। এ অবস্থায় ভবঘুরেটি গোঙাতে গোঙাতে তীব্র যন্ত্রণা নিয়েই হাল ছেড়ে দিল, তার কাজ থামিয়ে দিল, আর দৌড়ে আমাদের দিকেই আসতে ছিল, যাতে সে যথাসম্ভব দ্রুত কাছের সিঁড়িতে পৌঁছে কোনোরকম অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে।
এ যেন এক শ্বাসরুদ্ধকর প্রতিযোগিতা! লোকটির কাণ্ড দেখে প্ল্যাটফর্মের আমরা সবাই হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেলাম, কারণ আমরা বুঝে গেলাম সে পালাতে পারবে না, কারণ বৃদ্ধ লোকটি ভয়ে কাঁপছিল, তার পা, এমনকি পায়ের চালক মাথাও বুঝি কাজ করছিল না; ফলে দেখা গেল—পুলিশটি পদ-চারী সেতুর ওপরে ওঠার চেষ্টা করছে মিটার গতিতে, সেখানে ভবঘুরেটি পালাচ্ছে সেন্টিমিটার গতিতে, তা-ও বেশ কষ্ট করে, দুর্বল দুই হাত-পা ছুড়তে ছুড়তে; আর ওই পুলিশের দৃষ্টিও ছিল তাদের মধ্যকার ব্যবধান ওই দশ মিটার পথের দিকেই—এই দশ মিটার তার জন্য বড়ই যন্ত্রণার, অনভিপ্রেত, শাস্তিদায়ক বাধা, অপর দিকে আমাদের পাশে, ওই একই দশ মিটার বেশ ধীরগতির যা অর্থহীন লাগছিল, কিন্তু একই সঙ্গে একটি আশাব্যঞ্জক সম্ভাবনাও দেখে দিয়েছিল যে লোকটি বোধ হয় পুলিশের হাত থেকে পালাতে পারবে। পুলিশ কর্মকর্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সে আইনের প্রতিনিধিত্ব করছে যাতে সবারই ভালো কিছু হয়, তাই তার জন্য বাধ্যতামূলক সেই সীমালঙ্ঘনকারীর মুখোমুখি হওয়া যে কিনা সব স্বীকৃত যুক্তিবোধকে থোড়াই কেয়ার করছে, যাকে এককথায় বলা যায়—নীতিবিদ্রোহী, অসৎ।
এটা ঠিক যে ওই পুলিশ কর্মকর্তা ‘বাধ্যতামূলক ভালো’র প্রতিনিধিত্ব করছিল, কিন্তু ওই মুহূর্তে সে ছিল অসহায়, এদিকে আমি মিটার আর সেন্টিমিটারের মধ্যকার অমানবিক প্রতিযোগিতা দেখে বেশ অপমানিত বোধ করছিলাম; ফলে আমার মনোযোগ হঠাৎ ক্ষুরের মতো ধারালো হয়ে উঠল, আর এই ক্ষুরধার মনোযোগই মুহূর্তটিকে থামকে দিয়েছিল, মুহূর্তটি ঠিক তখনই থমকে গিয়েছিল, যখন তারা পরস্পরকে লক্ষ করল: ‘ভালো’ পুলিশটি বুঝতে পারল—‘অপরাধী’ ভবঘুরেটি নিষিদ্ধ জোনে প্রস্রাব করছে, আর ভবঘুরে দেখল—নিজের দুর্ভাগ্য, পুলিশটি তার কাণ্ডটি দেখে ফেলেছে; তখন তাদের মধ্যকার দূরত্ব মাত্র দশ মিটার, পুলিশটি তার লাঠিটি হাতে চেপে ধরে দৌড় শুরু করতে না করতেই হঠাৎ সে থেকে গেল, অহ, এই গতির মধ্যে বেশ শক্তি ছিল, তার মাংসপেশি টানটান হয়ে উঠেছিল, কিন্তু মাঝপথে থেমে গেল, সে রেলপথে লাফ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত, কারণ মুহূর্তেই একটা ভাবনা তার ভেতর বিদ্যুৎ-ঝলকের মতো খেলে গেল : এই দশ মিটারের পথ লাফিয়ে লাফিয়ে পার হলে কেমন হয়? তখন অন্য পাশে ভবঘুরেটি দশ মিটারের নিরাপত্তাদূরত্বের মধ্যেই ভয়ে কাঁপছিল দ্বিগুণ অসহায়ত্ব নিয়ে।
এই দৃশ্যপটেই আমার দৃষ্টি থেমে গিয়েছিল, এমনকি আজও সেখানেই রয়ে গেছে—যখন আমি দৃশ্যটির কথা ভাবি, সেই মুহূর্তের কথা ভাবি, যখন ক্রুদ্ধ পুলিশ তার লাঠি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ভবঘুরেটির পেছনে ছুটতে শুরু করে, অর্থাৎ যখন ‘বাধ্যতামূলক ভালো’ ধাবিত হচ্ছে ‘মন্দের’ দিকে যা আবার ভবঘুরের ছদ্মবেশ নিয়েছে; অথচ শুধু ‘অপরাধী’র দিকেই নয়, এই কাজের সচেতনতা ও অভিপ্রায়ের কারণে বরং ‘মন্দের’ দিকেই অগ্রসর হচ্ছে;
এভাবেই আমার মধ্যে বরফের মতো জমাট বা স্থির হয়ে থাকা চিত্রটি বারবার দেখি—আজও দেখি—প্ল্যাটফর্মের অপর পাশে দ্রুত পায়ে এগিয়ে যাওয়া সেই পুলিশ কর্মকর্তাকে, যার দ্রুত পদক্ষেপ মিটার গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, আর আমাদের পাশে দেখি সেই ‘অপরাধী’কে যে গোঙাচ্ছে, ভয়ে কাঁপছে, যেন শক্তিহীন ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছে ব্যথা ও ভয়ে; কে জানে—তার শরীরে কত ফোঁটা প্রস্রাব অবশিষ্ট ছিল; সে সেন্টিমিটার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে—তবে হ্যাঁ, আমার দৃষ্টিতে এই প্রতিযোগিতায় ‘ভালো’ কখনোই ‘মন্দ’কে ধরতে পারবে না, কারণ ওই দশ মিটার কখনোই অতিক্রম করা সম্ভব হবে না, এবং ট্রেন গর্জন করে স্টেশনে থামলে হয়তো পুলিশ ওই ভবঘুরেকে পাকড়াও করতে পারে, কিন্তু আমার কাছে ওই দশ মিটার চিরন্তন, অজেয়, কারণ আমার দৃষ্টি আটকে আছে কেবল একটি অনুভবে—ভালো কখনোই যন্ত্রণায় ছটফট করা মন্দকে ধরতে পারবে না, কারণ ভালো ও মন্দের মধ্যে কোনো আশা নেই, তেমন কিছুই নেই।
ট্রেনটি আমাকে নিয়ে রুলেবেনের দিকে ছুটল, কিন্তু লোকটির সেই কাঁপতে থাকা শরীর, সেই অসহায় ছটফটানি আমি মাথা ঝেড়ে ফেলতে পারছিলাম না, আর তখনই বিদ্যুৎ-চমকের মতো একটা প্রশ্ন আমার মাথায় এল—এই গৃহহীন ভবঘুরে ও তার মতো সমাজচ্যুত, নিঃস্বরা কবে শেষমেশ চূড়ান্ত বিদ্রোহটা করবে? আর সেই বিদ্রোহের রূপই-বা কেমন হবে? হয়তো এটা বেশ নির্দয় ও রক্তাক্ত হবে, হয়তো ভয়াবহ হবে; যেমনটা দেখি—এক মানুষ আরেক মানুষের ওপর বা গোষ্ঠীর ওপর যেভাবে ম্যাসাকার চালায়; কিন্তু পরক্ষণেই আমি সেই চিন্তা থেকে সরে আসি, কারণ আমি নিজেই নিজেকে বলি, না, আমি যে বিদ্রোহের কথা বলছি তেমনটা হবে না, কারণ সেই বিদ্রোহ একক কোনো কিছুর বিরুদ্ধে হবে না, বরং হবে সামগ্রিক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে।
সম্মানিত উপস্থিতি, প্রতিটি বিদ্রোহই সামগ্রিকতার সঙ্গে জড়িত, আর এ মুহূর্তে যখন আমি আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছি, আর যখন আমার সেই টাওয়ার ঘরে পায়চারি করার ধ্বনিসমষ্টি স্তিমিতি হয়ে আসছে, তখন আবারও এককালের সেই বার্লিনযাত্রা—রুলেবেনমুখী ইউ-বানের সেই ভ্রমণ—আমার ভেতর একঝলকে জেগে উঠছে। একটার পর একটা আলোকোজ্জ্বল স্টেশন পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে আমাদের ট্রেন, অথচ আমি কোথাও নামছি না, আর সেই থেকে আমি সেই পাতালরেলেই চড়ে আছি, সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে অবিরাম ছুটে চলছি, কারণ এমন কোনো স্টেশন নেই, যেখানে আমি নামতে পারি; আমি শুধু দেখি—একের পর এক স্টেশনগুলো পেছনের দিকে ছুটছে, আর আমার মনে হচ্ছিল—বিদ্রোহ, মানবমর্যাদা, স্বর্গদূত—এসব নিয়ে যা কিছু ভাবার সবই বুঝি ভেবে ফেলেছি, হ্যাঁ, সবই, এমনকি আশা নিয়েও।
[নোবেলপ্রাইজ.অর্গ থেকে ওটিলি মুলজেটের ইংরেজি অনুবাদ থেকে অনূদিত।]