একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ কোনটি—এই প্রশ্নের অনেক পরিচিত উত্তর আছে। জমি, নদী, খনিজ, কারখানা, প্রযুক্তি। তালিকাটি আরও বড় করা যায়।

কিন্তু একটি সম্পদ প্রতিদিন নতুন করে জন্মায়।

মানুষের সময়।

আজ সকালে যত মানুষ ঘুম থেকে উঠেছেন, তাঁদের প্রত্যেকের সামনে আবার একটি করে দিন এসে দাঁড়িয়েছে। কারও আট ঘণ্টা, কারও দশ ঘণ্টা, কারও আরও বেশি—কাজ করার, কিছু বানানোর, শেখার, বিক্রি করার, অন্য কারও প্রয়োজন মেটানোর সময়।

দিন শেষে এই সময়ের একটি অংশ টাকায় বদলে যাবে।

একজন শ্রমিকের সময় জামা হয়ে বের হবে কারখানা থেকে। একজন চালকের সময় কাউকে পৌঁছে দেবে মতিঝিলে। দোকানির কয়েক ঘণ্টা চাল-ডাল বিক্রি হয়ে ক্যাশবাক্সে জমবে।

অর্থনীতি সম্ভবত এই আশ্চর্য কাজটিই করে—মানুষের জীবনের কয়েকটি ঘণ্টাকে কোনো কিছুর দামে অনুবাদ করে দেয়।

কিন্তু সবার সময়ের অনুবাদ হয় না।

সকাল আটটায় ঢাকার বাসগুলো যখন মানুষ নিয়ে ছুটছে, গাজীপুরে কারখানার গেট খুলছে, দোকানে দোকানে শাটার উঠছে, তখন অসংখ্য ঘরে আরও একটি সকাল শুরু হয়েছে, যার বাজারদর আপাতত শূন্য।

মানুষগুলো অলস নন।

তাঁদের সময়ের শুধু ক্রেতা নেই।

কেউ বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করেছেন দুই বছর আগে। কেউ একটি পরীক্ষার ফলের অপেক্ষায় থেকে আরেকটির ফরম পূরণ করছেন। কারও টেবিলে চাকরির বই, ফাইলে সার্টিফিকেট। কেউ টিউশনি করেন, কিন্তু নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, ‘চাকরি খুঁজছি।’

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সময় তাঁদেরও ঠিক চব্বিশ ঘণ্টাই দেয়।

ঘড়ি কোনো বৈষম্য করে না।

বাজার করে।

এ কারণেই সকাল সম্ভবত এই গল্পটি দেখার সবচেয়ে ভালো সময়। সকাল মানুষকে খুব সহজে দুই ভাগে আলাদা করে দেয়—যাঁদের কোথাও পৌঁছাতে হবে এবং যাঁদের জন্য কোথাও পৌঁছানোর জায়গাটি এখনো তৈরি হয়নি।

প্রথম দলের মানুষ ঘড়ি দেখে ভয় পান।

দ্বিতীয় দলের কাছে ঘড়িটিই কখনো কখনো ভয়ংকর ধীর।

এমন একটি সকালকে আমরা ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য বলতে পারি। একজন মানুষের জীবনে এমন সময় আসতেই পারে।

কিন্তু একই দৃশ্য যদি একটি ঘর থেকে আরেকটি ঘরে, একটি জেলা থেকে আরেকটি জেলায়, কয়েক লাখ থেকে কয়েক মিলিয়ন মানুষের জীবনে ছড়িয়ে পড়ে—তখন প্রশ্নটি আর ব্যক্তিগত থাকে কি?

সম্প্রতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশে প্রায় চার কোটি শিক্ষিত বেকার যুবক থাকার কথা বলেছেন। সংখ্যাটি সরকারি যাচাইকৃত পরিসংখ্যান নয়; তার রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই দেখতে হবে।

চার কোটি ঠিক কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

কিন্তু আপাতত সংখ্যাটি অর্ধেক করে দেওয়া যাক।

তারপর আবার অর্ধেক।

আরও কমানো যাক।

শেষ পর্যন্ত যদি পঞ্চাশ লাখ মানুষও থাকে, যাদের দিনের বড় একটি অংশের কোনো নিয়মিত ক্রেতা নেই—তাহলে পঞ্চাশ লাখ মানুষের সেই সময় আমরা কোথায় রাখব?

সময় তো গুদামে রাখা যায় না।

আজকের আট ঘণ্টা আগামী বছরের জন্য জমিয়েও রাখা যায় না।

দিনটি চলে গেলে সম্পদটিও চলে যায়।

কোনো শব্দ না করে।

পঁচিশ বছরের একজন মানুষ প্রতিদিন আট ঘণ্টা কাজ করতে পারতেন। কিছু তৈরি করতে পারতেন। কিছু শিখতে পারতেন। কোনো সেবা দিতে পারতেন। গতকালের চেয়ে আজ একটু দক্ষ হতে পারতেন।

কাজ না পেলে শুধু তাঁর মাসের বেতন হারায় না।

হারিয়ে যায় সকাল।

তারপর দুপুর।

তারপর একটি দিন।

তারপর এমন অনেক দিন, যেগুলোর আলাদা কোনো নাম নেই।

ধান নষ্ট হলে আমরা দেখি। বন্যায় রাস্তা ভাঙলে দেখি। একটি কারখানা বন্ধ থাকলে তার মরচে পড়া গেটটিও দেখা যায়।

কিন্তু একজন কর্মক্ষম মানুষের সকাল দশটা থেকে বেলা একটা পর্যন্ত নিঃশব্দে চলে গেলে কোনো ধোঁয়া ওঠে না।

সাইরেন বাজে না।

জাতীয় কোনো শোকও পালন করা হয় না।

সময় সম্ভবত বাংলাদেশের সবচেয়ে নিঃশব্দে নষ্ট হওয়া সম্পদ।

মানুষটির পকেটে টাকা নেই—এটাই দৃশ্যমান ক্ষতি। কিন্তু হিসাবের আরও গভীরে যে জিনিসটি প্রতিদিন হারিয়ে যায়, তার নাম মানুষের সময়।

এই সময় হারানোরও আবার নিজস্ব অবকাঠামো আছে।

কোচিং সেন্টারের সিঁড়ি।

ফটোকপির দোকানে সিভির স্তূপ।

স্বচ্ছ প্লাস্টিকের ফাইলে সার্টিফিকেট।

চাকরির পরীক্ষার প্রবেশপত্র।

সাধারণ জ্ঞান, বাংলা, ইংরেজি, গণিতের মোটা বই।

এক পরীক্ষায় ফল বের হওয়ার আগেই আরেক পরীক্ষার আবেদন।

এবং মাঝেমধ্যে বাবার প্রশ্ন—

‘কিছু হলো?’

আমাদের দেশে ‘চাকরির প্রস্তুতি’ নিজেই যেন একটি পূর্ণকালীন পেশা। শুধু মাসের শেষে বেতন আসে না।

কেউ দুই বছর এই পেশায় থাকেন। কেউ চার বছর। বন্ধুদের কেউ চাকরি পেয়ে গেলে ফেসবুকে সুন্দর করে অভিনন্দনও লিখতে হয়। ছবির নিচে লাভ রিঅ্যাক্ট দিতে হয়। তারপর নিজের ফোনে ফিরে পরের সার্কুলার দেখতে হয়।

এখানে মানুষটিকে দোষ দেওয়া খুব সহজ।

বলতে সুবিধা হয়—চাকরি না পেলে উদ্যোক্তা হও। কিছু একটা করো। বসে আছ কেন?

বাক্যগুলো ছোট। বাস্তবতা একটু বড়।

কারণ, বাজারে যদি যথেষ্ট অর্থকরী কাজ না থাকে, মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সেই কয়েকটি দরজার সামনে ভিড় করবে, যেগুলো অন্তত খোলা বলে মনে হয়।

এবং এখানেই একটি মজার রহস্য আছে।

তরুণটি চাকরি চায়।

তার মা চান সে চাকরি পাক।

বাবা চান।

ব্যবসায়ী চান ব্যবসা বাড়ুক, নতুন লোক নিয়োগ করতে পারেন।

সরকার কর্মসংস্থান বাড়াতে চায়।

বিরোধী দলও চায়।

অর্থনীতিবিদ চান।

টেলিভিশনের টকশোতেও সবাই চান।

এই একটি বিষয়ে বাংলাদেশে প্রায় সর্বসম্মতি।

তাহলে বাধাটা কে?

কেউ কি ইচ্ছা করে চাকরিগুলো আটকে রেখেছে?

দেশের কোথাও কি বিশাল একটি গুদাম আছে, যেখানে দশ লাখ নিয়োগপত্র তালা মেরে রাখা? কোনো এক সকালে সরকার তালা খুলবে, নিয়োগপত্রগুলো ট্রাকে করে জেলায় জেলায় পাঠিয়ে দেবে?

হলে সমস্যাটি বেশ আরামদায়ক ছিল।

কিন্তু চাকরি কোনো গুদামের পণ্য নয়।

এখানেই হিসাবটা বদলে যায়।

আমরা সাধারণত বলি, মানুষের ‘কাজ’ দরকার। কথাটি ঠিক। কিন্তু অর্থনীতির ভাষায় এর ভেতরে আরেকটি কঠিন শব্দ লুকিয়ে আছে—

অর্থকরী কাজ।

ধরা যাক দশজন মানুষকে কাজে লাগানো হলো। সকাল থেকে তাঁরা দশটি গর্ত খুঁড়লেন। ঘাম ঝরল। কোদাল চলল। দুপুরে বিশ্রাম হলো।

পরদিন তাঁদের বলা হলো, এবার গর্তগুলো ভরাট করুন।

তাঁরা সেটিও করলেন।

দুই দিন কাজ হয়েছে।

কিন্তু কী তৈরি হলো?

কেউ কি এর জন্য নিজের পকেট থেকে টাকা দিতে চাইবেন?

এই প্রশ্নটিই আসল।

মানুষের হাত ব্যস্ত রাখা কর্মসংস্থান নয়। সেই হাতের কাজের জন্য কাউকে টাকা দিতে রাজি করাতে পারাই আসল পরীক্ষা।

একজন শিক্ষক পড়ান, কারণ তাঁর পড়ানোর মূল্য আছে। একজন দরজি জামা বানান, কারণ কেউ সেই জামা কিনবেন। একজন সফটওয়্যার প্রকৌশলী কোড লেখেন, কারণ কোনো প্রতিষ্ঠান সেই কোডের জন্য অর্থ দেয়। একটি কারখানার শ্রমিক পণ্য তৈরি করেন, কারণ শেষ পর্যন্ত কোথাও একজন ক্রেতা আছেন।

চাকরির একটি গোপন শর্ত আছে।

তার পেছনে একজন ক্রেতা লাগে।

হতে পারেন তিনি পাশের মহল্লার মানুষ। কোনো প্রতিষ্ঠান। সরকার। অথবা পৃথিবীর অন্য প্রান্তের অচেনা কেউ।

কিন্তু কাউকে না কাউকে বলতে হবে—হ্যাঁ, এই পণ্যটি আমার দরকার; এই সেবাটির দাম আমি দেব।

এখন আবার সংখ্যাটির দিকে তাকান।

চার কোটি বাদ দিন।

ধরা যাক আমাদের সামনে শুধু বিশালসংখ্যক কর্মক্ষম মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন, যাঁদের নিয়মিত আয় দরকার।

তাঁদের প্রত্যেকের জন্য একটি চেয়ার বানালেই হবে না।

প্রয়োজন হবে কোনো পণ্য।

কোনো সেবা।

তার ক্রেতা।

তার বাজার।

পুঁজি।

এবং এমন কোনো কারণ, যার জন্য ক্রেতাটি অন্য কারও বদলে আমাদের মানুষের তৈরি জিনিসটি কিনবেন।

হঠাৎ ‘চাকরি দেওয়া’ কথাটি আর তত ছোট শোনায় না।

একটি নিয়োগপত্র আসলে কাগজের একটি পাতা। কিন্তু টেকসই সেই একটি পাতার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে উৎপাদন, দক্ষতা, চাহিদা, পুঁজি এবং বাজারের একটি দীর্ঘ অদৃশ্য সারি।

বিকেল নামার আগে আবার সকালের সেই ঘরে ফেরা যাক।

এখন দুপুর।

তরুণটি হয়তো বিছানায় আধশোয়া হয়ে ফোন দেখছে। সকালের ই-মেইল বাক্সে নতুন কিছু আসেনি। একটি চাকরির বিজ্ঞাপন পেয়েছে, অভিজ্ঞতা চেয়েছে দুই বছর। বিজ্ঞাপনটি বন্ধ করে সে আরেকটি খুলেছে।

মা দরজার কাছে এসে দাঁড়ান।

‘আজ কোথাও যাবি না?’

‘না।’

মা চলে যান।

এতটুকুই।

কেউ কাঁদে না। ব্যাকগ্রাউন্ডে কোনো বিষণ্ন সংগীতও বাজে না। রান্নাঘরে হাঁড়ির ঢাকনার শব্দ হয়। পাশের বাসার শিশু স্কুল থেকে ফেরে। রাস্তায় দুপুরের রিকশা চলে।

জীবন স্বাভাবিক।

ভয়টিও সেখানে।

কারণ, এই সকাল তার প্রথম সকাল নয়।

কালও হয়তো এমন ছিল।

আগামীকালও এমন হতে পারে।

বেকারত্বের সবচেয়ে নিষ্ঠুর দিক সম্ভবত শুধু আয় না থাকা নয়। একটি অস্বাভাবিক জীবন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া। তারপর একদিন আর বোঝা না যাওয়া—অস্বাভাবিক আসলে কোনটি।

তাই শুরুতে যে প্রশ্নটি ছিল—এত মানুষ চাকরি পাচ্ছে না কেন?—সেটি সম্ভবত যথেষ্ট বড় প্রশ্ন নয়।

আরেকটু গভীরে যেতে হয়।

এই মানুষগুলো কী তৈরি করবেন?

কাকে সেবা দেবেন?

দেশের ভেতরে আমরা তাঁদের শ্রম দিয়ে কী বিক্রি করব?

আর দেশের সীমানা পেরিয়ে পৃথিবীর বাজারে গেলে প্রশ্নটি আরও কঠিন। সেখানে কেউ আমাদের জনসংখ্যা দেখে পণ্য কেনে না। কেউ আমাদের বেকারত্ব দেখে অর্ডার দেয় না। ক্রেতার নিজস্ব হিসাব আছে—দাম কত, মান কেমন, সময়মতো পাওয়া যাবে কি না, এবং একই জিনিস অন্য কোথাও আরও ভালো বা সস্তায় পাওয়া যায় কি না।

অর্থাৎ একজন ক্রেতাকে শেষ পর্যন্ত নিজের পকেট থেকে টাকা বের করে বলতে হবে—

—এটা আমি বাংলাদেশ থেকেই কিনতে চাই।

এখানেই চাকরির গল্পটি বদলে যায়।

চাকরি আসলে শুরু নয়।

চাকরি অনেক কিছুর শেষ ফল।

কোথাও আগে একটি পণ্য বিক্রি হয়েছে। একটি সেবার ক্রেতা পাওয়া গেছে। একটি কারখানা অর্ডার পেয়েছে। একটি ব্যবসা তার বাজার বাড়িয়েছে। তারপর সেই টাকার পথ ধরে কোনো এক সকালে একজন মানুষের হাতে এসেছে নিয়োগপত্র।

তাই কয়েক কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত কয়েক কোটি নিয়োগপত্রের প্রশ্ন নয়।

প্রশ্নটি হলো, কয়েক কোটি মানুষের শ্রম দিয়ে আমরা এমন কী তৈরি করতে পারি, যা কিনতে কেউ রাজি হবে?

এই ‘কেউ’ পাশের বাড়ির মানুষটি হতে পারেন। বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠান হতে পারে। আবার দশ হাজার কিলোমিটার দূরের এমন একজন ক্রেতাও হতে পারেন, যিনি বাংলাদেশকে কখনো দেখেননি।

তারও একটি সমস্যাই আছে। তিনি আমাদের সমস্যা সমাধান করতে বাজারে আসেননি। তিনি নিজের প্রয়োজন মেটাতে এসেছেন।

পৃথিবীর বাজারে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সামনে প্রশ্নটি ‘আমাদের কত মানুষের কাজ দরকার?’ নয়।

বাজারের প্রশ্নটি অনেক ঠান্ডা—

আপনারা কী দিতে পারেন?

এবং সম্ভবত বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের আসল গল্প শুরু হয় ঠিক এই প্রশ্নটির পর থেকে।