হিমালয় অঞ্চলে হাজার বছরের পাহাড়ি বরফ কাদায় মিশে নেমে আসার ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব কেবল নেপালেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমগ্র উপমহাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু কাঠামোকে আমূল বদলে দিচ্ছে। এরই মধ্যে ঢাকার শারদীয় ঋতু এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় নতুন মোড় দেখা দিয়েছে।
আজ সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঢাকার আকাশে রোদ ও মেঘের খেলা চলতে থাকে। কখনো বা রোদ এতটাই তীব্র হয় যে মনে হয় আকাশে মেঘের কোনো ছুটি নেই, তবে পাঁচ মিনিট পরই চারপাশের আলো ম্লান হয়ে যায়। বর্ষা শেষ হলেও শরৎ এখনো ঢাকায় পূর্ণতা পায়নি। গত বর্ষায় গরমের তীব্রতা ছিল অস্বাভাবিক, যেখানে বৃষ্টির পরও মানুষ ঘামে ভিজেছে। মহান হিমালয় তার কন্যা নেপালকেও ছাড় দিচ্ছে না বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।
পৃথিবী গরম হচ্ছে—এই কথা আমরা সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত শুনলেও বা পড়লেও তা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেললে তবেই তা অনুভব করা যায়। হিমালয়ের ভয়াবহ সেই দুর্যোগের খবর সবাই জানেন। হিমালয়ের হাজার বছরের পাহাড়ি পাথুরে বরফ কাদায় মিশে একসঙ্গে নেমে এসেছিল মানুষের জীবনের ওপর। একটি চনমনে নেপালি সকাল মুহূর্তে বদলে গিয়েছিল। ওই দিন যারা সকালে ঘর থেকে বের হয়েছিল হাসিমুখে, তাদের অনেকেই আর ঘরে ফিরতে পারেনি।
হিমালয় অনেকের কাছে দূরের পাহাড় মনে হলেও এর বরফ গলে সৃষ্ট পানি নদীর মাধ্যমে সমতলে এসে পৌঁছায়। কত দেশ ও জনপদ পার হয়ে শেষ পর্যন্ত তা আমাদের বৃহৎ বঙ্গীয় বদ্বীপে মিশে। তাই পাহাড়ধস ও নেপালের বিপর্যয় সম্পর্কে আমরা নিরুত্তাপ থাকতে পারি না। প্রতি বর্ষাকালে আমাদের দেশেও পাহাড়ধসে প্রাণহানি হয়, কোথাও পাঁচজন, কোথাও দশজন। এছাড়া প্রতি বছর নদীগুলো অস্বাভাবিকভাবে ফুলে ওঠে, যা গ্রামীণ অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত মানুষের ঘরেই পৌঁছায়। সমুদ্রের পানিস্তরও ধীরে ধীরে বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
প্রকৃতির এই পরিবর্তনের কথা চিন্তা করতে করতে মেট্রোর সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিলাম। সময় কম থাকায় অফিসের পাঞ্চটা ঠিক সময়ে দেওয়ার চিন্তা মাথায় ছিল। মেট্রোর নিচে বের হতেই শুরু হয়েছে বৃষ্টি। বাইরের মানুষ দ্রুত আশ্রয় নিচ্ছেন। মেট্রোর নিচে দাঁড়িয়ে থাকা একজন হেসে বললেন, —দারুণ বৃষ্টি! সত্যিই তখন দারুণ লাগছিল। গরমের মধ্যে হঠাৎ বৃষ্টি নামলে ঢাকার মানুষ একটু থামে। কেউ আকাশের দিকে তাকায়, কেউ মোবাইল বের করে, কেউ ছাতা খোঁজে। ব্যস্ত শহর কয়েক মুহূর্তের জন্য অন্য রকম হয়ে যায়। কিন্তু এই শারদীয় বৃষ্টিরও মেজাজ আছে। দু-তিন মিনিটের মধ্যে তার চেহারা পাল্টে গেল। সামনে রাস্তা ঝাপসা। মেট্রোর নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো আরও ভেতরে সরে আসছেন। সামনের অফিস বিল্ডিংটা মাত্র তিন–চার মিনিটের হাঁটা পথ। এখন মনে হচ্ছে, মাঝখানে ছিপছিপে কারওয়ান নদী এসে গেছে। ভিড় বাড়ছে। কেউ মেট্রোর ছাট থেকে বের হচ্ছে না। কারও হাতে ব্যাগ, কারও হাতে ল্যাপটপ, কেউ ফোনে অফিসে জানাচ্ছেন একটু দেরি হবে। বারোটার আপলোডটা ছাড়ুন। একজন ছাতা খুলে আবার বন্ধ করে ফেললেন। বাতাসের সঙ্গে বৃষ্টির যে তেজ! হালের মাঙ্কি ছাতা কাজে আসবে না। আমারও ভয় হচ্ছে। পুরো ভিজলে জ্বর হতে পারে। কিংবা খুশখুশে কাশি। তারপর অফিস, কাজ, দুই দিনের অসুবিধা—সব মিলিয়ে শরতের বৃষ্টি অযথা ঝামেলায় পরিণত হতে পারে।
কিন্তু আমার সামনে আরেকটা ঝামেলা। পাঞ্চ। সময় চলে যাচ্ছে। একবার বৃষ্টির দিকে চোখ রাখি তো আরেকবার ঘড়ির দিকে। কী আশ্চর্য! একদিকে জলবায়ু পরিবর্তন, হিমবাহ গলে যাওয়া, সমুদ্রের উচ্চতা বাড়া; অন্যদিকে আমার এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা অফিসের পাঞ্চটা ঠিক সময়ে দেওয়া যাবে কি না। মানুষ বোধ হয় এভাবেই বড় বিপর্যয়ের মাঝেও নিজের ছোট জীবনটা বাঁচিয়ে রাখে। তবু কথাটা মাথা থেকে যাচ্ছিল না। আমরা কি সত্যিই বুঝতে পারছি আমাদের কী কী বদলে যাচ্ছে? নাকি নিজের শরীরে যতক্ষণ না লাগে, ততক্ষণ পৃথিবী দিন দিন উষ্ণ হচ্ছে এটি আমাদের কাছে একটা খবর মাত্র? এর মধ্যে বৃষ্টির তেজ একটু কমল। মুষলধারার জায়গায় এল চিকন জল। বাতাসে ভেসে আসছে জলের কণা। ভিজিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু আগের মতো আছড়ে পড়ছে না। ছাঁটবৃষ্টি। এই বৃষ্টিটা চেনা। হৃদপুরে দেখেছি এমন বৃষ্টি। উত্তরবঙ্গের শরৎ দুপুরে হঠাৎ শীতল হাওয়া উঠত, তারপর ঝিরঝির করে নামত ছাটা। মাঠে, উঠোনে, টিনের চালে—সবখানে তার আলাদা শব্দ ছিল। আজ সেই বৃষ্টি ঢাকায়। ঘড়ির দিকে শেষবার তাকালাম। আর দাঁড়িয়ে থাকার সময় নেই। ব্যাগটা শক্ত করে ধরলাম। জ্বর-কাশির ভয় মাড়িয়ে বেরিয়ে পড়লাম। দুই শ মিটার রাস্তা। ছাঁটবৃষ্টির মধ্যে খোটা দৌড়ে হঠাৎ মনে হলো, এই ছোট্ট পথটাও যেন আজ অন্য কোনো অর্থ নিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছে। পৃথিবী বদলাচ্ছে। আমাদের ঋতু বদলাচ্ছে। বৃষ্টির ভাষাও বদলাচ্ছে। আর আমরা? আমরা এখনো সময়মতো অফিসে পাঞ্চ দেওয়ার জন্য দৌড়াচ্ছি। হয়তো এটাই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি। অথবা সবচেয়ে বড় অসহায়ত্ব।