রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজশাহী জেলার গ্রাম আদালতের কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও সদস্যদের পদ শূন্য থাকায় ইউনিয়ন পর্যায়ে দোরগোড়ার বিচারব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় সাধারণ মানুষ আইনি সেবা পেতে চাইলেও বঞ্চিত হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রেই আদালতের কক্ষ তালাবদ্ধ বা ধুলাবালিতে ঢেকে আছে। ফলে স্থানীয়ভাবে দ্রুত ও স্বল্প খরচে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ হারিয়ে বাধ্য হয়ে উপজেলা ও জেলা আদালতে মামলা করতে হচ্ছে গ্রামবাসীদের।
গ্রামীণ জনগণের, বিশেষ করে নারী ও দরিদ্র শ্রেণির ন্যায় বিচার নিশ্চিত এবং উচ্চ আদালতের মামলার জট কমানোর লক্ষ্যে ১৯৭৬ সালে গ্রাম আদালত অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে এই ব্যবস্থা চালু হয়। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের গ্রাম আদালত আইন ও ২০১৬ সালের বিধিমালা প্রণয়ন এবং ২০১৩ ও ২০২৪ সালে সংশোধনী আনার মাধ্যমে এটি আরও শক্তিশালী করা হয়। ছোটখাটো ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলা, যেমন—চুরি, ঝগড়া-বিবাদ, সম্পত্তি দখল পুনরুদ্ধার, কৃষি শ্রমিকদের মজুরি আদায় ইত্যাদি এই আদালতের আওতাভুক্ত। দুই পক্ষ থেকে দুইজন করে মোট পাঁচজন সদস্য নিয়ে গঠিত এই আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলায় সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে এবং ফৌজদারি মামলায় প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার বিধান রয়েছে।
তবে রাজশাহীর বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। জেলার নয়টি উপজেলার ৭১টি ইউনিয়ন পরিষদে গ্রাম আদালত পরিচালিত হয়। গত বছরের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বেশিরভাগ ইউনিয়নে নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও সদস্যরা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ায় সাধারণ সদস্য বা সরকারি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্যানেল চেয়ারম্যান বা প্রশাসকের দায়িত্ব দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। কিন্তু এই বিকল্প ব্যবস্থায় আদালতের কার্যক্রম আগের গতিতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। সরেজমিনে দেখা গেছে, যেসব ইউনিয়নে নিয়মিত শুনানি হওয়ার কথা, সেই কক্ষগুলো কার্যত পরিত্যক্ত। চেয়ার-টেবিল গুছিয়ে রাখা বা দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ অবস্থায় থাকা আদালতের কক্ষ নীরবতার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আগে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তি হওয়া বিরোধ এখন দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করছে। আইনজীবীর খরচ, যাতায়াত ব্যয় এবং বিচারের দীর্ঘায়নে তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। বিষয়টি বিচারপ্রার্থী ও সংশ্লিষ্টরাও নিশ্চিত করেছেন।
বাগমারা উপজেলার ১০ নম্বর মারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. আশরাফুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "নিয়মিত চেয়ারম্যান না থাকায় গ্রাম আদালতের কার্যক্রম স্বাভাবিক গতিতে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবুও জমে থাকা অভিযোগগুলো ধাপে ধাপে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।"
মোহনপুর উপজেলার ৫ নম্বর মারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত মেজর বিশ্বাস জানান, "জনসাধারণ যাতে একেবারে বিচারসেবা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেজন্য সীমিত পরিসরে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।"
অন্যদিকে, পবা উপজেলার ৯ নম্বর পারিলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সাঈদ আলী বলেন, "সীমিত জনবল ও বিভিন্ন আইনি জটিলতার মধ্যে সপ্তাহে অন্তত একদিন গ্রাম আদালতের অভিযোগগুলোর শুনানি নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।"
প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীতে বর্তমানে ৭১ জন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, ৬৩৯ জন সাধারণ সদস্য এবং ২১৩ জন সংরক্ষিত মহিলা সদস্যের পদ শূন্য রয়েছে। সংযুক্ত প্রকল্পের তথ্য বলছে, জেলার সব ৭১টি ইউনিয়নই গ্রাম আদালত কার্যক্রমের আওতাভুক্ত। চলতি ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ২৩৩টি অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮৮৮টি অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে, বিচারাধীন রয়েছে ১৮৩টি মামলা। ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষের অনুকূলে আদায় করে দেওয়া হয়েছে এক কোটি ৩০ লাখ ৩৬ হাজার ৮৪৯ টাকা। অবকাঠামোগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে ৬৩টি ইউনিয়নে গ্রাম আদালতের কক্ষ সংস্কার এবং ছয়টি ইউনিয়নে নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।
বাগমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সেলিম আহমেদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "গ্রাম আদালত সচল রাখতে প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। যেসব ইউনিয়নে সমস্যা রয়েছে, সেখানে নিয়মিত তদারকির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।"
মোহনপুরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) জোবায়দা সুলতানা বলেন, "বিচারপ্রার্থীরা যাতে দ্রুত সেবা পান, সে লক্ষ্যে বিকল্প ব্যবস্থাপনায় গ্রাম আদালতের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।"
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রাজশাহী জেলা কমিটির সভাপতি ও সমাজকর্মী আহমেদ শফি উদ্দিন বিষয়টি বিশ্লেষণ করে বলেন, "নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতি, প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা এবং জনবল সংকটের কারণে গ্রাম আদালত এখনও পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি।" তার মতে, স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত, সহজ ও স্বল্প ব্যয়ে বিচার নিশ্চিত করতে গ্রাম আদালতের বিকল্প নেই। এই ব্যবস্থা কার্যকর থাকলে উপজেলা ও জেলা আদালতে ছোটখাটো মামলার চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। তাই স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি গ্রাম আদালতকে পূর্ণাঙ্গভাবে সচল করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট উম্মে কুলসুম জানান, "ইতোমধ্যে প্রায় ১২টি নতুন এজলাস তৈরি করা হয়েছে। যেসব ইউনিয়নে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম বন্ধ বা অনিয়মিত রয়েছে, সেগুলো দ্রুত সচল করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।"