মায়ের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই বাবাকেও হারিয়েছে ১৩ বছরের মেঘা ও তার ৮ বছরের ছোট ভাই গোপাল। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মায়ের মৃত্যুর এক মাসের মাথায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল তাদের বাবা রতন পোদ্দারের (৫৫)। একসঙ্গে মা-বাবাকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে শিশু দুটি। তাদের দেখভালের দায়িত্ব নেওয়ার মতোও পরিবারে এখন আর কেউ নেই।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যার দিকে শরীয়তপুর জেলা শহরের ধানুকা স্টেডিয়ামের সামনে বাসের ধাক্কায় নিহত হন রতন পোদ্দার। তিনি শরীয়তপুর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ মধ্যপাড়া এলাকার মৃত গৌরঙ্গ পোদ্দারের ছেলে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়রা জানান, প্রায় এক মাস আগে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকেই তিনি মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছিলেন। বিভিন্ন সময়ে তাকে বিভিন্ন স্থানে সড়কে দাঁড়িয়ে ট্রাফিক পুলিশের মতো গাড়িকে সিগনাল দিতে দেখা যেত। বুধবার বিকেল থেকেই রতন পোদ্দার ধানুকা স্টেডিয়ামের সামনে সড়কে চলাচলকারী বিভিন্ন যানবাহন হাতের ইশারায় সরিয়ে দিচ্ছিলেন।

কিন্তু সন্ধ্যার দিকে শরীয়তপুর আন্তজেলা বাসমালিক সমিতির একটি মিনিবাস দ্রুতগতিতে ওই সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় রতন পোদ্দার হাতের ইশারা দিয়ে গাড়িটি সরানোর চেষ্টা করেন। এ সময় বাসটি তাকে ধাক্কা দিলে তিনি সড়কে ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা গুরুতর আহত অবস্থায় রতনকে উদ্ধার করে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে কর্তব্যরত চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় পাঠানোর পরামর্শ দেন। পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে ঢাকায় নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়।

এদিকে, দুর্ঘটনার পর স্থানীয়রা বাসটির পিছু ধাওয়া করে চালকসহ মিনিবাসটি আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, স্ত্রীর মৃত্যুর পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন রতন পোদ্দার। ধীরে ধীরে তার মানসিক ভারসাম্যেও সমস্যা দেখা দেয়। বুধবার সড়ক দুর্ঘটনায় তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মেঘা ও গোপাল মা-বাবা দুজনকেই হারালো।

নিহতের প্রতিবেশী মো. শহিদুল ইসলাম ঢালী বলেন, ‘রতন পোদ্দারের স্ত্রী মারা গেছেন মাসখানেক আগে। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকেই তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছিলেন। আজ সড়ক দুর্ঘটনায় তিনিও মারা গেলেন। তাদের পরিবারে এখন ছোট দুটি বাচ্চা ছাড়া আর কেউ নেই। এখন ওদের কী হবে? আমরা চাই, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এ ঘটনার বিচার হোক। একই সঙ্গে শিশু দুটির ভবিষ্যতের জন্য একটা ব্যবস্থা করা হোক।’

এ বিষয়ে শরীয়তপুর আন্তজেলা বাসমালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফারুক আহমেদ তালুকদার বলেন, ‘আমাদের লোকাল বাসের ধাক্কায় এক মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি আহত হয়েছেন, এ খবর শুনে আমরা দ্রুত তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করি। কিন্তু রাস্তায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আমরা মর্মাহত। মালিক সমিতি তার সাধ্যমতো নিহতের পরিবারের পাশে থাকবে।’

পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহ আলম বলেন, ‘আমরা বাস ও চালককে আটক করেছি। যেহেতু ভিকটিম মারা গেছেন, তাই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’

এদিকে, মা-বাবাকে হারানো শিশু দুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনাটি সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অসহায় শিশু দুটির দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রশাসন ও সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা উচিত।