দেশের একমাত্র চতুর্দেশীয় স্থলবন্দর হিসেবে বাংলাবান্ধা বন্দর থেকে ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পাচ্ছে। করোনা মহামারির প্রভাব কাটিয়ে সাম্প্রতিক অর্থবছরগুলোতে এই বন্দরটি সরকারি কোষাগারে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ জমা করেছে। বিশেষ করে চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) লক্ষ্যমাত্রার প্রায় দ্বিগুণ রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৩০ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৪২৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১১৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ১৬৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯২ কোটি ৬৩ লাখ টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ১১০ কোটি ৫১ লাখ টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫৮ কোটি ৩৩ লাখ টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে প্রায় ৬৪ কোটি সাত লাখ টাকা। তবে ২০২১-২২ অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি দেখা দেয়; ৭০ কোটি ৫৭ লাখ টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয় ৪১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এর আগের অর্থবছর ২০২০-২১-এ ৩৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছিল ৬৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশকে সংযুক্তকারী এই বন্দরটি গত চার অর্থবছরে ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব আদায় বাড়িয়ে যাচ্ছে। পঞ্চগড়-বাংলাবান্ধা রেলপথ নির্মাণ সম্পন্ন হলে সম্ভাবনার দুয়ার আরও প্রশস্ত হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যদিও রেলপথ নির্মাণ নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা কাটেনি, তবুও চার দেশকে রেলপথে যুক্ত করলে বাংলাবান্ধা দক্ষিণ এশিয়ার ব্যবসায়িক প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। এর ফলে স্থলপথে সরাসরি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সংযোগ স্থাপন সম্ভব হবে।
১৯৯৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর নেপালের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে যাত্রা শুরু করা এই বন্দরটি ২০১১ সালে ভারত এবং ২০১৭ সালে ভুটানের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম শুরু করে। ১০ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত এই বন্দরটি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ব্যবসায়ীরা জানান, করোনা পরবর্তী সময়ে নানা জটিলতায় বন্দরটি কিছুটা ঝিমিয়ে পড়লেও বর্তমানে আবারও গতি ফিরে পেয়েছে। গত চার অর্থবছরে এখান থেকে রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব আদায় হয়েছে। নেপালে সবচেয়ে বেশি পণ্য রপ্তানি হচ্ছে, অন্যদিকে ভুটান ও ভারতে রপ্তানি তুলনামূলক কম।
বাণিজ্যিক পণ্যের বিষয়ে সূত্রগুলো জানায়, বন্দর দিয়ে আমদানিকৃত পণ্যের ৯৫ শতাংশই পাথর। ভারত ও ভুটান থেকে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি পাথর আমদানি করা হয়। ভারত থেকে গম, গমের ভুসি, ভুট্টা, চাল, পাথর, চা প্রক্রিয়াকরণ যন্ত্রাংশ ও আদা আমদানি করা হয়। এ ছাড়া ঝুট কাপড় ও সয়াবিন মিল রপ্তানি হয়। আগে ভারত থেকে সব ধরনের ফলমূল আমদানি করা হলেও বর্তমানে নানা জটিলতায় তা বন্ধ রয়েছে। নেপালে জুট, সিসা, আলু, ফলের রস, ওয়েস্ট কটন, কাপড়, কাঠ, প্লাস্টিকের আসবাবপত্র, সুতলি, কটন র্যাগস, কাঁচ, ব্যাটারি, ওষুধ ও প্রসাধনসামগ্রী রপ্তানি করা হয়। এ ছাড়া প্রাণ ও ওয়ালটন ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল, টিভি, ফ্রিজসহ ইলেকট্রনিক্স, খাদ্যপণ্য, জুস ও টিস্যু পেপার নেপালে পাঠানো হয়। আমদানি করা হয় চিটাগুড়, মসুর ডাল, ছোলাবুট, সরিষার তেল, ডাবর পণ্য, চ্যবনপ্রাশ পণ্য, হাজমওলা ট্যাবলেট ও ফুলঝাড়ু।
ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে বাংলাবান্ধা বন্দরটি অন্যতম সুবিধাজনক। এখান থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি ১৬ কিলোমিটার, দার্জিলিং ৭৭ কিলোমিটার, নেপাল সীমান্ত ৫৪ কিলোমিটার, ভুটান সীমান্ত ১৩০ কিলোমিটার ও চীন সীমান্ত ২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ব্যবসায়ীরা বলছেন, শিলিগুড়ির মতো সমৃদ্ধ শহর অন্যান্য বন্দরের কাছে নেই। ভারতের ‘সেভেন সিস্টারস’ রাজ্যগুলোতে যাওয়ার জন্য বাগডোগরা বিমানবন্দর সবচেয়ে সুবিধাজনক, যা বন্দর থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে। বন্দরের বিপরীতে ভারতের ফুলবাড়ি স্থলবন্দর অবস্থিত। ইমিগ্রেশন কার্যক্রম শুরু হওয়ায় বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাপক প্রসার পেয়েছে, যা পঞ্চগড় জেলা ও উত্তরবঙ্গের উন্নয়নে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
২০২৩ সালে উদ্বোধিত মৈত্রী পাইপলাইন প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতের শিলিগুড়ি মার্কেটিং টার্মিনাল (আসামের নুমালীগড় রিফাইনারি) থেকে বাংলাদেশের পার্বতীপুর রেলহেড তেল ডিপোতে জ্বালানি সরবরাহ করা হয়। ১৩১ দশমিক পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনের ৫ কিলোমিটার ভারতে এবং ১২৬ দশমিক পাঁচ কিলোমিটার বাংলাদেশে অবস্থিত। ভারতের আসাম থেকে তেল পাম্প করে পার্বতীপুরে পৌঁছাতে ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা সময় লাগে। ১৫ বছর মেয়াদি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় প্রতি বছর ১০ লাখ টন পর্যন্ত জ্বালানি তেল আমদানি করা সম্ভব। পার্বতীপুর ডিপোতে পৌঁছানোর পর পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা ওয়েল কোম্পানির মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে সাশ্রয়ী মূল্যে ডিজেল সরবরাহ করা হয়।
বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর লিমিটেডের ইনচার্জ ও ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "দেশের এই বন্দরটি তার গৌরবময় সময় পার করছে। ধারাবাহিক রাজস্ব আদায় বাড়ছে। বন্দরের নিরাপত্তা, ইয়ার্ড বাড়ানোসহ বন্দরের সার্বিক উন্নয়নে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ চলছে।"
অন্যদিকে, স্থলবন্দরের ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "চারদেশীয় হলেও ভবিষ্যতে চীনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারলে আমাদের বন্দরটি আরও গতিশীল হবে। তবে এখানে আমদানি-রপ্তানিতে যদি গতি আনা যায়, বন্দরের ইয়ার্ড বাড়ানো যায় তাহলে ব্যবসায়ীদের সুবিধা হবে।"