ঋণের কথা শুনলেই সাধারণত আমাদের মনে আসে আর্থিক চাপ, কিস্তি আর দুশ্চিন্তার কথা। কিন্তু ‘রিচ ড্যাড পুওর ড্যাড’-এর লেখক রবার্ট কিয়োসাকি ঋণকে দেখেন একেবারে অন্যভাবে। তাঁর দাবি, তিনি এমন একটি রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগ গোষ্ঠীর অংশ, যাদের মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ১২০ কোটি ডলার। আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ঋণকে তিনি সমস্যা নয়; বরং সম্পদ তৈরির একটি কৌশল হিসেবে দেখেন।
শুরুতেই একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। ১২০ কোটি ডলার কিয়োসাকির ব্যক্তিগত ঋণ নয়। তাঁর সাবেক স্ত্রী ও দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সহযোগী কিম কিয়োসাকি জানিয়েছেন, অংশীদারদের সঙ্গে মিলে তাঁদের মালিকানাধীন প্রায় দেড় হাজার অ্যাপার্টমেন্টের রিয়েল এস্টেট পোর্টফোলিও থেকেই এই বিপুল ঋণের হিসাব এসেছে।
কিয়োসাকির আর্থিক দর্শনের কেন্দ্রে আছে ‘ভালো ঋণ’ ও ‘খারাপ ঋণ’-এর পার্থক্য। তাঁর যুক্তি, নিয়মিত আয়ের উৎস তৈরি করে, এমন কোনো সম্পদ কেনার জন্য ঋণ নেওয়া হলে সেই ঋণ সম্পদ তৈরির হাতিয়ার হতে পারে।
যেমন তিনি ঋণ নিয়ে অ্যাপার্টমেন্ট বা অন্য কোনো আয়ের উৎস সৃষ্টিকারী সম্পদ কেনেন। সেই সম্পদ থেকে ভাড়া আসে। সেই আয় দিয়ে সম্পত্তির খরচ ও ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা যায়। একই সঙ্গে সম্পত্তির দাম বাড়লে মালিকের সম্পদের মূল্যও বাড়ে।
এই পদ্ধতিতে মূলধন না থাকলেও ঋণ ব্যবহার করে বড় সম্পদ তৈরি করা সম্ভব, কিয়োসাকির দর্শন মূলত এমনই।
তবে এতে ঝুঁকিও কম নয়। সম্পত্তি খালি পড়ে থাকলে, ভাড়া কমে গেলে, সুদের হার বেড়ে গেলে কিংবা সম্পত্তির দাম পড়ে গেলে বড় ঋণের বোঝা দ্রুতই সমস্যায় পরিণত হতে পারে।
না। কিয়োসাকি নিজে এই ঋণের দায়ে আছেন, এমনটা বলা ঠিক হবে না। বছরে তাঁর প্রায় ৩০ লাখ ডলার আয় হয় বলে দাবি করেছেন। সেই হিসাবের ভিত্তিতে ‘ভ্যানিটি ফেয়ার’ ধারণা করেছে, ওই বিশাল রিয়েল এস্টেট ঋণের মধ্যে তাঁর ব্যক্তিগত অংশ হয়তো তিন থেকে ছয় কোটি ডলারের মধ্যে হতে পারে। তবে এই হিসাব স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
অর্থাৎ আলোচিত ১২০ কোটি ডলার মূলত অংশীদারদের নিয়ে পরিচালিত বৃহৎ বিনিয়োগ পোর্টফোলিওর ঋণ, কিয়োসাকির ব্যক্তিগত ব্যাংকঋণ নয়।
কিয়োসাকি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা লিমিটেড লায়াবিলিটি কোম্পানি বা এলএলসি ব্যবহারের কথাও বলেছেন। এর উদ্দেশ্য হলো, একটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের দায় যেন সরাসরি মালিকের ব্যক্তিগত সম্পদের ওপর না পড়ে।
তবে এলএলসি থাকলেই সব ধরনের দায় থেকে ব্যক্তিগতভাবে নিরাপদ থাকা যায় না। ঋণের চুক্তি, ব্যক্তিগত গ্যারান্টি এবং অন্যান্য পরিস্থিতির ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে।
কিয়োসাকি এই কৌশলকে তাঁর ভাষায় ‘ফায়ারওয়াল’ হিসেবে দেখেন। খুলে বললে, একটি বিনিয়োগের সমস্যা যেন অন্য সম্পদকে টেনে না নামায়।
রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগে সম্পদের বিপরীতে ঋণ নেওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। এতে সম্পদ বিক্রি না করেই মূলধন সংগ্রহ করা যায়। কিন্তু একই সঙ্গে ঋণের সুদ ও অন্যান্য খরচ বাড়ে, নগদ অর্থের ওপর চাপ তৈরি হয়।
রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগকারী ডেভিড এ পেরেজের মতে, সম্পদের বিপরীতে ঋণ নিয়ে নগদ অর্থ বের করে আনা বিনিয়োগকারীদের পরিচিত একটি কৌশল। তবে এর ঝুঁকিও আছে।
আর জেপিটিডি পার্টনার্সের প্রতিষ্ঠাতা জন পুল আরও সতর্ক করে বলেছেন, সম্পত্তির দাম বাড়তে থাকলে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করা দারুণ কাজ করতে পারে। কিন্তু পরিস্থিতি উল্টো দিকে গেলে সেই একই ঋণ বড় আর্থিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
১৯৯৭ সালে প্রথম প্রকাশিত ‘রিচ ড্যাড পুওর ড্যাড’ বইটিই কিয়োসাকিকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে। বইটিতে তাঁর নিজের বাবা ‘পুওর ড্যাড’ এবং তাঁর বন্ধুর বাবা ‘রিচ ড্যাড’-এর আর্থিক চিন্তাধারার তুলনা করা হয়েছে। বইটি এখন পর্যন্ত ৪ কোটি ৪০ লাখের বেশি কপি বিক্রি হয়েছে এবং অনূদিত হয়েছে অন্তত ৪৩টি ভাষায়।
তবে কিয়োসাকির ব্যবসায়িক জীবনও সব সময় মসৃণ ছিল না। ২০১২ সালে তাঁর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রিচ গ্লোবাল এলএলসি আদালতের ২ কোটি ৩৭ লাখ ডলারের রায়ের পর দেউলিয়াত্বের জন্য আবেদন করে। এই দেউলিয়াত্বের আবেদন ছিল কোম্পানিটির, কিয়োসাকির ব্যক্তিগত নয়।
তাই কিয়োসাকির ১২০ কোটি ডলারের ঋণের গল্প আদতে ‘তিনি ১২০ কোটি ডলার দেনায় ডুবে আছেন’—এমনটা নয়। বরং এটি তাঁর বহুদিনের সেই আর্থিক দর্শনেরই বড় উদাহরণ, যেখানে অন্যের টাকা ধার করে আয়ের উৎস সৃষ্টিকারী সম্পদ কেনা এবং সেই সম্পদ দিয়ে ঋণ পরিশোধ করাকেই সম্পদ তৈরির কৌশল হিসেবে দেখা হয়।
তবে এই কৌশলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সারমর্ম কিয়োসাকি নিজেই বলেছেন। এটিকে তাঁর সতর্কতাও বলতে পারেন। কী সেটি? কিয়োসাকি বলেছেন, অন্যের কৌশল দেখে হুবহু অনুসরণ করার আগে নিজের আর্থিক জ্ঞান ও ঝুঁকি বোঝার ক্ষমতা তৈরি করা জরুরি।
সূত্র: ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস টাইমস ইউকে ও ভ্যানিটি ফেয়ার