বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ১৬৫ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম হয়েছে। শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। বরাদ্দের অতিরিক্ত ব্যয়, পরিকল্পনা ছাড়া খরচ, অতিরিক্ত ওভারটাইম ও জ্বালানি ব্যবহার, অনিয়মিত অগ্রিম উত্তোলন, ক্রয়বিধি লঙ্ঘন এবং সরকারি অর্থের হিসাব যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করার মাধ্যমে এসব অনিয়ম করা হয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইউজিসির বিভিন্ন খাতে বাজেট বরাদ্দ ছিল ৮৫ কোটি ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এর বিপরীতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ১১৩ কোটি ২৫ লাখ ৫৩ হাজার ৬৭১ টাকা। ফলে বরাদ্দের অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ২৮ কোটি ২৩ লাখ ৩ হাজার ৬৭১ টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা অনুবিভাগের ‘আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ ২০১৫’ নীতিমালা অনুযায়ী বাজেটের বিভিন্ন কোডের বিপরীতে বরাদ্দকৃত অর্থের মধ্যেই ব্যয় সীমাবদ্ধ রাখার নির্দেশনা রয়েছে।

আয়-ব্যয়ের হিসাবে গরমিল: ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইউজিসির সংরক্ষিত ক্যাশ বইয়ে প্রাপ্তি ও পরিশোধ ত্রুটিপূর্ণভাবে তোলা হয়েছে। নিরীক্ষায় দেখা গেছে, আয়কে ব্যয় এবং ব্যয়কে আয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের মতে, এর মাধ্যমে ইউজিসি ট্রেজারি রুলস লঙ্ঘন করেছে।

আগাম উত্তোলন: ইউজিসির বিভিন্ন কর্মকর্তা নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত ৬৪ লাখ ২ হাজার ১৫৫ টাকা অগ্রিম উত্তোলন করেছেন। অর্থ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী ৭ লাখ টাকার বেশি এককালীন অগ্রিম উত্তোলনের ক্ষেত্রে বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগে পাঠানোর কথা থাকলেও ইউজিসি তা করেনি। অন্যদিকে আরএফকিউ (রিকোয়েস্ট ফর কোটেশন) পদ্ধতিতে পণ্য ও সেবা ক্রয়ে ইউজিসি ব্যয় করেছে ৮০ লাখ ৩৩ হাজার ৭২৮ টাকা। এ ক্ষেত্রে বার্ষিক ক্রয়সীমার অতিরিক্ত ব্যয়ে অনিয়ম হয়েছে ৬৫ লাখ ৩৩ হাজার ৭২৮ টাকা।

ব্যাংক হিসাবে অনিয়ম: যথাযথভাবে ব্যাংক হিসাব সংরক্ষণ না করায় ইউজিসির মাধ্যমে সরকারের ৮৩ কোটি ৬৮ লাখ ১০ হাজার টাকা অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের পরিপত্র অনুযায়ী, সব স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও এর অধীনে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্প-স্কিমের জন্য ‘পার্সোনাল লেজার (পিএল)’ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আর্থিক কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হয়। এ জন্য অর্থ বিভাগের চালু করা আইবাস++ সাব-মডিউলের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে অর্থ ছাড়করণ ও ইএফটি পদ্ধতিতে বিল পরিশোধের নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু ইউজিসি এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেনি।

বরাদ্দ ছাড়াই ব্যয়: ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি (এপিএ) অনুষ্ঠানের নামে ইউজিসি ব্যয় করেছে ৭ লাখ ৭৫ হাজার ৩৭৫ টাকা। এই ব্যয়ের বিপরীতে ভাউচার ব্যবহার করা হলেও কোনো অর্থ বরাদ্দ ছিল না। বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী, বার্ষিক বাজেটে যে উদ্দেশ্যে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়, সেই উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য কোনো কাজে তা ব্যয়ের সুযোগ নেই। বরাদ্দের উদ্দেশ্য পরিবর্তন করে ব্যয় করায় এই অর্থ অপচয় হয়েছে। এ ছাড়া গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে নির্ধারিত হারের চেয়ে কম মূল্যে ভবন ভাড়া দিয়ে ৪ লাখ ১৫ হাজার টাকার আর্থিক অনিয়ম করেছে ইউজিসি।

ক্রয় পরিকল্পনা ছাড়াই ব্যয় ১৭ কোটি টাকা: ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইউজিসি ১৬ কোটি ৭২ লাখ ১০ হাজার টাকা ব্যয় করেছে। কিন্তু এসব ব্যয়ের বিপরীতে বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনার চাহিদা নিরীক্ষায় উপস্থাপন করা হয়নি। ‘আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ ২০১৫’ নীতিমালা অনুযায়ী, বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা প্রণয়ন করে ক্রয়কারী কর্তৃপক্ষের প্রধানের অনুমোদন নেওয়া আবশ্যক। এই নিয়ম অনুসরণ না করায় ১৬ কোটি ৭২ লাখ ১০ হাজার টাকার ব্যয়কে অনিয়মিত ব্যয় ও অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত করেছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর।

খরচ ছাড়াই দেখানো হয় ৯ কোটি টাকার ব্যয়: সরকারের বৃত্তি-মেধাবৃত্তি খাতে ছাড় করা ৯ কোটি টাকা ইউজিসির পৌনঃপুনিক তহবিলের ব্যাংক হিসাব থেকে বৈদেশিক পিএইচডি তহবিলের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। আয়-ব্যয় বিবরণীতে এই ৯ কোটি টাকা শিক্ষকদের বৈদেশিক স্কলারশিপ খাতে ব্যয় হিসেবে দেখানো হয়েছে। অথচ প্রকৃতপক্ষে এই খাতে কোনো অর্থ ব্যয় করা হয়নি। অব্যয়িত অর্থ সমাপনী স্থিতি হিসেবেও দেখানো হয়নি। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন অধ্যাদেশ, ১৯৭৩ অনুযায়ী প্রতি অর্থবছর শেষে কমিশনের হিসাবের বিবরণী নির্ধারিত ফরম্যাটে প্রস্তুত করে কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের কাছে উপস্থাপনের বিধান রয়েছে। কিন্তু নিরীক্ষা দলের কাছে দেওয়া আয়-ব্যয় বিবরণীতে ছাড় করা অর্থ ব্যয় হিসেবে দেখানো হয়েছে। ব্যয় না হওয়া সত্ত্বেও বৈদেশিক পিএইচডি বৃত্তি খাতে ব্যয় দেখানোর কারণে সরকারের ৯ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

বিদ্যুৎ-পানির বিলে অনিয়ম: ইউজিসির বাজেট পরিপত্র অনুযায়ী কমিশনের আবাসনে বসবাসকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদ্যুৎ ও পানির বিলে কোনো ভর্তুকি দেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু এই নির্দেশনা অমান্য করে আবাসিক কোয়ার্টারে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ ও পানির বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১০ লাখ ২৯ হাজার ৬৩৫ টাকা। বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও সংশ্লিষ্ট সেবা সরবরাহ এবং প্রতিস্থাপন কাজে ৯৪ লাখ ৭৬ হাজার ২৩০ টাকা অনিয়মিত ব্যয় করা হয়েছে। এ ধরনের কাজে রাজউকের অনুমোদন নেওয়ার কথা থাকলেও তা না নেওয়ায় বিষয়টিকে অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত করেছে অডিট অধিদপ্তর।

জাবির প্রকল্পে রাজস্ব ক্ষতি ২৩ কোটি: নিরীক্ষায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়িত পূর্তকাজের বিভিন্ন প্যাকেজে বড় ধরনের অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলেও বিলম্ব জরিমানা ছাড়াই ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এতে সরকারের ২৩ কোটি ৪১ লাখ ৮৬ হাজার ৫৪১ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরীক্ষাকাল পর্যন্ত চুক্তি অনুযায়ী কাজ শেষ করার নির্ধারিত সময়সীমা ৪৮১ থেকে ১ হাজার ২৮ দিন পর্যন্ত পার হয়ে গেছে।

অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার: ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইউজিসিতে প্রাপ্যতার অতিরিক্ত গাড়ির জ্বালানি ব্যবহার করা হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানের ৫ লাখ ৮৫ হাজার ৮০২ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। সংস্থাপন-জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী সার্বক্ষণিক গাড়ি ব্যবহারকারী প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাসিক ২০০ লিটার অকটেন-ডিজেল ও ৩০০ ঘনমিটার সিএনজি পাওয়ার কথা। কিন্তু প্রাপ্যতার অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার করে বিল পরিশোধ করায় এই আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

ওভারটাইম, সম্মানীতেও অনিয়ম: প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ওভারটাইম দেওয়া হয়েছে, যাতে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৩৬ লাখ ৯৫ হাজার ৫৬১ টাকা। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রদত্ত অগ্রিম সমন্বয় না করায় ৪০ লাখ ৯২ হাজার ৫৭৯ টাকার আর্থিক অনিয়ম হয়েছে। কর্মকর্তাদের বেতন খাত থেকে ইউজিসি অধ্যাপকদের সম্মানী বাবদ ৪৩ লাখ ৯ হাজার ১৭৬ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে, যা অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার লঙ্ঘন। এ ছাড়া প্রাপ্যতা না থাকলেও মোবাইল ভাতা নেওয়ায় ২ লাখ ২৮ হাজার টাকার আর্থিক অনিয়ম হয়েছে।

দায় নিতে চান না কর্মকর্তারা: এক অর্থবছরেই দেড় শ কোটি টাকার বেশি অনিয়মের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অডিট বিভাগের কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। ইউজিসির অডিট বিভাগের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) নাহিদ সুলতানা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আর্থিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের আপত্তির লিখিত জবাব দিয়েছি আমরা।’ ইউজিসি সচিব মো. ফখরুল ইসলামের কাছে আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রশ্ন শুনে ফোন কেটে দেন।

দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার দাবি: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘ইউজিসিতে যে আর্থিক অনিয়ম হয়েছে, তা মেনে নেওয়া যায় না। এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’