মঙ্গলবার (২ সেপ্টেম্বর) নতুন করে ৫৯ জন সুন্দরবন দস্যু র্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এদের মধ্যে আটজন আগেই আত্মসমর্পণ করে পুনর্বাসিত হলেও পরবর্তীতে আবার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছিলেন। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১১টায় খুলনায় র্যাব-৬ কার্যালয়ে সংবাদ ব্রিফিংয়ে এই তথ্য জানান র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক মো. আহসান হাবীব পলাশ।
আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর ১৬ জন, আনরুল বাহিনীর ১৩ জন, আফজাল ওরফে দুলাভাই বাহিনীর ১৫ জন, আফতার বাহিনীর আটজন এবং মিজান বাহিনীর সাতজন রয়েছেন। অভিযানের সময় র্যাব উদ্ধার করেছে ৫৯টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৫৪১ রাউন্ড তাজা গুলি, ১৪টি খালি কার্তুজ ও সাতটি ওয়াকিটকি। উদ্ধারকৃত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে চারটি শটগান, ৪৭টি ওয়ান শুটার গান, চারটি পাইপগান, তিনটি এয়ারগান এবং একটি পয়েন্ট ২২ বোর রাইফেল।
সুন্দরবনের জলদস্যু ও বনদস্যু দমনে র্যাব, কোস্ট গার্ড, স্থানীয় প্রশাসন, নৌপুলিশ ও বন বিভাগের সমন্বয়ে গত ২ মার্চ থেকে ‘অপারেশন রি-স্টার্ট, পিস ইন সুন্দরবন’ নামে বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে। মহাপরিচালক আহসান হাবীব পলাশ জানান, বর্তমানে সুন্দরবনে চার থেকে পাঁচটি দস্যু বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। এসব সদস্যকে অপরাধের পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা চলছে।
অতীতে আত্মসমর্পণকারীদের পুনরায় অপরাধে জড়িত হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এ পর্যন্ত সুন্দরবনের ৩১৮ জন দস্যু আত্মসমর্পণ করেছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৩০ জন পুনরায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ফিরে গেছে। আত্মসমর্পণকারীদের একটি অংশ পুনর্বাসনের সুযোগ পাওয়ার পরও কেন আবার অপরাধে ফিরছে, সেটিই এখন নতুন করে ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক চাপ, রাজনৈতিক কারণ, সচেতনতার অভাব, স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে অনীহা এবং হয়রানির ভয়—এসব কারণে কেউ কেউ আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, আমরা ১০০ শতাংশ তো আর আনতে পারব না। যেহেতু আমরা তাদের সার্বক্ষণিক নজরদারি করতে পারি না। আর কিছু বাস্তব সীমাবদ্ধতাও থাকে।
আত্মসমর্পণকারীদের বিষয়ে নজরদারি নেই—এমনটি নয় বলেও জানান র্যাব মহাপরিচালক। তিনি বলেন, র্যাবের গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। আত্মসমর্পণের পর কেউ আবার অপরাধে জড়াচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে এবার পুনর্বাসন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে আহসান হাবীব পলাশ বলেন, আত্মসমর্পণকারীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে আগের চেয়ে ভালো পুনর্বাসন ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চলছে।
আত্মসমর্পণকারীদের অহেতুক মামলা ও হয়রানি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা প্রমাণ ছাড়া কাউকে আটক কিংবা মামলা দেওয়া উচিত নয়। ভবিষ্যতে আত্মসমর্পণকারীরা যাতে অহেতুক হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক করা হয়েছে। সুন্দরবনের নিরাপত্তা জোরদারে সেখানে একটি র্যাব ব্যাটালিয়ন গঠন করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন আহসান হাবীব পলাশ। তিনি বলেন, বর্তমানে সুন্দরবন এলাকায় কোস্ট গার্ডের একটি ক্যাম্প রয়েছে। সুন্দরবনবাসী চাইলে সেখানে র্যাবের একটি ব্যাটালিয়ন গঠনের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করা যেতে পারে।
এ সময় দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান শুরু করার কথাও জানান র্যাব মহাপরিচালক। তিনি বলেন, র্যাবের নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যৌথভাবে এ অভিযান পরিচালনা করবে। এর কার্যক্রম ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে। অভিযানে তথ্য দিয়ে সহযোগিতার জন্য গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তথ্যদাতাদের পরিচয় গোপন রাখা হবে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করবে।
সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত রাখতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন র্যাব মহাপরিচালক। একই সঙ্গে উপকূলীয় মানুষের নিরাপত্তা, বনজীবীদের জীবন-জীবিকা এবং দেশের মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি.