দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চলমান সংকট মোকাবিলায় আমলাতান্ত্রিক নির্ভরতা ত্যাগ করে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের অভিজ্ঞ পেশাজীবী ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন এবং পর্যায়ভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক সহ-উপাচার্য আব্দুল হাসিব চৌধুরী। বর্তমানে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর নির্ভর করছে। যদিও আমদানিনির্ভরতা থেকে দ্রুত মুক্তি পাওয়া কঠিন, তবে তা হ্রাস করা সম্ভব। তিনি উদাহরণ হিসেবে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার কথা উল্লেখ করে বলেন, সেখানকার দেশগুলো সম্পূর্ণ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল হলেও দক্ষতার সঙ্গে তা ব্যবহার করে থাকে। ফলে জ্বালানি খাতে নীতিগত পরিকল্পনার গুরুত্ব অপরিসীম।
এলএনজি আমদানিতে বাধার কারণে দেশে গ্যাস সংকট তীব্র হয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে। বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিনের জমানো ঘাটতি রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারকে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, সীমিত টার্মিনাল সুযোগের কারণে এলএনজি আমদানি বাড়ানো সম্ভব নয়; তাই কয়লা ও ফার্নেস তেলসহ প্রাথমিক জ্বালানি আমদানি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কম জরুরি কাজে বিদ্যুৎ ব্যবহার সীমিত করতে হবে। কলকারখানা, সেচ ও কোল্ড স্টোরেজকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। এসি লোড ও ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জিং নিয়ন্ত্রণ করা বাধ্যতামূলক। তৃতীয়ত, পরিবহন ও শিল্পকারখানায় জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। চতুর্থত, বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে সঞ্চালন, বিতরণ ও ব্যবহারের প্রতিটি ধাপে অপচয় রোধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
জ্বালানি ব্যবস্থাপনার মূল ভিত্তি হতে হবে কৃষি, শিক্ষা, শক্তি এবং পরিবহন ও লজিস্টিকস খাত। এই লক্ষ্যে দুর্নীতি, অদক্ষতা ও নীতিগত পরিকল্পনার ঘাটতি প্রধান বাধা। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিকে ঝুঁকি হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবে এর চেয়ে বড় সমস্যা দুর্নীতি। তিনি অভিযোগ করেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতে একটি গোষ্ঠী অকল্পনীয়ভাবে সম্পদশালী হয়েছে। এসব চুক্তি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর জন্য শীতাতপনিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভরতা কমানো জরুরি। গ্রীষ্মকালে বিদ্যুতের চাহিদার প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াট এসির ওপর নির্ভরশীল। ভবনের স্থাপত্য ও নির্মাণসামগ্রী শীতলীকরণ চাহিদা নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। ঢাকার প্রাকৃতিক বায়ুপ্রবাহ উত্তর-দক্ষিণ বরাবর হওয়ায় শহরে বায়ু প্রবাহ করিডর তৈরি করলে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। অন্যদিকে, ব্যাটারিচালিত রিকশা প্রয়োজনীয় হলেও অত্যন্ত অদক্ষ। সাধারণত রাত্রে এগুলোর ব্যাটারি চার্জ হয়, যা প্রায় ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নেয়। জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন, বিতরণ, চার্জিং ও ব্যবহার পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ার দক্ষতা ১৫ শতাংশের কম বলে তিনি উল্লেখ করেন।
শেষে তিনি জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় আমলাতন্ত্র নির্ভরতা ত্যাগ করে সংশ্লিষ্ট খাতের অভিজ্ঞ পেশাজীবী ও বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করে টাস্কফোর্স গঠন এবং পর্যায়ভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর জোর দেন।
*আব্দুল হাসিব চৌধুরী: সাবেক সহ-উপাচার্য, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)*