কৃষিজমিতে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে শুরুতে আপত্তি জানায় কৃষি বিভাগ। পরে ‘চাপের মুখে’ অনাপত্তিপত্র দেওয়া হয়।
ময়মনসিংহের ভালুকায় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি নির্ধারণ নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। উপজেলার হবিরবাড়ী ইউনিয়নে ৪৫ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য যে জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা ‘কৃষিজমি’ উল্লেখ করে প্রথমে আপত্তি জানিয়েছিল কৃষি বিভাগ। পরে ‘চাপের মুখে’ অনাপত্তিপত্র দিতে কৃষি বিভাগ বাধ্য হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
কাগজে-কলমে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্যোক্তা ভাওয়াল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। এই কোম্পানির চেয়ারম্যান তাসলিমা আক্তার। তিনি ময়মনসিংহ-১১ আসনে (ভালুকা) বিএনপির সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী। স্থানীয় মানুষের কাছে ভাওয়াল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন সংসদ সদস্যের (এমপি) মালিকানাধীন কোম্পানি হিসেবে পরিচিত।
সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের দরপত্রে অংশ নিতে হলে নির্ধারিত জমির বিপরীতে কৃষি বিভাগের অনাপত্তি প্রয়োজন। ভালুকা উপজেলার নন্দীপাড়া ও ঝালপাজা মৌজার ১৭৩ দশমিক ১৩ একর জমিতে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য অনাপত্তিপত্র দিতে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছে আবেদন করেন তাসলিমা আক্তার।
ভালুকায় একই ধরনের প্রকল্পের জন্য ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় আরও তিনটি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছিল। এগুলো হলো গ্যাটকো এনার্জি লিমিটেড, টিএস ট্রান্সফরমার লিমিটেড ও মীর সিরামিক লিমিটেড। তবে ওই তিনটি আবেদন যথাযথ না হওয়ায় গত ২ জুলাই স্থানীয় এমপির স্ত্রীর প্রতিষ্ঠানের আবেদন বিবেচনায় নেওয়া হয়।
পরে ১৬ জুলাই ভালুকা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জমির প্রকৃতি যাচাইয়ের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে আহ্বায়ক করে গঠিত এই কমিটিতে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা, বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের ভালুকা শাখার সদস্যসচিব এবং হবিরবাড়ী ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তাকে সদস্য করা হয়। প্রস্তাবিত জমি কৃষিজমি কি না এবং কৃষিজমি হলে তা এক ফসলি, নাকি দুই ফসলি—এসব যাচাই করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়।
কৃষি বিভাগ সূত্র বলছে, নন্দীপাড়া ও ঝালপাজা মৌজার ওই সব জমিতে স্থানীয় কৃষকেরা বহু বছর ধরে দুই থেকে তিন ফসল ফলিয়ে আসছেন। মানুষের বসতবাড়িও পড়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য নির্ধারিত জমিতে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে ১০টি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে গত এপ্রিলে দরপত্র আহ্বান করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), যার একটি হবে ভালুকায়। এর উৎপাদনক্ষমতা ৪৫ মেগাওয়াট। স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদক (আইপিপি) পদ্ধতিতে ২০২৯ সালের জানুয়ারির মধ্যে এসব কেন্দ্র উৎপাদনে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। দরপত্র মূল্যায়ন শেষে চলতি বছরের ডিসেম্বরে সর্বনিম্ন যোগ্য দরদাতাদের কার্যাদেশ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
আইপিপি পদ্ধতিতে কোনো স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে এবং চুক্তির ভিত্তিতে তা সরকারের কাছে বিক্রি করে থাকে।
আমি কখনো কোনো কৃষি কর্মকর্তা বা অন্য কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে এ বিষয়ে ফোনে বা সরাসরি কথা বলিনি। আমার ব্যক্তিগত সহকারী বা অন্য কাউকে দিয়েও চাপ দেওয়ার প্রশ্ন আসে না।
কৃষিজমিতে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে ভাওয়াল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের চেয়ারম্যান তাসলিমা আক্তারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার স্বামীর সঙ্গে কথা বলুন।’
তাসলিমা আক্তারের স্বামী সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে গতকাল মঙ্গলবার মুঠোফোনে কথা বলেছে মুক্তকণ্ঠ। কৃষি বিভাগের তথ্য সঠিক নয় দাবি করে তিনি বলেন, উপজেলা প্রশাসনের ছয় সদস্যের কমিটি সরেজমিন পরিদর্শনের পাশাপাশি ডিজিটাল ম্যাপ ও গুগল ম্যাপ ব্যবহার করে জমি পরিমাপ করছে। ওই ১৭৩ একর জমির সর্বোচ্চ ১৮ শতাংশ এক ফসলি জমি বলে দাবি করেন তিনি।
কৃষিজমিকে অকৃষি দেখিয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টির অভিযোগও অস্বীকার করেন ফখর উদ্দিন। তাঁর বক্তব্য, ‘আমি কখনো কোনো কৃষি কর্মকর্তা বা অন্য কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে এ বিষয়ে ফোনে বা সরাসরি কথা বলিনি। আমার ব্যক্তিগত সহকারী বা অন্য কাউকে দিয়েও চাপ দেওয়ার প্রশ্ন আসে না। অভিযোগটি সত্য হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছ থেকেই তার প্রমাণ নেওয়া উচিত।’
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ভালুকার বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান দখলের চেষ্টা ও চাঁদাবাজিতে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছিল ফখর উদ্দিন আহমেদ বিরুদ্ধে। তখন বিএনপি থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। ওই সময় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেন কেন্দ্রীয় বিএনপির একজন যুগ্ম মহাসচিব। তবে বছরখানেকের মধ্যে ওই মামলা থেকে অব্যাহতি পান তিনি। পরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে ময়মনসিংহ-১১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এখন তিনি ভালুকা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক।
২৩ জুলাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে জমা দেওয়া যাচাই কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, নন্দীপাড়া ও ঝালপাজা মৌজার ১৬৭ দশমিক ৮৪ একর জমির মধ্যে ৬৩ একর এক ফসলি। এসব জমিতে রবি মৌসুমে বোরো ধান চাষ হয়। সেখানে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা হলে বোরো ধানের উৎপাদন হ্রাস পাবে।
তবে এর এক মাস পেরোনোর আগেই ১৯ আগস্ট ভাওয়াল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেডকে অনাপত্তিপত্র দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, প্রস্তাবিত ১৭৩ দশমিক ১৩ একর জমির মধ্যে ১৪১ দশমিক ৯৭ একর অকৃষি জমি এবং ৩১ দশমিক ১৬ একর এক ফসলি জমি। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি হলে তা কৃষিজমিতে উল্লেখযোগ্য কোনো ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে না।
সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাবিত জমির মধ্যে এক ফসলি, কোথাও দুই ফসলি জমি রয়েছে। প্রায় ১৪০ একরের মতো চাষাবাদযোগ্য কৃষিজমি সেখানে।
এ প্রসঙ্গে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নুসরাত জামান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, পুরো জমিকে অকৃষি দেখিয়ে প্রত্যয়ন দেওয়ার জন্য তাঁকে চাপ দেওয়া হচ্ছিল। এ বিষয়ে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন। উন্নয়নমূলক কাজ এবং বিদ্যুতের সমস্যা আছে—এ কারণে অনাপত্তি দিয়ে দিতে বলা হচ্ছিল। সংসদ সদস্যের পক্ষ, প্রশাসন ও নিজের দপ্তরের কর্মকর্তাদের চাপের কারণে অনাপত্তি দিতে হয়।
কৃষি কর্মকর্তা নুসরাত জামান বলেন, জমির প্রকৃতি সরেজমিনে দেখতে গেলে মানুষ নিজেদের জমি ছাড়বে না জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সেখানে মানুষের বসতবাড়ি ও কৃষিজমি রয়েছে। পরে কিছু দাগ পরিবর্তন করে প্রস্তাব দেওয়া হলেও সেটি মাঠপর্যায়ে আর যাচাই করার সুযোগ পাননি। শুধু কাগজপত্র বিশ্লেষণ করে অনাপত্তিপত্র দেওয়া হয়েছে।
‘ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা আইন’ অনুযায়ী, ফসলি জমি নষ্ট করা এবং ফসলি জমিতে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই আইনে দুই বা ততোধিক ফসলি জমিতে অকৃষি কাজ নিষিদ্ধ এবং বিশেষ কৃষি অঞ্চলের ক্ষতি করলে কারাদণ্ড ও আর্থিক জরিমানার বিধান রয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তা অনাপত্তিপত্র দিতে না চাইলেও স্থানীয় ও ‘ওপর মহলের’ চাপে অনাপত্তি দিতে হয়েছে বলে স্বীকার করেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ময়মনসিংহের উপপরিচালক মো. এনামুল হকও। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাবিত জমির মধ্যে এক ফসলি, কোথাও দুই ফসলি জমি রয়েছে। প্রায় ১৪০ একরের মতো চাষাবাদযোগ্য কৃষিজমি সেখানে। বর্ষা মৌসুমে পানি থাকায় কয়েক মাস চাষাবাদ করা সম্ভব না হলেও পানি শুকিয়ে গেলে বোরোসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করা হয়। এ ছাড়া ওই এলাকায় গাছপালা রয়েছে এবং আশপাশের কৃষকেরা মাছও চাষ করেন।
ঝালপাজা ও নন্দীপাড়া মৌজার কৃষিজমিতে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন বন্ধের দাবি জানিয়ে গত ৯ আগস্ট ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করেন স্থানীয় কৃষকেরা। সেখানে বলা হয়, সরকারি নির্দেশ অমান্য করে কৃষকদের বাধ্য ও ক্ষতিগ্রস্ত করে এই কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
নন্দীপাড়া ও ঝালপাজায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প করার জন্য জমি নির্বাচনের বিষয়টি স্থানীয় মানুষ জানতেন না। উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে জমির প্রকৃতি যাচাই করতে গেলে বিষয়টি জানাজানি হয়।
ভালুকা উপজেলা সদর থেকে হবিরবাড়ী ইউনিয়নের (ইউপি) দূরত্ব প্রায় ১৩ কিলোমিটার। ইউপি কার্যালয় থেকে ঝালপাজা গ্রামের দূরত্ব প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার আর নন্দীপাড়া গ্রামের দূরত্ব প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। ১৭ আগস্ট দুপুরে এই প্রতিবেদক প্রথমে যান পশ্চিম ঝালপাজায়। সেখানে স্থানীয় ১০ জন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলেন তিনি। ওই ব্যক্তিরা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তাঁরা কোনোভাবেই ফসলি জমি ও ভিটে ছাড়বেন না।
ঝালপাজার বাসিন্দা সত্তরোর্ধ্ব সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা এই জমিনে ফসল করি। আমন ও বোরো ধান হয়, শাকসবজি করি। আমরার অনুরোধ, এইনো যাতে সোলার না হয়।’
গ্রামের আরেক বাসিন্দা রিটন মণ্ডল বলেন, ‘আমরা কৃষক মানুষ। জমি বিক্রি করে দিলে আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াব। জোর করে কৃষকদের কাছ থেকে সম্পদ নিয়ে যেতে চায়।’
গত ১০ বছরে ময়মনসিংহে ৪ হাজার ৫৭২ হেক্টর আবাদি জমি কমেছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ময়মনসিংহ জেলায় মোট আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৩১ হাজার ৮২৩ হেক্টর। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ২৭ হাজার ২৫১ হেক্টরে।
পরে নন্দীপাড়া গ্রামে যান এই প্রতিবেদক। স্থানীয় বাসিন্দা বিল্লাল খানের বসতি জমির পাশাপাশি কৃষিজমিও পড়েছে প্রস্তাবিত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য নির্ধারিত জমিতে। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এলাকার সব জমিতে চাষ হয়। মানুষের বসতবাড়ি আছে। সবার সীমিত জমি। বসতি এলাকায় কেন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে, সেই প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘যদি পতিত থাকত একটা কথা আছিল। এখানে তো বেচাকেনার মতো জমিন নাই। আমার জমি আমি দেব না।’
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে মুক্তকণ্ঠের সাংবাদিক কথা বলছেন (১৭ আগস্ট দুপুরে), এ খবর দ্রুতই পৌঁছে যায় এমপির অনুসারীদের কাছে। কিছুক্ষণ পর দুটি মোটরসাইকেলে করে চারজন যুবক এসে এই প্রতিবেদককে খুঁজে বের করেন। তখন মুক্তকণ্ঠের প্রতিনিধি ছিলেন ঝালপাড়া গ্রামের মধ্যপাড়ায়। এই গ্রামে আসার কারণ কী, তা এই প্রতিবেদকের কাছে জানতে চান মোটরসাইকেলে আসা যুবকদের একজন। সবকিছু শোনার পর ওই যুবকেরা এই প্রতিবেদককে তাঁদের সঙ্গে স্থানীয় এক নেতার কার্যালয়ে যেতে বলেন। ওই কার্যালয় ঝালপাজা গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে, যা স্থানীয়ভাবে ‘ম্যাজিক মোড়’ নামে পরিচিত।
কার্যালয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর সেখানে আসেন হবিরবাড়ী ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও এমপির অনুসারী হিসেবে পরিচিত আমিনুল ইসলাম খান ওরফে ভাসানসহ কয়েকজন নেতা–কর্মী। গ্রামের কোন কোন লোকের সঙ্গে কথা হয়েছে, তা বলার জন্য চাপ তৈরি করেন তাঁরা। একপর্যায়ে বলেন, তাঁদের পরিচিত লোকদেরও বক্তব্য নিতে হবে। ওই লোকেরা কোথায়, সেই প্রশ্ন করার পর বলা হয়, তাঁদের কাছে নিয়ে যাবেন মো. মিঠু ও জাকির হোসেন নামের দুই ব্যক্তি। এই দুজন আমিনুল ইসলামের সঙ্গে ওই কার্যালয়ে ছিলেন।
মিঠুর সঙ্গে এই প্রতিবেদক যান ঝালপাজা গ্রামের মধ্যপাড়ায়। সেখানে স্থানীয় বাসিন্দা আবু বক্কর সিদ্দিক বাড়ির পাশের ২১ শতক জমিতে ধানের চারা লাগিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বাপ-চাচারা এই খেত করে গেছে, এখন আমরা করছি। এই জমিতে দুবার ধান করা হয়।’
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য জমি ছাড়বেন কি না, এমন প্রশ্নে আবু বক্কর সিদ্দিক ‘না’ বলেন। এ সময় এমপির অনুসারী মিঠু বলেন, ‘লিগ্যাল দাম পাইলে দিতা না?’ কৃষকের উত্তর, ‘আমরা জমি বেচতাম না, এটাই বড় বিষয়।’
পরে স্থানীয় বাসিন্দা আবদুস ছাত্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘এখানে যখন সোলার প্ল্যান্টের (সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র) কথা হয় তখন প্রথমে এমপি সাব আসছে। এমপি সাব কন্ট্রাক্ট (সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিক) নিছে কি না জানি না। আমরার সঙ্গে পরামর্শ করলে আমরা জানাইছি, এমন যদি হয় তাহলে সহযোগিতা করব।’
আবদুস ছাত্তার বলেন, ‘আমাদের গ্রামটা অবহেলিত। এলাকায় একটি ফ্যাক্টরি আছে, এটি হওয়াতে আমরা ডেবলাপ (উন্নত) হইছি। আরও দুই-একটা ফ্যাক্টরি হলে আমরা আরেকটু উপরে উঠব, এটাই আমাদের আশা।’
বড় প্রকল্প হওয়ায় ভবিষ্যতে জমি নিয়ে জটিলতা এড়াতে উপজেলা প্রশাসন সতর্কতার সঙ্গে বিষয়টি যাচাই করছে বলে দাবি করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফিরোজ হোসেন। ১৭ আগস্ট তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কমিটির সদস্যরা সরেজমিন গিয়ে প্রতিবেদন দিয়েছেন। সরেজমিনে যেসব জমিতে এক ফসল হয় বা মাছ চাষ করা হয়, সেসব জমি বাদ দিতে আবেদনকারীকে বলা হয়েছে। পরে আবেদনকারীরা দাগ নম্বর উল্লেখ করে সংশোধিত শিডিউল জমা দিয়েছেন। এতে প্রায় ২০ একর এক ফসলি ও মাছ চাষের জমি বাদ দেওয়া হয়েছে।
ইউএনও বলেন, প্রস্তাবিত এলাকায় উঁচু-নিচু ও কিছু টিলার মতো জমি রয়েছে। এসব জায়গায় ধান চাষের সুযোগ নেই। সেখানে বাঁশঝাড়, আম, কাঁঠাল, ইউক্যালিপটাস, আকাশমণি, মেহগনিসহ বিভিন্ন গাছ রয়েছে। বাড়ির আশপাশে কোথাও কোথাও সামান্য সবজি চাষ হয়। দরপত্রে নির্বাচিত হলে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান জমি কেনা, অংশীদারত্ব বা অন্য কোনো আইনসম্মত ব্যবস্থায় জমির মালিকদের সঙ্গে সমঝোতা করতে পারে। কৃষিজমির অনাপত্তির জন্য কোনো চাপ নেই।
তবে ভালুকা উপজেলার উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা মো. মোয়াজ্জেম হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রস্তাবিত জমিতে বাড়িঘর, গাছপালা, ফসলি জমি আছে। এর মধ্যে প্রায় ১৩১ একর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ জেলা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে ময়মনসিংহে ৪ হাজার ৫৭২ হেক্টর আবাদি জমি কমেছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ময়মনসিংহ জেলায় মোট আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৩১ হাজার ৮২৩ হেক্টর। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ২৭ হাজার ২৫১ হেক্টরে।
কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, কৃষিজমি কমার তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ভালুকা। শিল্পায়নের ফলে সেখানে দিন দিন কমছে কৃষিজমি। এ ছাড়া ত্রিশাল, ময়মনসিংহ সদর, মুক্তাগাছা ও তারাকান্দা উপজেলায়ও কৃষিজমি কমছে।
ময়মনসিংহ জেলা শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ভালুকা উপজেলায় শিল্পকারখানার সংখ্যা ১৯৮টি।
অন্যদিকে ভালুকা উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় বর্তমানে কৃষিজমি আছে ২৮ হাজার ৩৩৫ হেক্টর। ছয় বছরের ব্যবধানে কৃষিজমি কমেছে ১ হাজার ৪৩ হেক্টর। ২০২০ সালে কৃষিজমিকে অকৃষি জমিতে রূপান্তরের জমির পরিমাণ ছিল ২৭৮ দশমিক ৬৯ হেক্টর। ২০২১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭৭ হেক্টরে। এরপর ২০২২ সালে ৬১০ হেক্টর, ২০২৩ সালে ৭০৩ হেক্টর, ২০২৪ সালে ৭৬১ হেক্টর, ২০২৫ সালে ৯১৩ হেক্টর এবং ২০২৬ সালে ১ হাজার ৪৩ হেক্টরে পৌঁছেছে।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ময়মনসিংহের উপপরিচালক মো. এনামুল হক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, কোনো শিল্পকারখানা স্থাপনের আগে উদ্যোক্তারা কৃষি অফিস থেকে প্রত্যয়ন চান। জমি কৃষি হলে শিল্পকারখানা স্থাপনের জন্য প্রত্যয়ন দেওয়ার সুযোগ নেই। তারপরও বিভিন্ন সময় স্থানীয়ভাবে বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার পক্ষ থেকে চাপ আসার কারণে বাধ্য হয়ে অনাপত্তিপত্র দিতে হয়।