দেশের ওটিটি ও ডিজিটাল মিডিয়া খাতের ভিডিও স্ট্রিমিং ও অবকাঠামোগত চাহিদা মেটাতে গতিপথ নামক প্রতিষ্ঠানটি এখন দেশি প্রযুক্তিতে বিশ্বমানের সমাধান দিচ্ছে। ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর মতো বিশাল ট্রাফিক সামলাতে এটি সফলভাবে মাল্টি-সিডিএন সমাধান সরবরাহ করেছে। এছাড়া মাইক্রো-ড্রামা ফরম্যাট উদ্ভাবন ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রসারের মাধ্যমে গতিপথ বাংলাদেশকে প্রযুক্তি রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে চিহ্নিত করতে চায়।
কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার চনুয়া গ্রামে জন্ম নেয়ামত উল্যাহর। শরাফত উল্যাহ ও মরিয়ম বেগম দম্পতির দুই ভাই ও এক বোন নিয়ে গড়া এই পরিবারে শিক্ষার প্রতি ছিল তীব্র আগ্রহ। চাঁদপুরের শাহরাস্তির বেরনাইয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে ২০১১ সালে এসএসসি এবং ২০১৩ সালে কুমিল্লা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করার পর রাজধানীতে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলী (সিএসই) বিভাগে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির চেয়ে বাস্তব প্রয়োগ ও উদ্ভাবনের নেশা তাঁকে বেশি টানায় তিনি একপর্যায়ে পড়াশোনা ছেড়ে দেন।
২০১৪ সালে ঢাকায় সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসে সাধারণ কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। কাজের ফাঁকে প্রিন্টিং অটোমেশন নিয়ে ভাবা ও ই-ক্যাবের নীতি প্রণয়ন ও পাঠক্রম তৈরিতে যুক্ত হওয়া ছাড়াও পরে কম্পিউটার সোর্স লিমিটেডে চাকরি করেছেন। কিন্তু নিজস্ব কিছু করার স্বপ্ন তাঁকে স্থির থাকতে দেয়নি।
চাকরি ছেড়ে উদ্যোক্তা হওয়ার সময় তাঁর কাছে ছিল মাত্র এক মাসের বেতন ও উৎসব বোনাস জমা মোট ১৬ হাজার টাকা। এই অর্থ দিয়ে টানা ছয় মাস পার করতে হয়েছিল। প্রতিদিনের যাতায়াত খরচ বাঁচাতে মতিঝিলের বাসা থেকে ধানমন্ডির ই-ক্যাব কার্যালয় বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে হেঁটে যাওয়া-আসা করতেন। কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্য দিয়ে ২০১৫ সালের নভেম্বরে কয়েকজনকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন সফটওয়্যার তৈরির প্রতিষ্ঠান ‘নুসরাটেক’। পাশাপাশি সহপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গড়ে তোলেন ‘সার্চ ইংলিশ’, যা পরবর্তীতে ফেসবুক কর্তৃক বৈশ্বিক স্বীকৃতি লাভ করে।
২০১৮-১৯ সালে একটি লাইভ কুইজ স্ট্রিমিং অ্যাপ তৈরির সময় বিজ্ঞাপন মডেল ব্যর্থ হলে প্রকল্পটি বন্ধ করতে হয়। কিন্তু এই ব্যর্থতা থেকে তিনি কনটেন্ট ডেলিভারি নেটওয়ার্ক (সিডিএন) ও ভিডিও ল্যাটেন্সির জটিল প্রযুক্তি শিখে নেন। সেই অভিজ্ঞতার ছাই থেকেই জন্ম নেয় আজকের ‘গতিপথ’।
নেয়ামত উল্যাহর মূল দর্শন হলো—অহেতুক উদ্ভাবনের চেয়ে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সঠিক ‘লোকালাইজেশন’ গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি ক্লাউড প্ল্যাটফর্মে বৈদেশিক মুদ্রা চলে যাওয়ার বিকল্প হিসেবে তিনি দেশেই বিশ্বমানের ভিডিও অবকাঠামো গড়ে তুলেছেন। চরকি, দীপ্ত প্লে, বায়োস্কোপ+, আকাশ গো, দোয়েল, ঘুড্ডি টিভি, উৎসব, টেন মিনিট স্কুল ও টফির মতো শীর্ষ মাধ্যমগুলোর দ্রুতগতির ভিডিও ডেলিভারি, অ্যাপ তৈরি ও ক্লাউড অবকাঠামোর পেছনে দিনরাত কাজ করছে তাঁর নেতৃত্বাধীন প্রায় ২৭ জন তরুণ প্রকৌশলীর দল।
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ আসরে বিশ্বব্যাপী বিপুল দর্শকের লাইভ স্ট্রিম চাপ সামলানোর ক্ষেত্রে ‘গতিপথ’ বায়োস্কোপকে একটি সর্বাধুনিক ‘মাল্টি-সিডিএন’ সমাধান সরবরাহ করে। একাধিক সিডিএন সরবরাহকারীর মধ্যে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ট্রাফিক বণ্টন করে কোটি দর্শকের জন্য নিরবচ্ছিন্ন ও বাফারবিহীন ম্যাচ উপভোগের অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করা হয়, যা দেশের ভিডিও অবকাঠামোর সক্ষমতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
কেবল লাইভ স্ট্রিমিং নয়, কনটেন্ট ফরম্যাটের উদ্ভাবনেও গতিপথ রয়েছে অগ্রণী। দীপ্ত প্লে-এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ওটিটি ইন্ডাস্ট্রিতে প্রথমবারের মতো ‘মাইক্রো-ড্রামা’ ফরম্যাট চালু করা হয়। এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গতিপথ এখন একটি শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ অংশীদারত্বে বিশ্ববাজারের জন্য পূর্ণাঙ্গ মাইক্রো-ড্রামা প্ল্যাটফর্ম নির্মাণে কাজ করছে। দেশের সীমানা পেরিয়ে মালয়েশিয়ার সরকারি টেলিকম প্রতিষ্ঠান ‘টেলিকম মালয়েশিয়া’র সঙ্গে সফলভাবে কাজ করছে এবং দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে নেয়ামত উল্যাহ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘দেশের মেধাবী তরুণ প্রকৌশলীদের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি, আর্থিক প্রযুক্তি (ফিনটেক) ও স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি (হেলথটেক) খাতে বিশ্বমানের নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম তৈরি করাই আমাদের লক্ষ্য। ওটিটি ও স্ট্রিমিং অবকাঠামোতে বিদেশি কোম্পানির নির্ভরতা কমিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার যে দৃষ্টান্ত গতিপথ তৈরি করেছে, ভবিষ্যতে সেই একই মডেল প্রয়োগ করা হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা অ্যানালিটিকস এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা খাতে।’
নেয়ামত উল্যাহর দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলাদেশের প্রকৌশলীদের মেধা আন্তর্জাতিক মানের; প্রয়োজন কেবল সঠিক প্ল্যাটফর্ম, বিনিয়োগ ও দূরদর্শী নেতৃত্ব। গতিপথ সেই সেতুবন্ধন তৈরি করতে চায়, যাতে দেশি মেধার উদ্ভাবন বিশ্ববাজারে রপ্তানি হয় এবং বাংলাদেশ শুধু তথ্যপ্রযুক্তি সেবা প্রদানকারী না হয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘প্রযুক্তি রপ্তানিকারক দেশ’ হিসেবে নিজের স্থায়ী পরিচয় প্রতিষ্ঠা করে.