চট্টগ্রাম নগরের উত্তর ও দক্ষিণ অংশের মূল সংযোগস্থল দেওয়ানহাট সেতুটি এখন জরাজীর্ণ ও নিরাপত্তাহীন। প্রায় অর্ধশতাব্দী পুরোনো এই সেতুটি ভেঙে নতুন করে নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছিল চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। তবে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও দেওয়ানহাট ওভারপাসের কারণে নতুন সেতু নির্মাণের পর্যাপ্ত স্থান পাওয়া যাচ্ছে না।

১৯৭৮ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে তৎকালীন সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ ঢাকা-চট্টগ্রাম রেললাইনের ওপর এই সেতুটি নির্মাণ করে। বর্তমানে এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের হাতে। প্রতিদিন অন্তত ৭৫ হাজার যানবাহন ৬০ ফুট প্রশস্ত এই সেতু ব্যবহার করে নগরবাসী। নির্মাণকালে রেললাইন থেকে এর উচ্চতা ছিল ছয় মিটার। দীর্ঘদিন ব্যবহার ও ক্ষয়ক্ষতির কারণে বর্তমানে উচ্চতা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ মিটারে।

রেলওয়ের বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী, রেললাইন থেকে নতুন সেতুর উচ্চতা হতে হবে অন্তত সাড়ে আট মিটার। প্রায় তিন মিটার উচ্চতা বাড়াতে হলে সেতুর দৈর্ঘ্যও তিন গুণের বেশি বাড়াতে হয়। বর্তমান দৈর্ঘ্য ৫০ মিটার হলে নতুন সেতুর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬০ মিটার করতে হবে। কিন্তু সেতুর উত্তর পাশে দেওয়ানহাট ওভারপাস এবং তার ওপর দিয়ে চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বিদ্যমান থাকায় প্রয়োজনীয় জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "সেতুর উত্তর পাশে রয়েছে দেওয়ানহাট ওভারপাস। এর ওপর দিয়ে চলে গেছে চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। ফলে নতুন সেতুর জন্য প্রয়োজনীয় দৈর্ঘ্য বাড়ানোর মতো জায়গা নেই। এ অবস্থায় প্রচলিত নকশায় নতুন সেতু নির্মাণ কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে।"

সিটি কর্পোরেশনের সাম্প্রতিক মাঠপর্যায়ের জরিপে সেতুতে তিন ধরনের ক্ষয়ক্ষতি শনাক্ত হয়েছে। কাঠামোগত ক্ষয় হিসেবে উপরিভাগে ফাটল, কংক্রিট খসে পড়া, রডের ক্ষয় এবং ডেকের নিচে রড বেরিয়ে আসার মতো সমস্যা দেখা দিয়েছে। অতিরিক্ত চাপজনিত ক্ষয়ে ভারী মালবাহী ট্রাক ও যানবাহনের চলাচলে সেতু কিছুটা দেবে গেছে। আর যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিয়ারিং নষ্ট হওয়া ও এক্সপ্যানশন জয়েন্ট ময়লায় আটকে যাওয়ায় মূল কাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান ঝুঁকিপূর্ণ সেতু ভেঙে নতুন করে নির্মাণের জন্য তিনটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে। প্রথমটি হলো বর্তমান স্থানেই নতুন সেতু নির্মাণ, তবে স্থান সংকটের কারণে রেলওয়ের উচ্চতা মান মেনে চললে সেতুটি অত্যন্ত খাড়া হয়ে যাবে, যা ভারী ও ছোট যানবাহন উভয়ের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। দ্বিতীয় বিকল্পে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে নতুন সেতু যুক্ত করার কথা বলা হলেও ব্যাপক ভূমি অধিগ্রহণ প্রয়োজন। তৃতীয় বিকল্পে লুপ নির্মাণের প্রস্তাব থাকলেও মূল সেতুর দৈর্ঘ্য ৪৪০ মিটার এবং র‍্যাম্পের দৈর্ঘ্য ৫০০ মিটার হবে। এসব বিকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব না হলে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান সেতু শক্তিশালীকরণের (রেট্রোফিটিং) পরামর্শ দিয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে এতে সেতুর ভারবহনক্ষমতা প্রায় ৪৫ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব এবং আয়ুষ্কাল আরও ২৫ থেকে ৩০ বছর বৃদ্ধি পাবে।

আনিসুর রহমান আরও বলেন, "এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্পের সঙ্গে যদি দেওয়ানহাট সেতুটি যুক্ত করা হতো, তাহলে এই জটিলতা তৈরি হতো না। এখন সেতু নির্মাণের জায়গা না থাকায় রেট্রোফিটিংয়ের (শক্তিশালীকরণ) ওপর জোর দিচ্ছেন তাঁরা।"

দেওয়ানহাট ওভারপাস চালু হয় ২০১৩ সালে। পরে ওই ওভারপাসের ওপর দিয়ে এবং দেওয়ানহাট সেতুর পাশ দিয়ে শহীদ ওয়াসিম আকরাম উড়ালসড়ক নামের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মিত হয়, যা ২০২৪ সালের আগস্টে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। দুটি প্রকল্পই বাস্তবায়ন করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের লালখান বাজার প্রান্তের নকশা নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়েছিল চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরাম ও চট্টগ্রাম ঐতিহ্য রক্ষা পরিষদ। তাদের প্রস্তাব ছিল, এক্সপ্রেসওয়েটি টাইগারপাসে না এনে দেওয়ানহাট ওভারপাসের দক্ষিণ পাশে শেখ মুজিব সড়কের প্রশস্ত অংশে শেষ করা হোক। এ বিষয়ে একাধিকবার সিডিএকে চিঠি দেওয়া হলেও নকশায় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।

পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের কোষাধ্যক্ষ প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "অপরিকল্পিত উন্নয়ন যে একটি নগরের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নষ্ট করে, তার প্রকৃত উদাহরণ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও দেওয়ানহাট ওভারপাস। দেওয়ানহাট সেতুর নাজুক অবস্থা এবং এটির পুনর্নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো আগে থেকেই জানত। সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে অনেক আগেই। নতুন সেতু জরুরি। এখন উচ্চতা মেনে নতুন করে সেতুটি নির্মাণের জায়গা নেই। খণ্ডিত পরিকল্পনার মাধ্যমে এক্সপ্রেসওয়ে ও ওভারপাস প্রকল্প বাস্তবায়ন না করতে সিডিএকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তা আমলে না নিয়ে গায়ের জোরে কাজ করেছে সিডিএ। এখন এর খেসারত দিতে হচ্ছে।"

নগর-পরিকল্পনাবিদ ও যোগাযোগবিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব ও ভবিষ্যতের প্রয়োজন বিবেচনা না করায় বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।