নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা মডেল থানা হাজতে আটক দশ আসামির হাতে মুঠোফোন পৌঁছে দেওয়ার ঘটনায় দায়িত্বরত দুই পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। মুক্তকণ্ঠে এই বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সোমবার (৩১ আগস্ট) উপপরিদর্শক (এসআই) মনিরুল ইসলাম ও কনস্টেবল মো. জাহাঙ্গীর আলমকে ডিউটি থেকে সরিয়ে পুলিশ লাইনে পাঠানো হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী।
থানা হাজতে আটকদের হাতে ফোন পৌঁছানো এবং সেগুলো ব্যবহার করে নিষিদ্ধ সংগঠনের পক্ষে স্লোগান দিয়ে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার পর প্রশ্ন উঠেছিল পুলিশের দায়িত্ব নিয়ে। ব্যাপক সমালোচনার মুখে তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
সম্প্রতি ‘আজমিরী ওসমান’ নামক একটি ফেসবুক পেজে ফতুল্লা থানা হাজতে থাকা কয়েকজন তরুণের ভিডিও ভাইরাল হয়। ভিডিওতে এক তরুণকে বলতে শোনা যায়, ‘আজমেরী ভাইয়ের ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।’ এরপর অন্য তরুণরাও একই স্লোগান দিতে দেখা যায়। অপর একটি ভিডিওতে এক তরুণ জানায়, আজমেরী ওসমানের দেওয়া কর্মসূচিতে অংশ নিতে না পারায় তারা কারাবরণ করেছেন।
পুলিশ সূত্র জানায়, গত শনিবার (২৯ আগস্ট) রাতে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ মহাসড়কের সাইনবোর্ড এলাকায় গ্র্যান্ড চাঁদনী রেস্টুরেন্টের বিপরীতে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের ব্যানারে মিছিলের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় ১০ জনকে আটক করা হয়। পরে তাদের ফতুল্লা মডেল থানা হাজতে পাঠানো হয়। আটকরা হলেন—ফেরদৌস (১৮), পলক (১৭), আবরার আহম্মেদ (১৮), ইয়াসিন (১৮), রাব্বি (২০), শিমুল (২০), লিমন (১৭), নয়ন (১৮), আবু বকর (১৬) ও তানভীর (১৫)। তাদের বাড়ি নারায়ণগঞ্জ শহরের পাইকপাড়া ও ফতুল্লার পঞ্চবটি বিসিক এলাকায়।
ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুব আলম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “নিষিদ্ধ সংগঠনের পক্ষে মিছিলের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় ওই ১০ জনকে আটক করা হয়। পরে তাদের থানা হাজতে রাখা হয়েছিল। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে তিনি বলেন, প্রাথমিক রিপোর্টের ভিত্তিতে এসআই মনিরুল ইসলাম ও কনস্টেবল জাহাঙ্গীরকে ক্লোজ করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্তে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম)-এর নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে প্রকৃত ঘটনা ও দায় কার, তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ভিডিওটি হাজতখানায় ধারণ করা হয়েছে কি না—এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি বলেন, “বিষয়টি তদন্তাধীন। তদন্ত শেষ হলে প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হবে। তিনি আরও বলেন, পুলিশের নিয়ম অনুযায়ী আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের ফোনে জানানোর কথা। সেই কারণে ডিউটি অফিসার এসআই মনিরুল ইসলাম সরল বিশ্বাসে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য আটক ব্যক্তিদের মুঠোফোন ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছিলেন। পরে তাঁরা ওই ফোন ব্যবহার করে নিষিদ্ধ সংগঠনের পক্ষে স্লোগান দিয়ে ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়।”
নারায়ণগঞ্জ আদালত পুলিশের পরিদর্শক আব্দুস সামাদের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “থানায় আটক ১০ জনকে আজ আদালতে হাজির করা হলেও তাদের শুনানি হয়নি। আইনজীবীরা কয়েকজনের বয়স কম বলে দাবি করায় বয়স যাচাইয়ের জন্য সময় দেওয়া হয়েছে।” তিনি জানান, “১০ জনের মধ্যে ৯ জনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। কয়েকজনের বয়স ১৮ বছরের নিচে দাবি করায় আগামীকাল পরিচয়পত্রসহ তাদের বয়স যাচাই করে একসঙ্গে শুনানি হবে। বর্তমানে তারা কারাগারে রয়েছেন।”
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “থানার ভেতরে আটক ব্যক্তিকে মোবাইল ফোন দেওয়ার ঘটনায় দায়িত্বে থাকা দুই পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।” তিনি বলেন, “পরিবারের সঙ্গে কথা বলার অনুরোধে আটক ব্যক্তিদের মুঠোফোন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সুযোগে তারা ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করেছে। তবে এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের আরও সতর্ক থাকা উচিত ছিল। এটি তাদের দায়িত্ব পালনে একটি ভুল। তদন্তে দায় প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।”
পুলিশের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠার বিষয়ে তিনি বলেন, “কয়েকজন সদস্যের দায়িত্ব পালনে ভুলের কারণে পুরো জেলা পুলিশকে দায়ী করা ঠিক হবে না। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই ওই ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। থানার ভেতরের ঘটনাটি তদন্ত করে প্রকৃত দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
থানা হাজতে আটকদের হাতে ফোন পৌঁছানো ও তা ব্যবহার করে নিষিদ্ধ সংগঠনের পক্ষে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাটি এখন তদন্তের আওতায় রয়েছে। মুক্তকণ্ঠে সংবাদ প্রকাশের পর দুই পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহারের মাধ্যমে পুলিশের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশের অপেক্ষায় সংশ্লিষ্টরা।