নদী-নালা ও জলাশয়বেষ্টিত কুষ্টিয়ায় পানিতে ডুবে মানুষের মৃত্যু ও নিখোঁজের ঘটনা বেড়েছে, তবে জরুরি উদ্ধার কাজে তীব্র ডুবুরি সংকট বাধা সৃষ্টি করেছে। জেলা ফায়ার সার্ভিসে নিজস্ব ডুবুরি দল না থাকায় খুলনা থেকে আসা বিভাগীয় দলের অপেক্ষায় সময় নষ্ট হচ্ছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধারের সুযোগ হারিয়ে নিখোঁজদের জীবিত বা দ্রুত খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা কমছে।
গত এক মাসে জেলায় পানিতে ডুবে অন্তত চারজনের মৃত্যু হয়েছে। সবশেষ ২৯ আগস্ট সন্ধ্যায় মিরপুরে পদ্মা নদীতে গোসল করতে নেমে স্কুলশিক্ষার্থী মো. ইয়াছিন মণ্ডল নিখোঁজ হন। রাতেই উদ্ধার অভিযান শুরু হলেও নিজস্ব ডুবুরি দলের অভাবে পানির গভীরে তল্লাশি সম্ভব হয়নি। পরদিন রোববার (৩০ আগস্ট) দুপুরে বিভাগীয় ডুবুরি দল এসে তল্লাশি চালায়। তবে প্রায় ১৮ ঘণ্টা পার হওয়ার পরও তার কোনো সন্ধান মেলেনি।
এর আগে গত ৬ আগস্ট দৌলতপুরে পদ্মা নদীতে নিখোঁজ হন শিশু নূরিয়া খাতুন। প্রায় ২৮ ঘণ্টা পর ৭ আগস্ট মিরপুরের শিমুলতলা এলাকায় পদ্মা নদী থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করেন নৌ-পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। ১৫ আগস্ট কুষ্টিয়া সদর উপজেলার গড়াই নদীতে নিখোঁজ হন শুভ; পরদিন ১৬ আগস্ট তার মরদেহ উদ্ধার হয়। ২৪ আগস্ট কুমারখালীর গড়াই নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে ডুবে মারা যান জেলে পরিমল মণ্ডল, যার মরদেহ স্থানীয়রা উদ্ধার করে। ২৮ আগস্ট দৌলতপুরে পদ্মা নদীতে ফুটবল খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হন মাদ্রাসাছাত্র মোস্তাকিম। রাতে খুলনা থেকে ডুবুরি দল এসে তল্লাশি চালালেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরদিন ২৯ আগস্ট সকালে ঘটনাস্থলের কিছুটা দূরে তার মরদেহ ভেসে উঠলে স্বজনরা তা তুলে নেন।
স্থানীয় বাসিন্দা শাহরিয়ার ঈমান বলেন, "কুষ্টিয়ার পদ্মা ও গড়াইসহ বিভিন্ন নদীতে প্রায়ই মানুষ নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটে। কিন্তু জেলার ফায়ার সার্ভিসের নিজস্ব ডুবুরি দল না থাকায় জরুরি পানির নিচে উদ্ধার অভিযানে বিভাগীয় দলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।" তিনি আরও বলেন, "কোনো ব্যক্তি সন্ধ্যায় নদীতে তলিয়ে গেলে অনেক ক্ষেত্রে রাতেই পূর্ণাঙ্গ উদ্ধার অভিযান চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ডুবুরি দলের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। রাত পেরিয়ে সকাল হলে নদীর স্রোত, গভীরতা এবং পানির নিচের পলি-বালুর কারণে নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে।"
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, কুষ্টিয়া ইউনিটের ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "কুষ্টিয়া নদী-নালা ও জলাশয়বেষ্টিত একটি জেলা। প্রতিবছরই এখানে পানিতে ডুবে মানুষ নিখোঁজ ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এমন বাস্তবতায় জরুরি উদ্ধার কার্যক্রমের জন্য জেলায় একটি প্রশিক্ষিত ডুবুরি দল থাকা অত্যাবশ্যক।" তিনি বলেন, "বাইরে থেকে ডুবুরি দল আসতে যে সময় লাগে, ততক্ষণে নদীর স্রোতে নিখোঁজ ব্যক্তি অনেক দূরে চলে যেতে পারেন। এমনকি বালির নিচে চাপা পড়ারও আশঙ্কা থাকে। মানুষের মূল্যবান জীবন রক্ষায় কুষ্টিয়াতেই স্থায়ী ডুবুরি দল, প্রয়োজনীয় নৌযান ও আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম নিশ্চিত করা জরুরি।"
কুষ্টিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক ওয়াদুদ হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "আমাদের বিভাগীয় কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। আশা করছি, খুব দ্রুতই এর সমাধান হবে।" তিনি জানান, ডুবুরি দল বিভাগীয়ভাবে সংরক্ষিত হওয়ায় খুলনা থেকে ডুবুরি আসতে তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় লেগে যায়। মাঠপর্যায়ের জেলাগুলোতে নিজস্ব ডুবুরি পদায়ন বিষয়ে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। উদ্ধার কার্যক্রম কার্যকর করতে অংশীজনদের এগিয়ে আসার পাশাপাশি পানিতে ডুবে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়ানোরও আহ্বান জানান তিনি.