আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া সুন্দরবনের তিন মাসের অবরোধ শেষ হওয়ার পর বনটিতে নতুন প্রাণ ফিরে এসেছে। মানুষের আনাগোনা ও বনজ সম্পদ আহরণে সম্পূর্ণ বিরতি দেওয়ায় বাঘ, হরিণ, কুমির, বানর, লাল কাঁকড়া ও বন্য শূকরসহ বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী নির্ভয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একই সঙ্গে বনের নদী ও খালগুলোতে মাছের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, আর সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়া, বাইন ও ছইলাসহ বিভিন্ন উদ্ভিদের ঘনত্বও বৃদ্ধি পেয়েছে।
বনজ সম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও বন্য ও জলজ প্রাণীর প্রজনন সুরক্ষায় চালু করা এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর ছিল বলে দাবি করেছে বন বিভাগ। অবরোধ চলাকালে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের উপস্থিতি খালের পাড়ে ও বনের গভীরে বারবার নজরে আসে। কুমিরের শিকার ধরার দৃশ্য পর্যটকদের মন কেড়েছে। বন সংশ্লিষ্টদের মতে, মানুষের প্রবেশ বন্ধ থাকায় প্রাণীদের চলাচল ও প্রজনন নির্বিঘ্নে হয়েছে, যা মাছের উপস্থিতি ও উদ্ভিদের বৃদ্ধিতে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।
বন অপরাধ রোধে টহল জোরদার করা হয়। জোয়ার-ভাটার সময় অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টা পাহারা দেওয়া হয় এবং স্মার্ট পেট্রোলিং বাড়ানো হয়। পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক শরিফুল ইসলাম বলেন, "অবরোধ বাস্তবায়নে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় টহল জোরদার করা হয়েছিল। এ সময়ে বন অপরাধ কমেছে। সুন্দরবনের বিভিন্ন খালে মাছের উপস্থিতি বেড়েছে। হরিণের পালসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর বিচরণও বেশি দেখা যাচ্ছে। এমনকি খালের পাড়ে বাঘের উপস্থিতিও পাওয়া যাচ্ছে।"
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত মাসে সাত দিন স্মার্ট পেট্রোলিংয়ের ব্যবস্থা থাকলেও এই তিন মাসে তা বাড়িয়ে ২০ দিন করা হয়। এতে বন অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে মনে করছে বিভাগ।
অবরোধ শেষ হওয়ায় উপকূলীয় জেলেরা নৌকা ও জাল মেরামত ও রসদ সংগ্রহসহ সব প্রস্তুতি শেষ করেছেন। দীর্ঘ তিন মাস মাছ ধরা বন্ধ থাকায় এবার পর্যাপ্ত মাছ পাওয়ার আশায় তারা। শরণখোলার জেলে আলাল মোড়ল বলেন, "তিন মাস বনে যেতে পারিনি। নৌকা-জাল মেরামত করে রেখেছি। এতদিন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় এবার বনে গেলে ভালো মাছ পাব—এমন আশা করছি। মাছ ভালো পাওয়া গেলে আমাদের মতো বনের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর কষ্ট কিছুটা কমবে।"
একই সময়ে মৌয়াল জীবন কর্মকার জানান, "তিন মাস বনে যেতে না পারায় আমাদের মতো মৌয়ালদের অনেক কষ্টে সংসার চালাতে হয়েছে। সুন্দরবনই আমাদের জীবিকার বড় ভরসা। নিষেধাজ্ঞা শেষে আবার বনে যেতে পারব, মধু সংগ্রহ করতে পারব—এতে আমরা খুবই আশাবাদী। তবে বন ভালো থাকলেই আমরা ভালো থাকব। তাই নিয়ম মেনে মধু সংগ্রহ করব এবং বনের কোনো ক্ষতি হয় এমন কাজ করব না।"
শরণখোলার মৌয়াল জীবন কর্মকার বলেন, "তিন মাস বনে যেতে না পারায় আমাদের মতো বনজীবী মানুষের সংসারে টানাপোড়েন গেছে। সুন্দরবনই আমাদের জীবিকার প্রধান ভরসা। নিষেধাজ্ঞার কারণে বনে যেতে না পারলেও আমরা চাই সুন্দরবন ভালো থাকুক। এখন নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে, তাই আবার বনে গিয়ে মধু ও অন্যান্য বনজ সম্পদ সংগ্রহ করে জীবিকা চালাতে পারব—এটাই আশা। তবে বন থেকে সম্পদ নিতে গিয়ে যেন বনের ক্ষতি না হয়, সেদিকেও আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।"
পূর্ব সুন্দরবন বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, "সুন্দরবনের স্বাভাবিক পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন নিশ্চিত করতে প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়ে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়। নিষেধাজ্ঞার সময় টহলও বাড়ানো হয়। এবারও অবরোধের সুফল হিসেবে বনে বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ ও খালে মাছের উপস্থিতি বেড়েছে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।"
সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম বন বিভাগে মোট ১৪টি পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে। প্রতিবছর কয়েক লাখ পর্যটক এসব স্থানে ভ্রমণে আসেন। পাশাপাশি নির্ধারিত ফি পরিশোধ করে বছরের বিভিন্ন সময়ে প্রায় অর্ধলাখ বনজীবী মাছ, গোলপাতা ও মধু আহরণ করেন। ২০২১ সাল থেকে বনজ সম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন সুরক্ষায় প্রতিবছর এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়ে আসছে। এবারের অবরোধের পর ফেরা সজীবতা ধরে রাখতে ভবিষ্যতেও এই উদ্যোগ অব্যাহত রাখার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।