টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে ‘ফুড অফিসার্স যমুনা জুট ইন্ডাস্ট্রিজ’-এর ম্যানেজার শাহজাহান ভূঁইয়া চাঁদা দাবিতে মানসিক চাপ ও প্রাণনাশের হুমকির শিকার হয়ে স্ট্রকে মারা গেছেন। এ ঘটনায় ওয়ারেস, শামীম ও লিখন নামে তিনজনের বিরুদ্ধে ভূঞাপুর থানায় চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করা হয়েছে।
জানা যায়, গত ২২ আগস্ট কারখানায় এসে অভিযুক্তরা ম্যানেজারের নিকট ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। অস্বীকার করলে তাকে ধারাবাহিকভাবে মানসিক নির্যাতন ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। এই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে, যেখানে আসামিরা ম্যানেজারের কক্ষে ঢুকে টাকা দাবি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করছেন। স্থানীয় সূত্রের মতে, এরপর থেকেও বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল, যা ম্যানেজারের স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
কারখানার সুপারভাইজার মো. আক্তার হোসেন বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। শ্রমিক রশীদ জানান, কয়েকদিন ধরে ওয়ারেস তার সঙ্গী-সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে ম্যানেজারের কাছে আসতেন। পরে জানতে পারলাম ওয়ারেস ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করছেন। অফিসে এসে চেয়ার ছুড়ে মারাসহ বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হয়েছে। ম্যানেজার এই মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে স্ট্রোক করে মারা যান।
শ্রমিক লিয়াকত আলী বলেন, কয়েকজন লোক গেটের সামনে এসে ম্যানেজারের সাথে কথা বলতে চান। পরে তারা কক্ষে ঢুকে আধা ঘণ্টা ধরে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দেন। "চাঁদা না দিলে পরিবারের ওপর হামলা চালানো হবে বলতেন।" এসব দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপে ম্যানেজার মারা যান। আমাদের কারখানায় প্রায় ৪০০ জন শ্রমিক কাজ করেন, এখন এই কারখানা বন্ধ হলে আমরা কী করে চলব? টাঙ্গাইলের কোথাও জুট মিল নেই, শুধু এই মিলটিই আছে। মাসে যেখানে ২ লাখ টাকা আয় হয় না, সেখানে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দেবে কীভাবে?
ফ্লোর ইনচার্জ আশরাফ বলেন, ম্যানেজার খুব ভালো মানুষ ছিলেন। "বিগত সরকারের আমলে কেউ চাঁদা চায়নি, এখন বিএনপির নাম করে তারা চাঁদা দাবি করছে।" আমার কাছেও চাঁদা চেয়েছেন ওয়ারেস।
হিসাবরক্ষক ইয়াসিন আরাফাত জানান, গত কয়েকদিন ধরে ওয়ারেস সিকদারসহ আরও কয়েকজন অফিসে এসে ম্যানেজার স্যারকে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখায় এবং ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। "স্যার এতো টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তারা প্রাণনাশের হুমকি দেয়। তারা একেক সময় একেক অজুহাত দিয়ে চাঁদা চায়—কখনও বলে দলের কাজের জন্য, আবার কখনও বলে রাস্তা মেরামতের জন্য টাকা লাগবে; তা না হলে কারখানার চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।" একপর্যায়ে ভয়ে স্যার বলেন যে তিনি মালিকের সাথে কথা বলে জানাবেন। পরে তারা চলে যান। "পরবর্তীতে আমরা মালিকের সাথে কথা বলে কিছু টাকা দিতে সম্মত হই। ২৪ আগস্ট বিকেলে ওয়ারেস ফোন করে জানায় যে তারা টাকা নেওয়ার জন্য আসছে। ওই সময় হঠাৎ করেই ম্যানেজার স্যার গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তাৎক্ষণিকভাবে কারখানাতেই মারা যান।" এ বিষয়ে থানায় মামলা করা হয়েছে, আমরা আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছি।
ঘটনার পর নিহত ম্যানেজারের পরিবারের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা সংবাদমাধ্যমের কাছে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন জানান, "স্থানীয় বিএনপি নেতারা নিহতের পরিবারকে কোনো প্রকার বক্তব্য না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। বিশেষ করে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সেলুর নির্দেশেই এসব কঠোর বিধিনিষেধ চলছে।" নিহতের পরিবারের নিকটবর্তী স্থানীয় বাসিন্দা আসিফ জানান, "আসামি ওয়ারেসসহ অভিযুক্তদের সাথে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সেলুর নিয়মিত উঠাবসা রয়েছে। বিএনপি নেতারা পরিবারটিকে নিষেধ করেছেন যাতে মিডিয়া বা অন্য কারও কাছে তারা কোনো কথা না বলেন।"
অভিযুক্ত ওয়ারেসের বাবা আসলাম দাবি করেন, "কারখানার সামনের রাস্তায় বালু থাকায় চলাচলে অসুবিধা হচ্ছিল, তাই এলাকার রাস্তা মেরামতের জন্য সবার কাছেই টাকা চাওয়া হয়েছিল। সে কারণেই ম্যানেজারের সাথে কথা বলা হয়। তবে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবির বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।"
এদিকে ভূঞাপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. সেলিমুজ্জামান তালুকদার সেলু বিষয়টি নিয়ে বলেন, "ঘটনাটি শুনেছি। তদন্তে সত্যতা মিললে প্রশাসন আইনগত ব্যবস্থা নেবে। কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত অপকর্মের দায় বিএনপি কোনোভাবেই গ্রহণ করবে না।"
ভূঞাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রেজাউল করিম জানান, "অভিযুক্ত আসামিদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা নেওয়া হয়েছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর কারখানার শ্রমিকদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং সিসিটিভি ফুটেজে চাঁদা দাবির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় মামলাটি রুজু করা হয়। আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তারে আমাদের আইনগত প্রক্রিয়া ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।"