চ্যাম্পিয়নস লিগের নতুন ফরম্যাটে লিগ পর্বের ড্র সম্পন্ন হয়েছে। এবারের ড্রয়ে কিছু দল পেয়েছে তুলনামূলক সহজ প্রতিপক্ষ, আবার কারও কারও সামনে শুরু থেকেই কঠিন চ্যালেঞ্জ। ছয়বারের চ্যাম্পিয়ন লিভারপুলের সূচি অনেকটা স্বস্তিদায়ক, কিন্তু বার্সেলোনা ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে নামতে হবে কঠিন লড়াইয়ে।
লিভারপুলের নতুন কোচ আর্নে স্লটের জন্য ড্রটি মোটেও খারাপ নয়। পট-১ থেকে পিএসজি, রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা ও বায়ার্ন মিউনিখের মতো বড় দলগুলোকে এড়িয়ে গেছে তারা। পট-২ থেকে প্রতিপক্ষ হিসেবে পেয়েছে ইন্টার মিলান ও আতলেতিকো মাদ্রিদ। তবে এই দুই ম্যাচ ছাড়া বাকি ছয় ম্যাচে ক্লাব ব্রুগে, ভিয়ারিয়াল, ফেনেরবাচে, লাস্ক, সেল্টিক ও সাবা এফকে-এর বিপক্ষে জয়ের ভালো সুযোগ আছে। তবে অস্ট্রিয়ায় লাস্কের মাঠে ম্যাচটি একটু সতর্ক হয়ে খেলতে হবে, কারণ সেল্টিকের বিপক্ষে প্লে-অফের প্রথম লেগে ৪ গোলের ব্যবধানে পিছিয়ে থেকেও তারা ঘুরে দাঁড়িয়ে লিগ পর্বে জায়গা করে নিয়েছে।
আতলেতিকো মাদ্রিদের জন্য ড্রটি মোটেও সহজ নয়। চ্যাম্পিয়নস লিগে বারবার ব্যর্থতার পর এবার তারা ট্রফি জিততে মরিয়া। ফাইনাল হবে তাদের নিজেদের মাঠ মেত্রোপলিতানো স্টেডিয়ামে, তাই স্বপ্নটা বড়। কিন্তু প্রতিপক্ষ তালিকায় আছে বায়ার্ন মিউনিখ, লিভারপুল ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মতো দল। তবুও শেষ ষোলোতে ওঠার পথটা খুব কঠিন নয়। পিএসভি, ফেনেরবাচে, ভাইকিং ও স্টুটগার্টের বিপক্ষে জয়ের সম্ভাবনা প্রবল। তবে নরওয়েতে বোডো/গ্লিমটের বিপক্ষে ম্যাচটি কঠিন হতে পারে, কারণ গত মৌসুমে লিগ পর্বের শেষ ম্যাচে মেত্রোপলিতানোতেই তারা আতলেতিকোকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল।
আজারবাইজানের সাবা এফকে-র জন্য এটি ইতিহাসের প্রথম চ্যাম্পিয়নস লিগ মৌসুম। ড্রতে তারা পেয়েছে বার্সেলোনা, বরুসিয়া ডর্টমুন্ড, আর্সেনাল ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মতো দল। ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ক্লাবটির জন্য এই ড্রই যেন স্বপ্ন। তবে নিজেদের মাঠ বাকুর তোফিক বাহরামভ স্টেডিয়াম উয়েফার মানদণ্ড পূরণ না করায় তারা বার্সেলোনা ও ডর্টমুন্ডের বিপক্ষে খেলবে নিরপেক্ষ ভেন্যুতে। আর্সেনাল ও ইউনাইটেডের বিপক্ষে ম্যাচ হবে যথাক্রমে এমিরেটস ও ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে। নাপোলি ও ভিয়ারিয়ালের মতো দলও আছে তাদের সূচিতে। ফলাফল যাই হোক, সাবা এফকে-র জন্য স্মরণীয় একটি মৌসুম অপেক্ষা করছে।
রিয়াল মাদ্রিদে কোচ হিসেবে ফিরেছেন জোসে মরিনিও। ড্রতে তিনি পেয়েছেন নিজের সাবেক দুই ক্লাব ইন্টার মিলান ও রোমাকে। ইন্টারের বিপক্ষে ম্যাচটি আবেগঘন, কারণ ২০১০ সালে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে ইন্টারকে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতিয়েছিলেন মরিনিও। এবার সেই মাঠেই ইন্টারকে প্রতিপক্ষ হিসেবে পাবেন তিনি। ইন্টার ছাড়া আর্সেনালের মাঠে খেলাটি রিয়ালের জন্য সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হতে পারে। এই ম্যাচটি ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের জন্যও বিশেষ, কারণ রিয়ালে না থাকলে তিনি হয়তো প্রিমিয়ার লিগের চ্যাম্পিয়নদের জার্সিতে খেলতেন। রোমায় ফিরতি যাত্রাও থাকছে মরিনিওর। তবে পিএসভি, আরবি লাইপজিগ, শাখতার দোনেৎস্ক, লাস্ক ও এইকে এথেন্সের বিপক্ষে রিয়ালের বড় সমস্যায় পড়ার কথা নয়। শাখতারের বিপক্ষে ম্যাচটি হবে স্টামফোর্ড ব্রিজে, মরিনিওর আরেক পুরোনো ঠিকানা। সব মিলিয়ে ড্র নিয়ে খুশিই হওয়ার কথা রিয়ালের।
বার্সেলোনার জন্য এবারের ড্র শুরু থেকেই কঠিন। ২০২৫ সালে সেমিফাইনাল ও ২০২৬ সালে কোয়ার্টার ফাইনালে থামতে হয়েছে তাদের। হান্সি ফ্লিকের দল এবার আরও এক ধাপ এগিয়ে ট্রফি জিততে চায়। টানা দুই মৌসুম লা লিগা জেতা বার্সেলোনা সর্বশেষ চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছিল ২০১৫ সালে। কিন্তু এবার পট-১ থেকে ম্যানচেস্টার সিটি ও পিএসজি—দুই দলই তাদের সঙ্গে। পট-২ থেকে পেয়েছে উনাই এমেরির অ্যাস্টন ভিলা। পট-৩-এর প্রতিপক্ষ গালাতাসারাই, যাদের মাঠে খেলা মানেই কঠিন পরিবেশ। আর পট-৪ থেকে তুলনামূলক কঠিন দুই প্রতিপক্ষ কোমো ও সাবা। লামিনে ইয়ামালদের নকআউট পর্বে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, কিন্তু এবার সেই পথটা মোটেও সরল নয়।
দুই বছর পর ইউরোপের সেরা ক্লাব প্রতিযোগিতায় ফিরেছে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। প্রিমিয়ার লিগে অনিশ্চিত শুরুর পর এবার চ্যাম্পিয়নস লিগেও মাইকেল ক্যারিকের দলকে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হবে। পট-১ থেকে বায়ার্ন মিউনিখ পাওয়াই বড় ধাক্কা। গত মৌসুমে সেমিফাইনালে খেলা বায়ার্ন যে কোনো দলের জন্যই কঠিন প্রতিপক্ষ। তার ওপর আতলেতিকো মাদ্রিদের মাঠ মেত্রোপলিতানোতে খেলতে হবে ইউনাইটেডকে। দিয়েগো সিমিওনের দলের মাঠের পরিবেশ সামলানো সহজ নয়। বাকি ম্যাচগুলোর কোনটিতে ইউনাইটেড নিশ্চিতভাবে তিন পয়েন্ট পাবে, সেটিও বলা কঠিন। ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে জয়ের সুযোগ আছে, কিন্তু সেই ম্যাচ হবে স্পেনে। সাবার বিপক্ষে অন্তত ঘরের মাঠে খেলবে ইউনাইটেড। তবে কোমোর মাঠে ম্যাচটি কঠিন হতে পারে।
গত মৌসুমের চ্যাম্পিয়নস লিগ ভিয়ারিয়ালের জন্য ছিল হতাশাজনক। ২০২২ সালে সেমিফাইনাল এবং ২০২১ সালে ইউরোপা লিগ জেতা দলটি লিগ পর্বের আট ম্যাচে পেয়েছিল মাত্র এক পয়েন্ট। ৩৬ দলের মধ্যে শেষ করেছিল ৩৫তম হয়ে। নতুন কোচ ইনিও পেরেজের সামনে এবারও কঠিন পরীক্ষা। পিএসজি, লিভারপুল, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, ডর্টমুন্ড ও নাপোলি—এই পাঁচ দলের বিপক্ষে ভিয়ারিয়ালকে আন্ডারডগ হিসেবে নামতে হবে। ফেনেরবাচের মাঠে খেলাটাও সহজ হওয়ার কথা নয়। পট-৪-এর সাবা ও স্লাভিয়া প্রাগের বিপক্ষে অন্তত ভালো ফল করে গত মৌসুমের এক পয়েন্টের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়াই এখন ভিয়ারিয়ালের প্রথম লক্ষ্য হতে পারে।
প্রিমিয়ার লিগে মৌসুমের শুরুটা ভালো হয়নি অ্যাস্টন ভিলার। তার ওপর গ্রীষ্মে মরগান রজার্স, এজরি কনসা ও ইউরি টিলেমানসের মতো গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের হারিয়েছে তারা। এর মধ্যেই চ্যাম্পিয়নস লিগে পেয়েছে পট-১-এর দুই বড় দল পিএসজি ও বার্সেলোনাকে। পট-২-এর ডর্টমুন্ড ও ক্লাব ব্রুগেও সহজ প্রতিপক্ষ নয়। গালাতাসারাইয়ের মাঠে দীর্ঘ ও কঠিন সফর করতে হবে। আর নরওয়ের ভাইকিংও ভিলার জন্য অচেনা প্রতিপক্ষ। ফলে ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় উনাই এমেরির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা যা এবার অ্যাস্টন ভিলার ভরসা। তবে কঠিন এই লিগ পর্ব পেরোতে অভিজ্ঞতার পাশাপাশি ভাগ্যেরও প্রয়োজন হবে।