নড়াইল সদর উপজেলার আউড়িয়া ইউনিয়নের পংকবিলা জেলেপাড়ায় একসময় আবর্জনায় মিশে যাওয়া মাছের আঁশ এখন জেলে পরিবারগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়েছে। মাছ বিক্রির পাশাপাশি আঁশ সংগ্রহ, পরিষ্কার, শুকানো ও বিক্রির মাধ্যমে অনেকে সংসারের খরচ মেটাচ্ছেন। এতে পরিবেশ দূষণ কমানোর পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে এই কার্যক্রম।

সরেজমিনে দেখা যায়, বাড়ির উঠান ও চিত্রা নদীর পাড়ের খোলা জায়গায় ছোট-বড় বিভিন্ন মাছের আঁশ রোদে শুকাচ্ছে। কোথাও বাঁশের চাটাই, কোথাও পলিথিন বা পরিষ্কার মাটিতে ছড়িয়ে রাখা হয়েছে সেসব আঁশ। পরিবারের নারী ও পুরুষ সদস্যরা মিলে আঁশ পরিষ্কার, শুকানো ও উল্টে-পাল্টে দেওয়ার কাজ করছেন। পংকবিলা জেলেপাড়ায় মোট ৯০ থেকে ১০০টি পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে ৪০ থেকে ৫০টি পরিবার গত পাঁচ থেকে ১৬ বছর ধরে মাছের আঁশ সংগ্রহ ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত। মাছ ব্যবসার পাশাপাশি আঁশ বিক্রি এখন এসব পরিবারের বাড়তি আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

জানা গেছে, মাছের আঁশ বর্তমানে বিভিন্ন শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে ওষুধ ও পোলট্রি ফিড তৈরিতে এর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। দেশীয় চাহিদার পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাত করা এসব মাছের আঁশ বিদেশের বাজারেও পাঠানো হচ্ছে। জাপান ও চীনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এটি রপ্তানির বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ফলে মাছ কাটার পর ফেলে দেওয়া আঁশ একদিকে পরিবেশদূষণ কমাতে ভূমিকা রাখছে, অন্যদিকে তৈরি করছে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ীদের মতে, মাছের জাত ও আকার অনুযায়ী আঁশের চাহিদা ও দাম ভিন্ন হয়। বড় আকারের রুই, কাতলা, গ্রাস কার্প ও ব্ল্যাক কার্পের (ব্লাড কার্পের স্থানে সংশোধন করা হয়েছে) আঁশের চাহিদা তুলনামূলক বেশি। বড় মাছের আঁশ আকারে বড় হওয়ায় তা সংগ্রহ, পরিষ্কার ও শুকানো সহজ।

পংকবিলা গ্রামের জেলে ও মাছ ব্যবসায়ী টিকান্তু সরকার বলেন, আগে মাছ কাটার পর আঁশ ফেলে দেওয়া হতো। এখন আমরা সেগুলো আলাদা করে সংগ্রহ করি। বাড়িতে এনে পরিষ্কার করে কয়েক দিন রোদে শুকিয়ে রাখি। পরে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করি। এতে মাছ বিক্রির পাশাপাশি বাড়তি কিছু আয় হয়।

অপর জেলে ও মাছ ব্যবসায়ী সুপল বিশ্বাস বলেন, বর্তমানে প্রতি কেজি মাছের আঁশ ৭০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভালো মানের আঁশ হলে কেজিপ্রতি ১০০ টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়। তিন-চার মাস পরপর যশোর, নওয়াপাড়া ও ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা এখানে এসে আঁশ কিনে নিয়ে যান।

পংকবিলা এলাকার বাসিন্দা দয়াল শিল শুভ বলেন, আমার প্রতিবেশী অনেক জেলে পরিবার মাছ বিক্রির পাশাপাশি আঁশ সংগ্রহ করে। পরিবারের নারী-পুরুষ সবাই এ কাজে যুক্ত থাকেন। আঁশ বিক্রি করে পাওয়া টাকা দিয়ে তারা সংসারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার ব্যয়ও চালাচ্ছেন।

জেলে পরিবারের কয়েকজন গৃহিণী জানান, আগে আঁশগুলো আবর্জনার সঙ্গে ফেলে দেওয়া হতো। এখন সেগুলো আলাদা করে পরিষ্কার করে শুকিয়ে জমিয়ে রাখা হয়। পরে বিক্রি করে পাওয়া টাকা সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচে কাজে লাগে। এতে পরিবারের আয় বাড়ছে এবং নারীরাও সরাসরি আয়মূলক কাজে যুক্ত হতে পারছেন।

নড়াইল সদর উপজেলার সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. সাইদুজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, মাছের আঁশ এখন আর বর্জ্য নয়, এটি মূল্যবান সম্পদ। রূপগঞ্জ মাছবাজারে পংকবিলার জেলে সম্প্রদায় মাছ রান্নার উপযোগী বা ‘রেডি টু কুক’ করার সময় আঁশ সংগ্রহ করেন। এসব আঁশ প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে এবং বিভিন্ন শিল্পে এর চাহিদা বাড়ছে। জেলেদের এ বিষয়ে সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে, যাতে তারা এই খাতে আরও সম্পৃক্ত হতে পারেন এবং এটিকে টেকসই আয়ের উৎসে পরিণত করতে পারেন।