শরীয়তপুরে তিন সাংবাদিককে মারধর ও কয়েক সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠা জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুজ্জামান মোল্লা এবার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ করেছেন। বুধবার (২৭ আগস্ট) রাতে পালং মডেল থানায় তিনি এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দেন।
অন্যদিকে মারধরের শিকার সাংবাদিকদের পক্ষ থেকেও থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগ দেওয়ার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পার হলেও সেটি মামলা বা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হিসেবে নথিভুক্ত হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন সাংবাদিকেরা।
এদিকে সাংবাদিকদের মারধর ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠার পরও আরিফুজ্জামান মোল্লার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়নি বিএনপি। বরং শরীয়তপুরে কর্মরত কয়েক সাংবাদিককে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে জেলার সাংবাদিকদের মধ্যে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ আলম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তিন সাংবাদিককে মারধরের ঘটনায় সাংবাদিক বরকত মোল্লা তার অনুপস্থিতিতে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। পরে বিএনপি নেতা আরিফুজ্জামান মোল্লাও কয়েক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। দুটি অভিযোগই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে মামলা নথিভুক্ত করা হবে।
গত শনিবার রাতে জেলা প্রশাসন জেলা প্রেসক্লাবকে লিখিত নোটিশ না দিয়ে প্রেসক্লাবের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে দেয় এমন অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনার প্রতিবাদে সময় টেলিভিশনের সাংবাদিক বিএম ইসরাফিল তার ফেসবুক পোস্টে প্রেসক্লাবের সভাপতি আবুল হোসেন ও জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগমের ছবি ব্যবহার করে প্রতিবাদ জানান।
এর পরদিন রোববার সকালে ইসরাফিলের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে তার ডান হাতের কবজি ভেঙে যায়। হামলার প্রতিবাদ এবং প্রেসক্লাবের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলার ঘটনায় রোববার বিকেলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেন শরীয়তপুরে কর্মরত সাংবাদিকেরা।
কর্মসূচি চলাকালে জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম ওই স্থান দিয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকেরা তাকে ঘিরে ধরেন এবং তার প্রত্যাহারের দাবিতে বিক্ষোভ করেন। সাংবাদিকদের এ কর্মসূচির পর বিএনপির একটি পক্ষ তাদের ওপর ক্ষুব্ধ হয় বলে অভিযোগ করে সাংবাদিকরা।
এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রেসক্লাব ও কয়েক সাংবাদিককে নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। সোমবার বিএনপির একটি পক্ষ জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করে কথা বলে। পরে তারা পৃথক সভা করে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নেন।
এর ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার ‘শরীয়তপুর জেলার সর্বস্তরের জনগণ’ এর ব্যানারে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হয়। এতে বিএনপির জেলা পর্যায়ের কয়েক নেতা উপস্থিত ছিলেন। আয়োজকদের দাবি, কয়েকশ মানুষ কর্মসূচিতে অংশ নেন। এ সময় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে নানা স্লোগান ও ব্যানার প্রদর্শন করা হয়।
মঙ্গলবারের ওই বিক্ষোভ মিছিল চলাকালে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গেলে নিউজ টোয়েন্টিফোর টেলিভিশন, জাগো নিউজ ও খবরের কাগজের প্রতিনিধি বিধান মজুমদার অনি, দ্য ডেইলি স্টারের শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলা প্রতিনিধি জাহিদ হাসান রনি এবং দৈনিক এদিন ও মানবকণ্ঠের প্রতিনিধি বরকত উল্লাহকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুজ্জামান মোল্লা, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আমিনুর রহমান ওরফে আমানসহ কয়েকজন তাদের মারধর করেন। মারধরের পর ওই দিন বিকেলে আরিফুজ্জামান মোল্লা আরও কয়েকজন সাংবাদিককে মুঠোফোনে হুমকি দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এরপর বুধবার রাতে কয়েক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে থানায় লিখিত অভিযোগ দেন আরিফুজ্জামান মোল্লা।
শরীয়তপুর জেলা বিএনপির সহসভাপতি সিরাজুল হক মোল্লা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ফ্যাসিস্টদের কিছু দোসর সাংবাদিকতার আড়ালে মব সৃষ্টি করে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেছেন। রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধির সঙ্গে এমন আচরণের প্রতিবাদে সাধারণ মানুষের সঙ্গে বিএনপিও প্রতিবাদ করেছে।
তবে বিএনপির কোনো নেতা সাংবাদিকদের মারধর করেছেন এমন তথ্য তাদের কাছে নেই বলে দাবি করেন তিনি।
সিরাজুল হক মোল্লা বলেন, একজন নেতা রাগের মাথায় এক সাংবাদিককে কিছু উল্টাপাল্টা কথা বলেছেন, যা অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক। এ ঘটনার তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।