রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধান চালিয়েছে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে হত্যার উদ্দেশ্য, সময়রেখা, পদ্ধতি এবং ঘটনার পর অভিযুক্তদের আচরণ নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে এসেছে।

আজ বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে এই তথ্যানুসন্ধানের বিষয়টি জানানো হয়। ২৪ ও ২৫ আগস্ট রংপুরে সরেজমিন গিয়ে আসকের দুই সদস্যের প্রতিনিধিদল নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর বোন পূজা চক্রবর্তী, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ, ডিবির উপপুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী, গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাসের বাবা বিনয় দাস, গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাসের মা সেনা রানী দাস এবং সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার সীমান্ত চন্দ্র দাসের মা-বাবার সঙ্গে কথা বলেন। অভিযুক্তদের স্বজনরাও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

গত ২০ আগস্ট দিবাগত রাতে রংপুর মহানগরীর মাছুয়াপাড়া/কামালকাছনা এলাকায় গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও তাদের দুই সন্তান আগামী চক্রবর্তী ও আয়ুশ চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। ২২ আগস্ট রাতে স্বজনদের উদ্যোগে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসলে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করলেও পুলিশের প্রাথমিক ব্যাখ্যার সঙ্গে নিহত পরিবারের স্বজন, স্থানীয় নাগরিক ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে কিছু অসংগতি দেখা দিয়েছে।

মর্গের ইনচার্জ সাহেব আলী ও ময়নাতদন্ত প্রক্রিয়া সংশ্লিষ্ট ডোম যতন কুমারের সঙ্গে কথা বলে আসক জানতে পারে, মরদেহগুলো পচনশীল অবস্থায় ছিল। যতন কুমার ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন না দেখলেও শরীরের কিছু অংশে আঘাতের লক্ষণ দেখেছেন। নিহত দুই নারীর শরীরে যৌন নির্যাতনের কোনো আলামত চোখে পড়েনি, তবে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। তবে আসক বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছে, মর্গ কর্মীর পর্যবেক্ষণকে চূড়ান্ত চিকিৎসা বৈজ্ঞানিক মতামত হিসেবে গণ্য করা যাবে না। মৃত্যুর কারণ, আঘাতের ধরন, যৌন সহিংসতার আলামত এবং হত্যার পদ্ধতি সম্পর্কে সিদ্ধান্তের জন্য ময়নাতদন্ত, রাসায়নিক ও অন্যান্য ফরেনসিক পরীক্ষার আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনই নির্ভরযোগ্য। প্রতিনিধিদল ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের সাক্ষাৎকার নিতে পারেননি।

একই পরিবারের চার সদস্যের হত্যাকাণ্ড অত্যন্ত নৃশংস এবং এটি জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ঘটনার প্রকৃতি, উদ্দেশ্য, ঘটনাক্রম ও প্রকৃত জড়িতদের শনাক্ত করতে পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের ওপর জোর দিয়েছে আসক।

তদন্তে উঠে আসা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাত ২টা ৪০ মিনিটে প্রীতিলতা চক্রবর্তীর নম্বর থেকে তার বোন পূজা চক্রবর্তীর কাছে করা ফোনকলটি। ওই সময়ে ফোনটি কে ব্যবহার করছিলেন, কলের স্থায়িত্ব কতক্ষণ ছিল, ফোনের অবস্থান কোথায় ছিল এবং এরপর পরিবারের সদস্যদের মোবাইল কখন বন্ধ হয়েছিল—এসব তথ্য কল ডিটেইল রেকর্ড, লোকেশন ও অন্যান্য ডিজিটাল আলামতের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। পুলিশের বর্ণিত সময়রেখার সঙ্গে এই ফোনকলের সম্পর্ক স্পষ্ট হতে হবে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্তরা কিছু সময় ওই বাড়িতে অবস্থান করেন, খাবার খান ও গোসল করেন। যদি এমন দাবি সত্য হয়, তবে ঘটনাস্থল থেকে ফরেনসিক আলামত পাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকার কথা। তাই বাথরুম, খাবারের পাত্র, দরজা-জানালা, আসবাব, বিছানা, পোশাকসহ সংশ্লিষ্ট স্থান ও বস্তু থেকে ডিএনএ, আঙুলের ছাপ, ত্বকের কোষ, চুলসহ সম্ভাব্য আলামত সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা হয়েছে কি না, এবং তার ফলাফল কী—তা তদন্তে স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

অভিযুক্তদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি বিচারিক প্রক্রিয়ায় মূল্যায়িত হবে। তবে পূর্ণ সত্য উদ্‌ঘাটনে শুধু স্বীকারোক্তির ওপর নির্ভর না করে স্বাধীন ও বস্তুগত আলামত, ডিজিটাল তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, কল ডিটেইলস, ডিএনএ ও অন্যান্য ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফলকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি বলে আসক উল্লেখ করেছে। বাড়ির বিদ্যুৎ–সংযোগ কখন, কীভাবে ও কার মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল, সেটিও নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। এর সঙ্গে সিসিটিভি, অভিযুক্তদের চলাচল ও হত্যাকাণ্ডের সময়ের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা প্রযুক্তিগত আলামতের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত।

নিহতদের স্বজনরা পুলিশের প্রাথমিক ব্যাখ্যা নিয়ে যেসব প্রশ্ন ও উদ্বেগ জানিয়েছেন, সেগুলোকে অমূলক বা বিভ্রান্তিকর হিসেবে উড়িয়ে না দিয়ে তদন্তের অংশ হিসেবে যাচাই করা প্রয়োজন। একইভাবে পুলিশের দেওয়া ব্যাখ্যাও স্বাধীন আলামতের ভিত্তিতে যাচাই হওয়া জরুরি।

তদন্তভার ডিবিতে হস্তান্তর হওয়ায় ঘটনাটির সব দিক নতুন করে, নিরপেক্ষভাবে ও পেশাদারত্বের সঙ্গে অনুসন্ধানের সুযোগ তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে আসক বলেছে, কোনো ব্যক্তি বা সম্ভাব্য ঘটনার সূত্র যেন পূর্বধারণার কারণে তদন্তের বাইরে না থাকে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তদন্তের স্বচ্ছতা ও জন–আস্থা বজায় রাখতে তদন্তে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ বস্তুগত ও ফরেনসিক আলামতের ভিত্তিতে পুলিশের ব্যাখ্যাগুলো কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য দেওয়া প্রয়োজন।