নেপালে সাম্প্রতিক হিমবাহ ভাঙনের কারণে সৃষ্ট ভয়াবহ হড়পা বান ও আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের পেছনের বৈজ্ঞানিক কারণ, পানি ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত সতর্কতা ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলেছেন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের (ইসিমডের) ওয়াটার অ্যান্ড ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন লিড নীরা শ্রেষ্ঠা প্রধান।
হিমবাহের সম্মুখভাগ ভেঙে পড়া এই বন্যার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। পানিব্যবস্থাপনার দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হঠাৎ বিপুল পরিমাণ বরফ, পানি, পলি ও ধ্বংসাবশেষ নিচে নামলে বন্যার পানির পরিমাণ ও ধ্বংসক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নীরা শ্রেষ্ঠা বলেন, "হিমবাহের সম্মুখভাগ এত বড় আকারে ভেঙে পড়লে শুধু পানির পরিমাণই বাড়ে না; এর সঙ্গে বরফ ও ধ্বংসাবশেষও যুক্ত হয়।" বরফ, পানি ও ধ্বংসাবশেষের এই মিশ্রণ ঘন কাদার স্রোত তৈরি করে, যা সাধারণ বন্যার তুলনায় অনেক বেশি বিধ্বংসী।
ভাটির জনপদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দিকটি হলো এই দুর্যোগের অপ্রত্যাশিত প্রকৃতি। নীরা শ্রেষ্ঠা জানান, "ভাটির জনপদের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ ধরনের বিপর্যয় কোনো পূর্বতথ্য বা আগাম বার্তা ছাড়াই হঠাৎ আঘাত হানতে পারে। ফলে অপ্রত্যাশিত এই দুর্যোগের জন্য মানুষ প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পান না।"
নেপালের ভূপ্রকৃতি ও উচ্চতার তারতম্য এই ঝুঁকিকে আরও তীব্র করে তোলে। দেশটির হিমালয় অঞ্চলের উচ্চতা ৩ হাজার থেকে ৮ হাজার ৮৪৮ মিটার, মধ্যবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলের উচ্চতা ১ হাজার থেকে ৩ হাজার মিটার, মহাভারত পর্বতশ্রেণির উচ্চতা ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিটার, চুরিয়া পাহাড়ের উচ্চতা ৬০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ মিটার এবং তরাই অঞ্চলের উচ্চতা ৬০ থেকে ৩০০ মিটার। এই খাড়া ঢাল ও সরু উপত্যকা দিয়ে নদীগুলো নেমে আসায় পাশের বসতি ও অবকাঠামো ঝুঁকিতে থাকে। ইসিমডের ২০২১ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৭৭ সালের পর নেপালে হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা বা জিএলওএফের ২৬টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি ঘটনায় চীন ও নেপাল—দুই দেশেই আন্তসীমান্ত প্রভাব পড়েছে। বর্তমানে এই অঞ্চলে সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিমবাহ হ্রদ রয়েছে ৪৭টি। এর মধ্যে ২৫টি চীনে, ২১টি নেপালে এবং ১টি ভারতে। হ্রদগুলো নেপালজুড়ে কোশি, গান্ডাকি ও কার্নালি নদী অববাহিকায় অবস্থিত।
বর্তমান বন্যার পূর্বাভাস ও নদী পর্যবেক্ষণব্যবস্থা কি এই হঠাৎ বিপর্যয় শনাক্ত করতে সক্ষম? নীরা শ্রেষ্ঠা জানান, "বৃষ্টিপাতের কারণে সৃষ্ট বন্যার পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রে নেপাল অগ্রগতি অর্জন করেছে। প্রধান নদীগুলোর বিভিন্ন স্থানে জলবিদ্যা ও আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু হঠাৎ হিমবাহ–সংশ্লিষ্ট বন্যা শনাক্ত করার জন্য এসব ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়।" দুর্গম পার্বত্য এলাকায় তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রহের উপযোগী পর্যবেক্ষণকেন্দ্র, বরফের নড়াচড়া শনাক্তকারী সেন্সর এবং আন্তসীমান্ত তথ্য আদান–প্রদানের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
হিমবাহের সম্মুখভাগ, উঁচু এলাকার হ্রদ, নদীর প্রবাহ ও আবহাওয়া তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করলে আগাম সতর্কতা দেওয়া সম্ভব কিনা—এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, "হিমবাহ ও নদীর প্রবাহ তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা গেলে এ ধরনের ঘটনার আগাম সতর্কতা দিতে অবশ্যই সহায়তা করবে।" উপগ্রহের মাধ্যমে হিমবাহ ও হ্রদ পর্যবেক্ষণ, নদীর প্রবাহ ও পানির ঘোলাভাব পরিমাপের স্বয়ংক্রিয় সেন্সর, এবং ভূমিকম্পজনিত ভূমিধস ও বরফধস শনাক্তকারী সিসমিক সেন্সর এই কাজে কার্যকর হতে পারে। এছাড়া ইসিমডের জনগোষ্ঠীভিত্তিক বন্যার আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। এতে কম খরচের সেন্সর ব্যবহার করে মোবাইল ফোন বা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে গ্রামবাসীকে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়, যা প্রস্তুতি নেওয়ার সময় বাড়ায়।
সাম্প্রতিক দুর্যোগে নেপাল–চীন সীমান্তের দুই পাশের এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আন্তসীমান্ত বিপদ মোকাবিলায় নেপাল, চীন, ভুটান ও ভারতের মধ্যে পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা কী হতে পারে? নীরা শ্রেষ্ঠা মনে করেন, "আমার মতে, সব ক্ষেত্রে নদীর প্রবাহের সুনির্দিষ্ট উপাত্ত আদান–প্রদানের প্রয়োজন না–ও হতে পারে। এ ধরনের উপাত্ত ভাগাভাগি করা কঠিন হতে পারে। কিন্তু উজানে পানির উচ্চতা বাড়ছে—এ তথ্যটি অন্তত ভাটির দেশ ও জনপদকে জানানো যেতে পারে।" সময়মতো এই তথ্য পাওয়া গেলে ভাটির মানুষ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারবেন এবং জীবন ও জীবিকা রক্ষা সম্ভব হবে.