জামালপুরের চরাঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা অসুস্থ ঘোড়ার মাংস চোরাচালানের মাধ্যমে ঢাকার রেস্তোরাঁয় গরুর মাংস হিসেবে বিক্রির ঘটনা সামনে এসেছে। গত ২৩ আগস্ট ভোরে জামালপুর সদর উপজেলার নরুন্দি বাজার এলাকায় পুলিশের অভিযানে প্রায় ৯৫০ কেজি অস্বাস্থ্যকর মাংস উদ্ধারসহ চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়েছে।

তদন্তে জানা গেছে, তিনটি দলের সমন্বয়ে এই অবৈধ বাণিজ্য পরিচালিত হতো। প্রথম দলের প্রধান দুদু মিয়া প্রতি বৃহস্পতিবার জামালপুরের ঐতিহ্যবাহী তুলশীপুর হাট থেকে কম দামে অসুস্থ ও অকেজো ঘোড়া কেনা হতো। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে সেই ঘোড়াগুলো দূরবর্তী তুলশিরচর ইউনিয়নের নির্জন মানিকার চরে নিয়ে যাওয়া হতো। ১৫ থেকে ২০টি ঘোড়া জমা হলে আলফাজের নেতৃত্বাধীন দ্বিতীয় দল গভীর রাতে জবাই, চামড়া ছাড়ানো ও মাংস প্রক্রিয়াজাত করে পিকআপ ভ্যানে ঢাকার উদ্দেশ্যে পাঠাত। ঢাকার যাত্রাবাড়ীসহ সুবিধাজনক প্রবেশমুখে এমদাদের নেতৃত্বাধীন তৃতীয় দল মাংস বুঝে নিয়ে রাজধানীর তালিকাভুক্ত রেস্তোরাঁয় খণ্ড খণ্ড করে পৌঁছে দিত।

সম্প্রতি স্থানীয়দের কাছ থেকে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকায় অসুস্থ ঘোড়া কেনা হতো। চক্রটি এখান থেকে কেজিপ্রতি ৩০০ টাকায় মাংস কিনে ঢাকায় রেস্তোরাঁগুলোতে ৪০০ টাকায় বিক্রি করত। পশু বলিকরণ ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১১ অনুযায়ী বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে ঘোড়া জবাই বা এর মাংস বাজারজাত করা সম্পূর্ণ বেআইনি ও দণ্ডনীয়।

ঘটনার দিনই চরের বাসিন্দারা চক্রের কয়েকজনকে আটক করে। পরে টাকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, দুদু মিয়ার লোকজনকে আটকে রাখলেও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতির ছেলে মেহেদী হাসান মধ্যরাতে হস্তক্ষেপ করে অর্থের বিনিময়ে কসাই দলের সদস্যদের পালিয়ে যেতে সাহায্য করেন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মেহেদী হাসান বলেন, পিকআপ আটকের পর আমি থানাতেই ছিলাম। সেখানে পুলিশ তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর আমি চলে আসি। পরে চকবাজারে চায়ের দোকানে হট্টগোল ও মারপিট দেখে আমি শুধু ঝামেলা থামানোর চেষ্টা করি। তাদের বলি চায়ের দোকান থেকে সরে গিয়ে কথা বলো, আর এরা যদি সত্যিই অপরাধী হয় তবে পুলিশে বুঝিয়ে দাও। এই পর্যন্তই আমি জানি।

অভিযুক্ত ঘোড়া ব্যবসায়ী দুদু মিয়ার সঙ্গে কথা বলতে বাড়িতে গেলেও তিনি ক্যামেরার সামনে আসেননি। তবে তার ভাই ও স্থানীয় ইউপি সদস্য আবুল কাশেম গোপন ক্যামেরায় ধারণকৃত বক্তব্যে ঘোড়া ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘হানো ১০টার পরে কোনো লোকজন থাকে না। এই এইডের (এলাকার) মধ্যে ১০টার পরে কোনো লোকজন পাইতেন না। একজনরে যদি সারা রাইত বাইন্দাও থও, কোনো লোক আইতো না। ২৫ বছর যাবৎ হইবো ও ব্যবসা করে। কোনো ডিস্ট্রিক্টের নম্বর চাবা, ওর কাছে সব নম্বর আছে।’
মানিকার চরের বাসিন্দারা জানান, রাতে মাঝে মাঝে ট্রলারের শব্দ শোনা গেলেও এমন জালিয়াতি যে চলছে, তা তারা বুঝতে পারেননি। চরের স্থানীয় বাসিন্দা রফিক বলেন, তুলশীপুর হাট থাইকা ৫০০ থেকে ১০০০ টাকায় অসুস্থ আর বয়স্ক ঘোড়া পাইলেই চক্রটা কিনা নিয়া আসত। ঘোড়ার শব্দ হইতাছে এটা আমরা শুনছি। রাত ৭টা থেকে ১০টা পর্যন্ত আমরা এখান দিয়ে চলাচল করি। তারা নৌকা আইনা কখন কী করত, তা তো আমরা বলতে পারি না। আমরা তাদের শাস্তি চাই। আরেক স্থানীয় বাসিন্দা রুকন বলেন, যারা কসাই, কাটাকাটি করে, তাদের আমরা আটকাইছিলাম। যারা কিনে নিয়ে যায়, তাদের পুলিশ আটক করছে। পরে শুনি মেহেদী নামে একজন তাদের ছেড়ে দেয়। কাজ থেকে আইসা শুনি টাকা-পয়সার লেনদেনের মাধ্যমে ছেড়ে দিছে। রিফাত নামের এক বাসিন্দা বলেন, আমাদের এই চরে দুই নম্বর কাজ বেশি হচ্ছে। তারা যদি চরের মাঝখানে এসে অসুস্থ ঘোড়া জবাই করে, তাহলে কেউ জানতে পারবে না। তারা অনেক প্রভাবশালী, তাদের বিষয়ে কথা বলতে আমাদেরও ভয় লাগে। আমরা তাদের বিচার চাই।

পশু বলিকরণ ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১১ অনুযায়ী বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে ঘোড়া জবাই করা বা এর মাংস বাজারজাত করা সম্পূর্ণ বেআইনি ও দণ্ডনীয় অপরাধ। জামালপুর সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আসাদুজ্জামান সতর্ক করে বলেন, পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১১-এর ১২ নম্বর ধারায় স্পষ্টভাবে বলা আছে কেবল গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষ এবং নির্দিষ্ট কিছু হাঁস-মুরগি বা পাখি জবাইয়ের অনুমতি রয়েছে। কিন্তু এই তালিকায় ঘোড়ার কোনো উল্লেখ নেই। অর্থাৎ বাণিজ্যিকভাবে বা খাওয়ার উদ্দেশ্যে ঘোড়া জবাই করা সম্পূর্ণ বেআইনি।

নরুন্দি পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ নাজমুল হক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তুলশীপুরের হাট থেকে অসুস্থ ঘোড়াগুলো সংগ্রহ করে চরের নির্জন মানিকার চরে নিয়ে আসা হতো। সেখানে প্রতি সপ্তাহে ১৫ থেকে ২০টি ঘোড়া একসঙ্গে জবাই করে সেগুলোর মাংস ট্রাকে ঢাকায় পাঠানো হতো। এরপর ঢাকার বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ও হোটেলে কালা ভুনা বা কাবাবের মতো পদে গরুর মাংস বলে তা বিক্রি করা হতো। তিনি বলেন, এমন খবর জানার পর আমরা কঠোর পদক্ষেপ নিই। অভিযান চালিয়ে হাতেনাতে ১৩টি জবাই করা ঘোড়া ও ১৮ বস্তায় প্রায় ৯৫০ কেজি মাংস উদ্ধারসহ এই চক্রের পাঁচজনকে আটক করা হয়। জামালপুর থেকে এগুলো সংগ্রহ ও কাটাকাটি করত দুদু নামের এক ব্যক্তি এবং ঢাকায় রেস্তোরাঁগুলোতে সরবরাহ করত এমদাদ। এই দুই মূল হোতার মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী মধ্যস্বত্বভোগী দলটিকে আমরা আটক করতে পেরেছি। তারা স্বীকার করেছে, এখান থেকে কেজিপ্রতি ৩০০ টাকায় কিনে ঢাকায় রেস্তোরাঁগুলোতে ৪০০ টাকায় তারা বিক্রি করত। এটি একটি আন্তজেলা চক্র, যারা সারা দেশ থেকেই এভাবে অসুস্থ ঘোড়া সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠায়। এই ধরনের নৈতিক মূল্যবোধহীন ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধে পুলিশের সর্বোচ্চ সতর্কতা ও কঠোর নজরদারি অব্যাহত থাকবে।