দুর্বলতা বলে মনে হলেও কখনো কখনো ধৈর্য ও সংযমই সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। ১৮ আগস্ট সিরিয়ার আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলের হামলা এবং তার পরপরই ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যকার সরাসরি সতর্কবার্তা একটি বিপজ্জনক প্রশ্ন নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে: তুরস্ক ও ইসরায়েল কি সিরিয়ায় যুদ্ধের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে?
ইসরায়েলের সামরিক শক্তি যেখানে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী, আঙ্কারার উচিত সেই ময়দানটি এড়িয়ে চলা। ইসরায়েলে কোনো হামলা না চালিয়েও তুরস্ক আঞ্চলিক সুবিধাজনক অবস্থান সুসংহত করছে। তারা দামেস্কে একটি বন্ধুভাবাপন্ন সরকার গঠনে সহায়তা করছে, লেবানন ও লোহিত সাগর এলাকায় প্রভাব বাড়াচ্ছে, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গভীর করছে এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নতি ঘটাচ্ছে। একটি যুদ্ধ তুরস্কের এই সব অর্জনকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। এখানে ‘জয়ী হওয়া’ বলতে ইসরায়েলকে পরাজিত বা ঘেরাও করা বোঝায় না; বরং তুরস্ক অনেক কম খরচে এবং ঝুঁকি না নিয়ে সুবিধাজনক কৌশলগত অবস্থান তৈরি করছে।
সিরিয়াকে ঘিরে দুই দেশের দ্বন্দ্ব স্পষ্ট, কারণ তাদের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ বিপরীত। তুরস্ক চায় একটি ভূখণ্ডগতভাবে ঐক্যবদ্ধ সিরিয়া, যা নিজের সীমানা রক্ষা করতে পারবে, আইএস ও পিকেকে-সংলগ্ন হুমকি দমন করবে এবং শরণার্থীদের নিজ দেশে ফিরে আসার পরিবেশ তৈরি করবে। অন্যদিকে, ইসরায়েল চায় একটি দুর্বল ও সীমাবদ্ধ সিরিয়া, যেখানে থাকবে দুর্বল বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সীমিত ভারী অস্ত্র এবং গোলান মালভূমির কাছে কোনো শত্রুভাবাপন্ন বাহিনী থাকবে না।
এই মতবিরোধ ২০২৫ সালের এপ্রিলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তুরস্কের একটি প্রতিনিধিদল যখন টি-ফোর, পালমিরা এবং হামার বিমানঘাঁটিগুলোতে গভীর প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়ে পর্যবেক্ষণ করছিল, ঠিক তখনই ইসরায়েল ওই স্থানগুলোতে ভারী বোমা হামলা চালায়। আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটির হামলাও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। সিরিয়ার কর্মকর্তারা দাবি করেন, হামলার ঠিক আগেই সেখানে তুর্কি প্রতিনিধিদলের সফর ছিল, যদিও আঙ্কারা তা অস্বীকার করে। ইসরায়েল দাবি করে সেখানে তুর্কি বাহিনী মোতায়েনের প্রস্তুতি চলছিল; কিন্তু সিরিয়া ও তুরস্ক তা অস্বীকার করে।
"দামেস্ক সরকার যত তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবে, নিজেদের সশস্ত্র বাহিনীকে পুনর্গঠিত করবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুদ্ধার করবে, সিরিয়াকে একটি দুর্বল ও নিরাপত্তাহীন রাষ্ট্র হিসেবে ফেলে রাখা ইসরায়েলের জন্য ততটাই কঠিন হয়ে পড়বে।"
এটি তুরস্কের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তবে যুদ্ধের কোনো কারণ হতে পারে না। ইসরায়েল রানওয়ে ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু তারা একটি স্থিতিশীল সিরিয়া রাষ্ট্র তৈরি করতে পারবে না। বাণিজ্য, জ্বালানি ও প্রশিক্ষণের জন্য তুরস্কের ওপর দামেস্কের নির্ভরতা মুছে ফেলতে পারবে না। সিরিয়াকে কেন্দ্র করে তুরস্ক-ইসরায়েল যুদ্ধক্ষেত্রে রূপ না নিলে শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি আঙ্কারার পক্ষেই থাকবে।
তুরস্কের কৌশল হলো সম্পর্কের জাল বিছিয়ে ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। সোমালিয়ায় ‘ক্যাম্প টার্কসম’-এর মাধ্যমে তুর্কি বাহিনী সোমালি সেনাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে এবং এডেন উপসাগরে উপস্থিতি শক্তিশালী করেছে। এর ফলে বাব আল-মানদেব প্রণালির ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও তুরস্কের একটি পরোক্ষ প্রভাব তৈরি হয়েছে। লোহিত সাগরের পশ্চিম তটে ‘পোর্ট সুদান’-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং বহুজাতিক নৌ-নিরাপত্তা জোটের মাধ্যমে তুরস্ক বড় কৌশলগত সুবিধা পাচ্ছে।
সিরিয়া এখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বাধীন দামেস্ক সরকারের সঙ্গে আঙ্কারার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সামরিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। লেবানন এতে অতিরিক্ত কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। আঙ্কারা একটি নতুন প্রস্তাব নিয়ে ভাবছে, যেখানে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েল সেনা প্রত্যাহার করবে এবং লেবানন সরকার সব অস্ত্রের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ প্রমাণ করে যে সামরিক সাফল্য আর রাজনৈতিক সাফল্য এক নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও ইরানি রাষ্ট্র ধ্বংস হয়ে যায়নি। তেহরান তাদের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে এবং হরমুজ প্রণালির ওপর প্রভাব তৈরি করেছে।
"আঙ্কারার উচিত হবে না কোনো সাময়িক উসকানিতে পা দিয়ে নিজেদের এত দিনের সফল কৌশলকে ধ্বংস করা। ইসরায়েল যে যুদ্ধটিতে বেশি পারদর্শী, সেই যুদ্ধে না জড়িয়ে বরং রাজনৈতিক ময়দানে জিতে যাওয়ার বর্তমান কৌশল ধরে রাখাই তুরস্কের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে।"
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ককে নিয়ে গঠিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ এই নতুন ভাবনারই প্রতিফলন। আঙ্কারার উচিত একে ইসরায়েল বা ইরান—কারও বিরুদ্ধেই সরাসরি ব্যবহার না করা; এর মূল শক্তি হলো প্রতিরোধে। তুরস্ক যদি নিজে থেকে কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তবে তাদের অর্জন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে তুরস্ক বর্তমানে বিগত বহু বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক উপভোগ করছে। উভয় দেশই সিরিয়ার আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং একটি কার্যকর কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে। আবু আল-দুহুর ঘটনার পর মার্কিন প্রতিনিধি এই হামলাকে ‘অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা’ বলে আখ্যা দেন।
একটি সীমিত যুদ্ধও সিরিয়াকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেবে। যুদ্ধের প্রভাব তুরস্কের ভেতরেও ছড়িয়ে পড়বে—আকাশ ও সমুদ্রপথে ঝুঁকি বাড়বে, সামরিক খরচ বাড়বে, পর্যটন খাত লোকসানে পড়বে এবং অর্থনৈতিক বাজার চাপের মুখে পড়বে। তবে সংযম মানেই হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়। তুর্কি সেনা বা ভূখণ্ড আক্রান্ত হলে আঙ্কারাকে আনুপাতিক হারে কড়া জবাব দিতে হবে, তবে তাকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যাবে না।
তুরস্কের সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশলগত অবস্থান তখনই তৈরি হবে, যখন তারা যুদ্ধে না গিয়েও ইসরায়েলকে ঠেকিয়ে রাখতে পারবে এবং সিরিয়াকে শক্তিশালী করবে। এটি কোনো আত্মসমর্পণ নয়, এটি হলো শক্তির ওপর ভর করে রাখা কৌশলগত ধৈর্য।
বুগরা সারে তুরস্কের মারসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক। মিডল ইস্ট মনিটর থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।