ষাট বছর আগে একটি মহাদেশের পূর্ব প্রান্তের কয়েকটি দেশে কঠোর স্বৈরশাসন চলছিল। সেখানে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রচেষ্টা ছিল অনেকটা অসম্ভবের পেছনে ছোটা। সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরিবর্তন এসেছিল। বিংশ শতাব্দীর শেষ নাগাদ প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন এসব দেশের স্বাভাবিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছিল। একসময়কার রাজনৈতিক বন্দীরাও সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। সাম্প্রতিক কিছু বিপর্যয় সত্ত্বেও এসব দেশের একটির ভোটাররা সম্প্রতি বছরের পর বছর ধরে চলা স্বৈরাচারী প্রবণতাকে উল্টে দিয়েছেন। তাঁরা একজোট হয়ে সম্ভাব্য এক স্বৈরশাসককে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছেন।
আমার এ বর্ণনা শুনে মনে হতে পারে, আমি শীতল যুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক নির্বাচনে হাঙ্গেরির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের পরাজয় পর্যন্ত মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের রাজনৈতিক যাত্রার কথা বলছি। কিন্তু এ বর্ণনা পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।
.১৯৬৬ সালে ফিলিপাইন, তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় স্বৈরশাসন ছিল প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা। এসব দেশে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ গণতান্ত্রিক আন্দোলনকারীরা বছরের পর বছর এমন একটি লক্ষ্যের জন্য লড়াই করেছেন, যা অনেক সময় সম্পূর্ণ আশাহীন বলে মনে হতো। এ লড়াইয়ে তাঁদের নির্মম দমন-পীড়ন সহ্য করতে হয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার ১৯৮০ সালের গুয়াংজু গণহত্যা ছিল একটি ভয়াবহ ঘটনা। এটি ঘটেছিল প্রাগ বসন্তকে নির্মমভাবে দমন করার ১২ বছর পর। আবার পোল্যান্ডে সলিডারিটির প্রথম বড় উত্থানের ওপর সামরিক শাসনের দমন অভিযান শুরুর ঠিক আগে।
এরপর আসে বড় পরিবর্তন। ১৯৮৬ সালে ফিলিপাইনের ‘পিপল পাওয়ার’ বিপ্লব ফার্দিনান্দ মার্কোসের স্বৈরশাসনের পতন ঘটায়। ইউরোপে ভ্যাকলাভ হাভেল ও লেখ ভাওয়েন্সার রাজনৈতিক যাত্রা ছিল একসময় প্রায় অকল্পনীয়। তাঁরা বিরোধী মতের আন্দোলনকারী থেকে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। পূর্ব এশিয়াতেও এর একটি সমান্তরাল ঘটনা ঘটেছিল ১৯৯৮ সালে। দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে পরিচিত বিরোধী নেতা কিম দে-জুং সে বছর দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তাইওয়ানও এ সময়ের মধ্যে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যায়। ১৯৯৬ সালে সেখানে প্রথমবারের মতো সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
.দুর্নীতি ও গণতন্ত্র: যে শহরে কেউ লাল বাতি মানে না....এই দশকে এসে পূর্ব এশিয়া আবারও গণতান্ত্রিক দৃঢ়তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ দেখিয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ কোরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইওল সামরিক আইন জারি করেন। এর বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী, আইনপ্রণেতা ও সাধারণ মানুষ একসঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁরা এ সিদ্ধান্তকে ব্যর্থ করে দেন। এরপর ইউনকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পান।
তাহলে আজকের বিশ্বে স্বৈরাচারের উত্থানের বিরুদ্ধে যাঁরা গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই করছেন, তাঁরা অনুপ্রেরণার জন্য কেন ফিলিপাইনের ‘পিপল পাওয়ার’-এর পরিবর্তে পোল্যান্ডের সলিডারিটির দিকে বেশি তাকান? গণতান্ত্রিক প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে কেন কিম দে-জুংয়ের চেয়ে ভ্যাকলাভ হাভেল বেশি পরিচিত?
এ বৈষম্যের সহজ ব্যাখ্যা হতে পারে দীর্ঘদিনের ইউরোপকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। পশ্চিমা পর্যবেক্ষকেরা নিশ্চয়ই হাঙ্গেরির সাম্প্রতিক নির্বাচন নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার ২০২৪ সালের গণতান্ত্রিক সংকটের চেয়ে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। কিন্তু শীতল যুদ্ধের স্মৃতির ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় কাজ করেছে।
.বিশ্বের সব দেশের গণতন্ত্রপন্থীদেরও একই কাজ করা উচিত। যত বেশি সম্ভব জায়গায় খোঁজ করতে হবে। অন্যদের অভিজ্ঞতা থেকে উদারভাবে শিক্ষা নিতে হবে। আর কখনোই ধরে নেওয়া যাবে না যে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষা শুধু সেসব জায়গা থেকেই আসবে, যেগুলোর দিকে তাকাতে আমাদের শেখানো হয়েছে।.
১৯৮৯ সালের দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী ছবির কথা ভাবা যাক। একটি হলো বেইজিংয়ে ট্যাংকের সারির সামনে একা দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষের ছবি। এটি তিয়ানআনমেন চত্বরের কাছে ৪ জুনের গণহত্যার পরের দিনের ঘটনা। আরেকটি ছবি হলো একই বছরের শেষের দিকে উচ্ছ্বসিত মানুষের হাতুড়ি দিয়ে বার্লিন প্রাচীর ভেঙে ফেলার দৃশ্য।
দুটি ছবিই গভীরভাবে নাড়া দেয়। কিন্তু ইউরোপের ছবিটি কেবল আবেগই তৈরি করে না, বরং পরিস্থিতির নাটকীয় উন্নতির কথাও মনে করিয়ে দেয়। বার্লিন প্রাচীর ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু তিয়ানআনমেন বিক্ষোভের পর চীনের কমিউনিস্ট পার্টি টিকে যায়। এরপর কয়েক দশক ধরে তারা সেই বিক্ষোভ ও দমন-পীড়নের স্মৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে।
ট্যাংকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ওই অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির সাহস অবশ্যই স্মরণ করার মতো। বিশেষ করে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি যখন তাঁকে ও গণহত্যার শিকার মানুষদের কথা বিশ্বকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে, তখন তাঁকে স্মরণ করা আরও জরুরি।
.স্বৈরাচারের পতন হলেই কি গণতন্ত্র ফেরে.কিন্তু এ ছবির প্রতীকী শক্তি শীতল যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এশিয়ার ইতিহাস সম্পর্কে আমাদের স্মৃতিকেও বিকৃত করতে পারে। তিয়ানআনমেন দমন-পীড়ন যত ভয়াবহই হোক না কেন, একই সময়ে এশিয়ার অন্য অংশে অসাধারণ গণতান্ত্রিক অগ্রগতি ঘটেছিল। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত স্বৈরাচারী ব্যবস্থাগুলো তখন একের পর এক গণতান্ত্রিক শাসনের কাছে নতি স্বীকার করতে শুরু করেছিল।
অতীতের সংগ্রাম থেকে যদি আজকের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শিক্ষা ও দৃষ্টান্ত নিতে হয়, তাহলে সেগুলো যত বেশি জায়গা থেকে সম্ভব খুঁজে দেখা উচিত। কারণ, স্বৈরতান্ত্রিক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা যাঁদের আছে, তাঁরা বহুদিন ধরেই বিদেশের দিকে তাকানোর গুরুত্ব বুঝেছেন। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করতে আগ্রহী নেতারা ক্রমেই একে অপরের কাছ থেকে শিখছেন। ব্যবহারযোগ্য কৌশলের খোঁজে তাঁরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দিকে তাকাচ্ছেন।
গণতন্ত্রপন্থীদেরও তাই সমানভাবে বিশ্বমুখী হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তাঁদের শুধু ইউরোপ বা এশিয়ার দিকে তাকালে চলবে না। আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম থেকেও শিক্ষা নিতে হবে।
.কয়েক বছর আগে আমি এমন একটি গোষ্ঠীর কথা জানতে পারি, যারা এ বিষয়ে বিশেষ শিক্ষণীয় উদাহরণ। তখন আমি থাইল্যান্ডের তরুণ আন্দোলনকারীদের কর্মকাণ্ডের প্রতি মনোযোগ দিতে শুরু করেছি। এর আগে আমি দেশটি নিয়ে খুব গভীরভাবে গবেষণা করিনি। এ সময় স্যাম ইয়ান প্রেসের পেছনে থাকা তরুণদের কর্মকাণ্ড আমার আগ্রহের বিষয় হয়ে ওঠে।
২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এ প্রকাশনা সংস্থা বিশ্বের বিভিন্ন চিন্তাবিদ ও আন্দোলনকারীর লেখা থাই ভাষায় অনুবাদ করেছে। তাদের প্রকাশিত লেখকদের মধ্যে রয়েছেন হান্না আরেন্ট, রেবেকা সলনিট, মহাত্মা গান্ধী, কারাবন্দী উইঘুর পণ্ডিত ইলহাম তোহতি ও মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র।
২০১৯ সালে স্যাম ইয়ান প্রেসের প্রতিষ্ঠাতা নেটিউইট চোতিফাতফাইসাল দুজন পণ্ডিতের সঙ্গে যৌথভাবে ভ্যাকলাভ হাভেলের ১৯৭৫ সালের ‘ডক্টর হুসাককে লেখা চিঠি’ থাই ভাষায় অনুবাদ করেন। নেটিউইট থাইল্যান্ডের প্রথম বিবেকবান আপত্তিকারী হিসেবেও পরিচিত। অর্থাৎ বিবেক ও নৈতিক বিশ্বাসের কারণে তিনি সামরিক দায়িত্ব পালনে আপত্তি জানিয়েছিলেন। এ অনুবাদ প্রকল্প ছিল সাবেক সোভিয়েত ব্লকের মানুষ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনগুলোর কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রতি তাঁদের গভীর আগ্রহের প্রকাশ।
.ইসরায়েল যেভাবে ইসলামভীতি ছড়িয়ে দিচ্ছে পশ্চিমে.ভেঙে পড়ছে গণতন্ত্র, হুমকির মুখে মার্কিন অর্থনীতি.তবে তাঁরা শুধু দূরের সংগ্রাম থেকে শিক্ষা নিতে চাননি। নিজেদের কাছাকাছি অঞ্চলের গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকেও তাঁরা সমান আগ্রহ নিয়ে শিখতে চেয়েছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষ যখন ইউন সুক-ইওলের সামরিক আইন জারির চেষ্টা সফলভাবে প্রতিরোধ করেন, তখন স্যাম ইয়ান প্রেস একটি অনলাইন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে সিউলের আন্দোলনকারী ও থাইল্যান্ডের গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের জন্য লড়াইরত কর্মীরা অংশ নেন। থাইল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরে সামরিক অভ্যুত্থান ও দীর্ঘস্থায়ী সামরিক শাসনের অভিজ্ঞতা বহন করছে।
স্যাম ইয়ান প্রেসের প্রতিষ্ঠাতারা দেখিয়েছেন, কীভাবে বিশ্বব্যাপী চিন্তা করতে হয় এবং স্থানীয়ভাবে কাজ করতে হয়। তাঁরা গণতান্ত্রিক প্রতিরোধকে কেবল ইউরোপের গল্প হিসেবে দেখেননি। বরং তাঁরা বিশ্বের নানা জায়গার সংগ্রাম থেকে শিক্ষা নিয়েছেন।
বিশ্বের সব দেশের গণতন্ত্রপন্থীদেরও একই কাজ করা উচিত। যত বেশি সম্ভব জায়গায় খোঁজ করতে হবে। অন্যদের অভিজ্ঞতা থেকে উদারভাবে শিক্ষা নিতে হবে। আর কখনোই ধরে নেওয়া যাবে না যে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষা শুধু সেসব জায়গা থেকেই আসবে, যেগুলোর দিকে তাকাতে আমাদের শেখানো হয়েছে।
জেফ্রি এন ওয়াসারস্ট্রম যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আরভাইন ক্যাম্পাসের ইতিহাসের অধ্যাপক।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ