ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকির স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রগুলো আমি আগ্রহ নিয়ে দেখি। আমাদের নির্মাতারা তাঁদের গল্পে সমাজকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন, তাতে চেনা জিনিসের নতুন অর্থ ফুটে ওঠে। সম্প্রতি ‘রঙিন সুরমা’ নামের একটি শর্ট-ফিল্ম দেখেছি। ভেজা বিকেলের মতো বিষণ্ণ-সুন্দর মনে হলো এই শর্ট-ফিল্মটিকে। রিয়াজুল হক ইমরানের চিত্রনাট্য এবং পরিচালনা এক সাধারণ মধ্যবয়স্ক বাংলাদেশি দম্পতির দুঃখ-সুখের গল্পকে এমন সহজ অথচ হৃদয়গ্রাহী করে তুলেছেন যে, মনে হলো আমি এই দু’জনের আত্মীয় কিংবা প্রতিবেশী। ও হেনরির ছোটগল্পের মতোই এক উচ্ছ্বসিত কান্নার মুখ চেপে ধরা ছিল পুরো গল্প জুড়ে। নদীর ধারে জীবনের দুর্ভরতম দুঃখ নিঃশব্দে বহন করে একাকী বাবা দাঁড়িয়ে আছেন, তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটি নিঃসঙ্গ গাছ—এমন বেশ কিছু মনে রাখার মতো চিত্রকল্প দিয়ে এই গল্প সাজানো। আফজাল হোসেন এবং আফসানা মিমি—দু’জনেই অত্যন্ত শক্তিমান অভিনেতা। আটপৌরে জীবনের খুঁটিনাটি আর অপ্রকাশ্য শোকের অবিরাম ভার সহ্য করার জায়গাগুলোতে এঁদের অভিনয়কে কখনও অভিনয় বলে মনেই হলো না, সেটাই বোধ হয় ‘রঙিন সুরমার’ বড় সার্থকতার জায়গা। চিন্তা-ভাবনা করে করা সেট ডিজাইন, ক্যামেরা এবং সম্পাদনার দক্ষতা এই শর্ট ফিল্মের আবেদন আরও বাড়িয়েছে। কিন্তু আজ আমি চলচ্চিত্র সমালোচনা করতে বসিনি। আমাকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছে প্রবাসী ছাত্র-ছাত্রী এবং তাদের পরিবারের সংগ্রাম আর অসহায়ত্বের গল্প। দুই-তিন দশক আগেও বাংলাদেশ থেকে খুব অল্প কিছু ছাত্র-ছাত্রী বিদেশে পড়তে যাওয়ার সুযোগ পেতেন। এঁদের বেশিরভাগই ছিলেন অসামান্য মেধাবী, বৃত্তি-পাওয়া ছাত্র। বাকিরা ছিলেন ধনী পরিবারের সন্তান। সেকালে বিদেশে পড়তে যাওয়ার সুযোগকে বিরাট সৌভাগ্য বলে গণ্য করা হতো, কারণ ধরেই নেওয়া হতো বিদেশে পড়াশোনা করলে প্রবাসে কিংবা স্বদেশে খুব উঁচু বেতনে চাকরি করা যাবে। সে কারণে যারা বিদেশে পড়তে যেতেন, সেইসব ছাত্রছাত্রী এবং তাঁদের পরিবারকে আত্মীয়-প্রতিবেশীদের অনেকেই বেশ ঈর্ষার চোখে দেখতেন।
রঙিন সুরমা’ আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে, বিদেশে যাওয়া প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রীর একটি সম্ভাবনাময় জীবন আছে। তাদের অনেকের বাড়িতে অপেক্ষায় আছেন একজন দায়গ্রস্ত বাবা, একজন উৎকণ্ঠিত মা। কেউ কেউ দেশে রেখে গিয়েছেন ভালোবাসার মানুষটিকে, সন্তানদের।
এখন বিদেশে পড়তে যাওয়ার সুযোগ এত দুর্লভ নয়। ২০২৫ সালের জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রায় ষাট হাজার ছাত্র-ছাত্রী এখন বিদেশে পড়াশোনা করছেন। এই সংখ্যাটি বিপুল। প্রবাসী ছাত্রছাত্রীরা বাংলাদেশের জন্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এঁদের মধ্যে যাঁরা দেশে ফিরে আসবেন, তাঁরা সমসাময়িক জ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে আসবেন—সেটা বাংলাদেশের অগ্রগতির জন্যে দরকার। যাঁরা প্রবাসেই থেকে যাবেন, তাঁরা বিদেশী মুদ্রা দেশে পাঠাবেন—সেটাও আমাদের ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্যে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু কেন যেন মনে হয়, প্রবাসী ছাত্রছাত্রী এবং তাঁদের পরিবারের ব্যাপারে একটা অবচেতন ঈর্ষা আমরা সামষ্টিকভাবেই বহন করছি। সাহায্য করার বদলে তাঁদের পথে বাধা সৃষ্টি করার কাজেই যেন আমাদের উৎসাহ বেশি। প্রবাসী ছাত্রছাত্রীদের অভিজ্ঞতার বেশিরভাগ গল্প শুনলে আমার তা-ই মনে হয়। বিদেশে পড়াশোনা করার জন্যে বাংলাদেশ থেকে শিক্ষা-ঋণ পায় খুব কম সংখ্যক ছেলেমেয়ে। বাংলাদেশের জন্যে ফুল-ফান্ডেড স্কলারশিপের বরাদ্দও অতি-অল্প। বেশিরভাগ ছেলেমেয়েকেই পরিবারের সঞ্চয় ভেঙে, সস্তা টাকায় দামী ডলার-পাউন্ড-ইউরো কিনে বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবেদন করতে হয়। দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সুরক্ষা দিতে গিয়ে বাংলাদেশ সরকার ইউরোপ-আমেরিকার সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বাংলাদেশে নিজেদের ক্যাম্পাস খোলার অনুমতি দেয়নি—তার হয়তো সঙ্গত কারণ আছে। কিন্তু উচ্চতর, উন্নততর পড়াশোনার জন্যে আমাদের ছেলেমেয়েদের বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার বিকল্পই বা কী? দেশের ভালো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সুযোগ পাওয়া সহজ নয় এবং উচ্চতর গবেষণার সুযোগ সেখানে সীমিত। মেধা, পরিশ্রম কিংবা সম্পদের জোরে যে সব ছাত্র-ছাত্রী শেষ পর্যন্ত বিদেশে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়, তাদের আরেক সংগ্রাম শুরু হয় সেখান থেকেই। নিজের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সনদপত্র আর নম্বরপত্র সংগ্রহ করা, বিদেশে ভর্তির ফি পাঠানো, ভিসাপ্রাপ্তির অকারণ এবং দুরূহ সব শর্ত পূরণ করা—এতোগুলো বেড়া সবাই ডিঙাতে পারে না। হিমালয়সম বাধা পেরিয়ে আমাদের যেসব ছাত্রছাত্রী বিদেশে যান, তাঁদের জন্যেই বা আমরা কতটুকু করতে পারি? যে দেশে যাচ্ছেন, সে দেশের সংস্কৃতি, আচার, আইন-কানুনের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তাঁদের পক্ষে দুর্লভ। প্রায় অপ্রস্তুত অবস্থায় বিদেশে গিয়ে ‘কালচারাল-শক’ সহ্য করতে হওয়াটা প্রায় অবধারিত। দেশে পড়াশোনার মানের ঘাটতি সামলাতে গিয়ে বিদেশে এঁদের বেশিরভাগকেই নিজের পাঠ্যসূচীর বাইরে বাড়তি পড়াশোনা করতে হয়। তার ওপর আছে নিজের গৃহস্থালীর কাজ, খন্ডকালীন চাকরির জন্যে সময় ও শ্রম দিয়ে পরিবারের অর্থনৈতিক চাপ কমানো বা ঋণ শোধ করার তাগিদ। ফলে বহু ছাত্রছাত্রীকে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়, দেশে ফিরে আসতে বা অবৈধ অভিবাসীতে পরিণত হতে হয়। আত্মহত্যার মতো চরম পথও বেছে নিয়েছেন কেউ কেউ। ‘রঙিন সুরমা’ দেখতে দেখতে মনে হলো, রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কি তার প্রবাসী ছাত্র-ছাত্রীদের জন্যে আর কিছু করতে পারে? সড়ক-দুর্ঘটনার শিকার হয়ে বিদেশের হাসপাতালে ব্যয়বহুল চিকিৎসা নিতে হয় যে মেয়ে বা ছেলেটিকে, তার জন্যে আমরা রাষ্ট্রীয় বীমার ব্যবস্থা রাখতে পারি। টাকার অভাব সাময়িকভাবে পড়াশোনা স্থগিত রাখতে হচ্ছে যে মেধাবী ছাত্রটিকে, তার জন্যে আমরা ঋণ বা কাজের ব্যবস্থা করতে পারি। আমাদের কোনো ছাত্র-ছাত্রী অন্যায় বা অপরাধের শিকার হলে অন্য ছাত্র-ছাত্রীদের চাঁদা তুলে তাদের ন্যায়বিচারের ব্যবস্থা করতে হয়—বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো এই ক্ষেত্রে আইনী সহায়তা দিতে পারে, কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে। ‘রঙিন সুরমা’ আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে, বিদেশে যাওয়া প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রীর একটি সম্ভাবনাময় জীবন আছে। তাদের অনেকের বাড়িতে অপেক্ষায় আছেন একজন দায়গ্রস্ত বাবা, একজন উৎকণ্ঠিত মা। কেউ কেউ দেশে রেখে গিয়েছেন ভালোবাসার মানুষটিকে, সন্তানদের। আমরা যদি চাই রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের প্রতি তাঁদের মমত্ববোধ অটুট থাকুক, তা হলে রাষ্ট্র ও সমাজ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব আছে তাঁদের নিরাপদ ও কার্যকর ছাত্রত্ব নিশ্চিত করার। ঈর্ষা তো নয়ই, নির্বিকারত্ব-ও থাকতে পারবে না। দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে নতুন পাঠ্যক্রম, নতুন সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার লড়াই করার সময় আমাদের ছেলেমেয়েরা যেন টের পান, বাংলাদেশের ছায়া তাঁদের মাথার ওপরেই আছে। খন্দকার স্বনন শাহরিয়ার, লেখক, গবেষক। ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কিমেকারস কনসাল্টিং লিমিটেড। ১৭ আগস্ট, ২০২৬