ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে কিশোরগঞ্জ, সিলেট থেকে টাঙ্গাইল পর্যন্ত একের পর এক গানের আসর, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, কনসার্ট, নৌকাবাইচ ও ঘুড়ি উৎসবে হামলা ও বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। ঢাকার বাইরে এসব ঘটনা ঘটায় এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা জরুরি সমস্যার কারণে হয়তো অনেকের নজর এড়িয়ে যেতে পারে, কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রভাব অনস্বীকার্য।
এই ঘটনাপ্রবাহ একটি জরুরি প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে: এসব হামলার মূল উদ্দেশ্য কী? ধর্মের নামে তারা কী অর্জন করতে চায়? ধর্ম রক্ষা, নাকি সমাজের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা? এই প্রশ্নের উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে সমস্যাটিকে আমরা কীভাবে বুঝব এবং মোকাবিলা করব।
শুরুতে একটি ব্যক্তিগত স্মৃতি উল্লেখ করা যাক। আশির দশকের গোড়ার দিকে চিত্রা নদীর শিঙ্গা-শোলপুর-খড়রিয়া-রঘুনাথপুর অংশে প্রতি বর্ষার শেষে বিরাট নৌকাবাইচ উৎসব আয়োজিত হতো। লেখক তার বাবার হাত ধরে পাঁচ কিলোমিটার পথ হেঁটে সেই নৌকাবাইচ দেখতে যেতেন। তার বাবা ছিলেন ধর্মপ্রাণ মানুষ; নৌকাবাইচ এবং তার নামাজ-রোজার মধ্যে তিনি কখনো কোনো বিরোধ অনুভব করেননি।
একইভাবে, গ্রামের স্কুলের মাঠে ষাঁড়ের লড়াই ছিল একটি বার্ষিক উৎসব। যে মাঠে এই লড়াই হতো, তার ঠিক ডান পাশে ছিল মসজিদ। আসরের নামাজ শেষে মুসল্লিরাও সমান আনন্দে সেই লড়াই উপভোগ করতেন। মসজিদ আর মেলা কখনো পরস্পরের শত্রু ছিল না।
সিলেটের সোনাই নদের নৌকাবাইচও তেমনই একটি আয়োজন, যা ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে চলে আসছে। বিজয়ীর পুরস্কার একটি গরু এবং এটি রীতিমতো উৎসবের উপলক্ষ। অথচ এবার ‘তৌহিদি জনতা’র ব্যানারে সভা করে এবং ফেসবুকে সপ্তাহব্যাপী প্রচার চালিয়ে এই বাইচ বন্ধের দাবি তোলা হয়েছে।
টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে ফুল বিক্রির ‘অপরাধে’ দোকান ভাঙচুরের পর পাশের গোপালপুর উপজেলায় শিশু-কিশোরদের ঘুড়ি উৎসব বন্ধ হয়ে গেছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, টাঙ্গাইলের ঘটনা ২০২৫ সালের, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের; সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনা ২০২৬ সালের, নির্বাচিত সরকারের সময়ের। সরকার বদলালেও এই ধারা বদলায়নি। অর্থাৎ এটি কোনো একটি সরকারের সাময়িক ব্যর্থতা নয়, বরং একটি কাঠামোগত প্রক্রিয়া।
এই প্রক্রিয়া বুঝতে দুটি ধারণা কাজে লাগে। প্রথমত, সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ভেবারের সংজ্ঞা অনুযায়ী, রাষ্ট্র এমন একটি প্রতিষ্ঠান যা একটি ভূখণ্ডে ‘বৈধ বলপ্রয়োগের একচেটিয়া অধিকার’ দাবি করে। কে বাধা দেবে, কী বৈধ আর কী নয়, তার একমাত্র নিষ্পত্তিকারী রাষ্ট্র।
কিন্তু বর্তমানে কী ঘটছে? ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় খোদ পুলিশ লাইনসের ভেতরের অনুষ্ঠানেও হামলা হয়, প্রশাসন হামলাকারীদের না থামিয়ে আয়োজনটাই বন্ধ করে দেয়। সিলেটে ইউএনও দুই দশকের পুরোনো একটি উৎসব বন্ধের দাবিকে ‘স্থানীয় ইস্যু’ বলে দুই পক্ষকে নিয়ে ‘সমঝোতা’র কথা বলেন—যেন একটি প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্য টিকবে কি না, সেটিই এখন দর-কষাকষির বিষয়। অথচ যে মুহূর্তে একটি ঐতিহ্য টিকবে কি না, তা-ই আলোচ্য হয়ে ওঠে, সেই মুহূর্তেই রাষ্ট্র অর্ধেক হেরে বসে থাকে।
সবচেয়ে গভীর লক্ষণটি টাঙ্গাইলে দেখা যায়। সেখানে পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন নিজেই ফোন করে আয়োজকদের উৎসব করতে বলেছিল; তবু আয়োজকেরা নিরাপত্তার অভাবে তা বাতিল করেছেন। রাষ্ট্রের অনুমতি থাকলেও উৎসব হয় না, কারণ মবের হুমকি রাষ্ট্রের সুরক্ষার চেয়ে বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে। মব এখন আর মাঠে নামারও প্রয়োজন বোধ করে না; ভয়ই তার হয়ে কাজ করে। এ পর্যায়ে বৈধ বলপ্রয়োগের একচেটিয়া অধিকার কার্যত রাষ্ট্রের হাত থেকে সরে গেছে, আর ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত সহিংসতা রূপ নিয়েছে স্থায়ী কাঠামোর।
লক্ষণীয়, বাধাদানকারীরা কিন্তু সব সময় ধর্মের ভাষায় কথা বলেন না। সিলেটের বিরোধিতাকারীরা বলছেন—নৌকাবাইচ আসলে জুয়ার আসর, এতে নদীভাঙন হয়, রাস্তায় যানজটে রোগীর গাড়ি আটকে যায়, আগে একবার খুন হয়েছিল, একটি ‘স্বার্থান্বেষী মহল’ এর পেছনে আছে। প্রতিটি অজুহাত আলাদা করে শুনতে যুক্তিসংগত—আর এই যুক্তিসংগত মোড়কই কৌশলটির প্রাণ। প্রশাসনের নিজস্ব ভাষা (জননিরাপত্তা, নৈতিকতা, উন্নয়ন) ধার করে দাবিটি একদিকে নিজস্ব মহলের বাইরেও সমর্থন টানে, অন্যদিকে রাষ্ট্রকে ‘দুই পক্ষের বিরোধ’ বলে হাত গুটিয়ে থাকার সুযোগ দেয়। এই ‘প্রত্যাখ্যানযোগ্য যুক্তি’ থাকার কারণেই প্যাটার্নটিকে নাম দেওয়া কঠিন, আর রাষ্ট্রের পক্ষে চোখ বুজে থাকা সহজ।
তাহলে কারা এই দাবি তোলে, আর কেন? এখানে দ্বিতীয় ধারণাটি—স্বীকৃতির রাজনীতি—আংশিক উত্তর দেয়। সমাজ-গবেষকেরা দেখিয়েছেন, সামাজিক সংঘাতের গভীরে প্রায়ই থাকে স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা: মানুষ চায় সমাজ তাকে গোনায় ধরুক। এসব ঘটনা সংগঠনের সামনের সারিতে যাঁরা থাকেন, তাঁদের অনেকেই তরুণ, প্রান্তিক, এতকাল অদৃশ্য। হঠাৎ তাঁরা টের পান, একটি সভা বা একটি লিফলেটই যথেষ্ট—তাঁরাই এলাকার ‘নৈতিক অভিভাবক’, তাঁরাই প্রশাসনকে পিছু হটাতে পারেন। অন্যকে নীরব করে নিজে দৃশ্যমান হয়ে ওঠার এই ক্ষমতা প্রবলভাবে নেশা ধরানো।
তবে স্বীকৃতির গল্পই পুরোটা নয়। যাঁরা এই সাধারণ মানুষগুলোকে সংগঠিত করেন, তাঁদের হিসাব আধিপত্যের। একটি এলাকায় কী হবে, কোন সংস্কৃতি টিকবে আর কোনটা নিষিদ্ধ হবে—এই সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেওয়াই ক্ষমতা, আর সেই ক্ষমতা আমাদের দেশে কখনোই কেবল প্রতীকী থাকে না; তা গড়ায় চাঁদাবাজি, জমি দখল ও স্থানীয় অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের দিকে। এখানেই সবচেয়ে বড় ইঙ্গিত: লড়াইটা পাপ-পুণ্যের নয়, নিয়ন্ত্রণের। ফলে ধর্ম রক্ষার নামে আধিপত্য কায়েম প্রকাশ্যে এলাকা দখলের ঘোষণার চেয়ে সহজ, আর অনেক বেশি বৈধতাদায়ী।
প্রশ্ন থাকে, রাষ্ট্র তবে কেন বারবার পিছু হটে? উত্তরটি অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতির ভেতরেই। জুলাইয়ের ঐক্য ছিল অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে; সেই শত্রু বিদায় নেওয়ার পর তৈরি হয়েছে এক আধিপত্যের শূন্যতা। এই শূন্যতায় কোনো পক্ষই রাস্তায় নামানো যায় এমন একটি সংগঠিত জনগোষ্ঠীকে চটাতে চায় না। ফলে সংস্কৃতিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে সস্তা বলি। অথচ জুলাইয়ের ডাক ছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে, সব পরিচয়ের মানুষের এক অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের। যে ‘অপর’কে হটানোর তাড়নায় একদিন সবাই এক হয়েছিল, আজ সেই তাড়না ভেতরের দিকে ঘুরে গিয়ে নারী, শিল্পী, বাউল, ভিন্ন পরিচয়ের মানুষকে নতুন ‘অপর’ বানাচ্ছে।
তাহলে গোড়ার প্রশ্নে ফিরি। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধার লক্ষ্য কি ধর্ম, না আধিপত্য? উত্তর স্পষ্ট—লক্ষ্য আধিপত্য, ধর্ম রক্ষার অজুহাত কেবল সিঁড়ি। আর আজ যে সিঁড়ি সংস্কৃতির ওপর দিয়ে উঠছে, রাষ্ট্র নীরব থাকলে তার শেষ ধাপ হবে রাষ্ট্র নিজেই। চিত্রা নদীর সেই নৌকাবাইচ, মসজিদের পাশের সেই ষাঁড়ের লড়াই—আমাদের সন্তানেরা কি আর কখনো তা দেখতে পাবে? উত্তরটা নির্ভর করছে, রাষ্ট্র তার বৈধ কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনার সাহসটুকু দেখায় কি না, তার ওপর।
কাজী মারুফুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। মতামত লেখকের নিজস্ব।