যশোরের অভয়নগরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপির কোটি কোটি টাকার প্রকল্পে দুর্নীতির যে চিত্র মুক্তকণ্ঠের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই ঘটনা স্থানীয় প্রশাসনের দুর্নীতি ও জবাবদিহিহীনতাকে স্পষ্টভাবে উন্মোচন করেছে। বিশেষ করে অস্তিত্বহীন ‘সিদ্দিপাশা ভৈরব কিন্ডারগার্টেন স্কুল’-এর নামে দুই লাখ টাকা সরকারি বরাদ্দ নিয়ে পুরো অর্থ তুলে নেওয়ার ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ভুল নয়, বরং এটি সুসংগঠিত দুর্নীতিরই এক দৃষ্টান্ত। অভয়নগরের এমন অনিয়ম ও দুর্নীতি সবাইকে হতবাক করেছে।

প্রশ্ন উঠেছে, যে স্কুলের বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই, সেখানে উপজেলা শিক্ষা কার্যালয় কিংবা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) কীভাবে আর্থিক বরাদ্দ অনুমোদন করল? ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর তা ধামাচাপা দিতে আসল প্রতিষ্ঠানের নাম বদলে অন্য একটি বেসরকারি স্কুলে গিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে কিংবা লোভ দেখিয়ে ভুয়া প্রত্যয়নপত্র নেওয়ার যে মরিয়া চেষ্টা চালানো হয়েছে, তা মূলত অনিয়ম ঢাকারই কৌশল।

অভয়নগরের এই দুর্নীতি কেবল অস্তিত্বহীন স্কুলেই সীমাবদ্ধ নেই। ৮০ হাজার টাকা ব্যয়ে পুরোনো রাস্তার নতুন কাজ দেখানো, নির্মিত না হওয়া ইউড্রেনের বিল তুলে নেওয়া এবং দরিদ্রদের জন্য বরাদ্দকৃত অগভীর নলকূপ জনপ্রতিনিধির স্বজন ও কাল্পনিক ব্যক্তির নামে বণ্টন করার মতো ঘটনাও ঘটেছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) দরপত্রহীন ছোটখাটো কাজের সুযোগ নিয়ে কীভাবে অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করা হয়েছে, স্থানীয়ভাবে তার নিখুঁত উদাহরণ হলো এই ঘটনাগুলো।

এমতাবস্থায়, অভয়নগর উপজেলার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রতিটি পিআইসি প্রকল্পের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত করা প্রয়োজন। এসব অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িত জনপ্রতিনিধি, এলজিইডির সংশ্লিষ্ট উপসহকারী প্রকৌশলী এবং অনুমোদনকারী কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। দরপত্র ছাড়া পরিচালিত পিআইসি প্রকল্পগুলো যেন গোপনে বা কেবল ইউপি চেয়ারম্যান-সদস্যদের পকেটে বন্দী না থাকে, সেজন্য প্রকাশ্যে গণশুনানি ও স্থানীয় অধিবাসীদের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রকল্প গ্রহণের আগেই এর সুনির্দিষ্ট জিপিএস লোকেশন এবং বিস্তারিত বাজেট সর্বসাধারণের জন্য অনলাইনে উন্মুক্ত করা জরুরি, যাতে যেকোনো নাগরিক তা তদারক করতে পারেন।

উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাদের পকেট ভরার হাতিয়ার হতে পারে না। অভয়নগরের এই পুকুরচুরি প্রমাণ করে, নজরদারির অভাব থাকলে সরকারি অর্থ কীভাবে হাওয়া হয়ে যায়। শুধু অভয়নগরেই নয়, দেশের অন্যান্য উপজেলায়ও এডিপির অধীনে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে যাবতীয় অনিয়ম ঠেকাতে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। গোটা দেশের সব উপজেলায় এমন সব অনিয়ম একত্র করলে তা সাগরচুরির চেয়েও কম হবে না। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কঠোর হবে, এটিই কাম্য।