শরীয়তপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে তিন সাংবাদিককে মারধর ও লাঞ্ছিত করার অভিযোগ উঠেছে জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আরিফুজ্জামান মোল্লা, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আমান মাদবরসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে। এসময় এক সাংবাদিকের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে ধারণ করা ভিডিও মুছে ফেলার অভিযোগও উঠেছে। ঘটনার পর সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকাল ১০টার দিকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
হামলার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে যুবদলের সাবেক নেতা আরিফুজ্জামান মোল্লা উত্তেজিতভাবে বলেন, “অনেকেই লিস্টে আছে, সন্ধ্যার পর খবর পেয়ে যাবে। তুমি নিজেও তৈরি থাকো। তোমরা লিখবা আর আমরা তোমাদের পেটাবো।”
হামলার শিকার সাংবাদিকরা হলেন— নিউজ টুয়েন্টিফোর, জাগো নিউজ ও খবরের কাগজের শরীয়তপুর প্রতিনিধি বিধান মজুমদার অনি, দ্য ডেইলি স্টারের শরীয়তপুর ও মাদারীপুর প্রতিনিধি জাহিদ হাসান রনি এবং দৈনিক এদিনের শরীয়তপুর প্রতিনিধি বরকত উল্লাহ। পরে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তারা প্রাথমিক চিকিৎসা নেন।
ভুক্তভোগী সাংবাদিক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সম্প্রতি জেলা প্রশাসন শরীয়তপুর প্রেসক্লাবকে লিখিত নোটিশ না দিয়ে প্রেসক্লাবের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে দেয়। এর প্রতিবাদে রোববার দুপুরে প্রেসক্লাবের সাংবাদিকরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন।
এর জেরে মঙ্গলবার সকালে জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে ‘মব সৃষ্টিকারী’ অভিযোগ তুলে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেও বিক্ষোভ মিছিল করেন বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতাকর্মী। ওই কর্মসূচির সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, প্রথমে সংবাদ সংগ্রহের সময় বিধান মজুমদার অনির ওপর হামলা করা হয়। জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আমান মাদবরসহ কয়েকজন তাকে মারধর করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। কিছুক্ষণ পর একই স্থানে সংবাদ সংগ্রহের সময় জাহিদ হাসান রনি ও বরকত উল্লাহকে মারধর করেন জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আরিফুজ্জামান মোল্লাসহ কয়েকজন। এসময় জাহিদ হাসান রনির পরিচয়পত্র ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া এবং ধারণ করা ফুটেজ মুছে ফেলতে বাধ্য করার অভিযোগও ওঠে।
বিধান মজুমদার অনি বলেন, “পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে আমার ওপর অতর্কিতভাবে হামলা চালানো হয়। একপর্যায়ে কয়েকজনের সহযোগিতায় কোনোমতে ঘটনাস্থল থেকে সরে আসি। আমি এ ঘটনার বিচার চাই।”
জাহিদ হাসান রনি বলেন, “জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আরিফ মোল্লাসহ বেশ কয়েকজন আমাকে মারধর করেন। পরে আমার পরিচয়পত্র ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে ফুটেজ ডিলিট করতে বাধ্য করা হয়।”
বরকত উল্লাহ বলেন, “জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আরিফ মোল্লা আমাকে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘ও সাংবাদিক, ওকে ধর’। এরপর তার নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবক দলের আমান মাদবরসহ কয়েকজন সংঘবদ্ধভাবে আমার ওপর হামলা চালায়। তারা আমাকে কিল, ঘুসি ও লাথি মারে। একপর্যায়ে স্থানীয় লোকজন আমাকে উদ্ধার করে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়।”
তিনি আরও বলেন, “হামলার সময় আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। বর্তমানে আমি নিরাপত্তাহীনতায় ও শঙ্কার মধ্যে রয়েছি। একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় আমাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও হেনস্তা করা হয়েছে এবং সংবাদ সংগ্রহে বাধা দেওয়া হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।”
অভিযোগের বিষয়ে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আমান মাদবর মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “এক ব্যক্তিকে দেখেছি কয়েকজনকে ধাক্কাধাক্কি করতে। আমরা জানতাম না তিনি সাংবাদিক। এর বেশি কিছু বলতে পারব না।”
শরীয়তপুর জেলা বিএনপির সহসভাপতি শাহ মোহাম্মদ আব্দুস সালাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সাংবাদিকেরা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করেছেন। তারা এভাবে তার প্রত্যাহার চাইতে পারেন না। সাংবাদিকতার আড়ালে কিছু সন্ত্রাসী ও ফ্যাসিবাদের দোসর বিএনপি সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য এমন কাজ করেছেন। এ কারণে আমরা প্রতিবাদ সমাবেশ করেছি। সেখানে কোনো সাংবাদিক নিগৃহীত বা মারধরের শিকার হয়েছেন কি না, তা আমার জানা নেই।”
সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছে শরীয়তপুর জেলা প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন।
শরীয়তপুর জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি আবুল হোসেন সরদার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। এ ঘটনায় শরীয়তপুর জেলা প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে বিচারের দাবি জানাচ্ছি।”
এ বিষয়ে শরীয়তপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) তানভীর হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “গণমাধ্যমকর্মীদের মাধ্যমে বিষয়টি ইতোমধ্যে জানতে পেরেছি। এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”