মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ঋণের ফাঁদ যেভাবে বিস্তার লাভ করছে, তাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে নাগরিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিপুল অঙ্কের টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বাংলাদেশের আইনে অনুমোদনহীন ঋণ বিতরণ নিষিদ্ধ হলেও সাধারণ মানুষের জরুরি ও সহজ ঋণের চাহিদাকে পুঁজি করেই সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিভিন্ন অ্যাপ। মুক্তকণ্ঠের অনুসন্ধানে ঋণভিত্তিক প্রতারণার সঙ্গে জড়িত সক্রিয় অন্তত ৩০টি অবৈধ অ্যাপের সন্ধান পাওয়া গেছে।
দেশের নাগরিকদের মধ্যে ডিজিটাল সাক্ষরতার হার অত্যন্ত কম। পাশাপাশি ডিজিটাল অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সক্ষমতা এবং কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি রয়েছে। এর ফলে নাগরিকের তথ্য ফাঁস, ডার্কওয়েবে জীবনবৃত্তান্ত বিক্রি, অনলাইন জুয়া, অনুমোদনহীন মুদ্রা লেনদেন বা ফরেক্স ট্রেডিং এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের মতো অপরাধগুলো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
বাংলাদেশে বৈধভাবে ঋণ প্রদান করে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ক্ষুদ্রঋণ বিতরণকারী সংস্থাগুলো। অবৈধ অ্যাপের মাধ্যমে এই প্রতারণা বাংলাদেশে নতুন হলেও ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় এটি ইতিমধ্যে ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। এসব দেশে ঋণের ফাঁদে পড়ে নাগরিকেরা সর্বস্বান্ত হয়েছেন, এমনকি আত্মহত্যার মতো দুঃখজনক ঘটনাও ঘটেছে।
মুক্তকণ্ঠের প্রতিবেদনে ঋণ নেওয়া কয়েকজন ভুক্তভোগীর বিবরণ থেকে স্পষ্ট যে, তাঁরা বড় ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। কেউ ৬ হাজার টাকার ঋণের বিপরীতে এক মাসের মধ্যে ১০ হাজার টাকা শোধ করতে বাধ্য হয়েছেন, আবার কেউ ২৪ হাজার টাকা ঋণের বদলে ৫৪ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই অ্যাপগুলো ফোনে ইনস্টল করলে কন্টাক্ট নম্বর, ছবি ও ভিডিওসহ সব ব্যক্তিগত তথ্য অ্যাপ পরিচালনাকারীদের হাতে চলে যায়। এছাড়া আবেদনের সময় জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি ও আর্থিক সেবা নম্বর দিতে হয়। পরবর্তীতে এই তথ্যগুলোই প্রতারণার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ঋণের বিপরীতে কয়েক গুণ অর্থ দাবি করে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস এবং আত্মীয়স্বজনের নম্বরে ফোন দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
ডিজিটাল আর্থিক প্রতারণা বর্তমানে বিশ্বব্যাপী একটি বড় সমস্যা। গত এপ্রিলে মার্কিন বিচার বিভাগের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, কম্বোডিয়া, লাওস ও মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকা এখন অনলাইন প্রতারক চক্রের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে সক্রিয় ঋণ অ্যাপগুলোর কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানা বা কার্যালয় নেই। এগুলো দেশি নাকি বিদেশি চক্র দ্বারা পরিচালিত, তা নিয়ে ধোঁয়াশা থাকায় বিপুল অর্থ পাচারের শঙ্কা রয়েছে।
ফেসবুক বিজ্ঞাপন ও গুগল প্লে স্টোরে এসব অ্যাপের উপস্থিতি রয়েছে এবং তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এগুলো কয়েক লাখ বার ডাউনলোড হয়েছে। এত বড় ধরনের প্রতারণা ও অর্থ পাচারের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, অ্যাপে অবৈধ ঋণদানের বিষয়টি তাদের জানা নেই। এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ডিজিটাল অপরাধের বিষয়ে এখনো যথেষ্ট সচেতন নয়।
সম্প্রতি ভারত অবৈধ ঋণ প্রদানকারী অ্যাপের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। আমাদের মনে হয়, বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর উচিত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। ডিজিটাল প্রতারণার এই ভয়ংকর ফাঁদ থেকে নাগরিকদের রক্ষা করতে এবং তাঁদের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে জরুরি উদ্যোগ নিতে হবে।