রাজধানীর মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার ব্যস্ত ফুটপাতে আখের পসরা সাজিয়ে বসেন ৭৩ বছর বয়সী হামিদ হাওলাদার। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে এলেও বেঁচে থাকার তাগিদে প্রতিদিন ঘাম ঝরাতে হয় তাকে। ধারালো ছুরি দিয়ে আখ কাটার সময় কখনো হাত কেটে রক্ত ঝরলেও থামার সুযোগ নেই তার, কারণ এই আয়ের ওপরই নির্ভরশীল তার সংসার।
মুক্তকণ্ঠের প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, ১৯৮৩ সালে প্রায় ৪৪ বছর আগে জীবিকার সন্ধানে বরিশাল থেকে ঢাকায় আসেন তিনি। দীর্ঘ সময়ে শাকসবজি বিক্রি ও অন্যান্য পরিশ্রমের কাজ করে জীবন কাটিয়েছেন। তবে বয়সের চেয়েও তাকে বেশি কষ্ট দেয় আপনজনদের অবহেলা। যাদের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের সোনালি সময় বিলিয়ে দিয়েছেন, সেই সন্তানরাই আজ তার পাশে নেই।
পৈত্রিক সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘশ্বাস বয়ে বেড়াচ্ছেন হামিদ হাওলাদার। বরিশালে প্রায় দুই কোটি টাকার সম্পদ থাকা সত্ত্বেও আজ তিনি পথের মানুষ। তার অভিযোগ, ভাই ও প্রতিবেশীরা জালিয়াতির মাধ্যমে তার শেষ সম্বলটুকু জবরদখল করে নিয়েছে। জমির আসল কাগজপত্র সাথে থাকা সত্ত্বেও চোখের সামনে সম্পত্তি অন্যের দখলে চলে যাওয়া কেবল তাকিয়ে দেখেই কাটাতে হয়েছে তাকে।
জীবনের শেষপ্রান্তে এসে তাকে এখন দ্বিমুখী লড়াই লড়তে হচ্ছে। একদিকে নিজের অধিকার ফিরে পাওয়ার আইনি ও মানসিক সংগ্রাম, অন্যদিকে পেটের ভাত জোগাতে ফুটপাতে কঠোর পরিশ্রম। মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার ফুটপাতে আখ বিক্রি করে তার দৈনিক আয় বড়জোর দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। এই সামান্য আয়েই চলে তার জীবন।
বার্ধক্যের এই পড়ন্ত বেলায় আপনজনদের পরিবর্তে সঙ্গী হয়েছে ফুটপাতের রোদ-বৃষ্টি। মাথার ওপর ছাদ বা পাশে আপন কারো উপস্থিতি এখন তার কাছে গৌণ, সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিদিনের দুমুঠো ভাতের অনিশ্চিত চিন্তা। হামিদ হাওলাদারের এই জীবনসংগ্রাম আমাদের সমাজব্যবস্থার এক নিষ্ঠুর প্রতিচ্ছবি, যেখানে সন্তান থাকা সত্ত্বেও অনেক বাবা-মা শেষ বয়সে চরম নিঃসঙ্গতার শিকার হন।