‘পেঁয়াজের রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত ফরিদপুরের সালথা উপজেলার কৃষকরা এবার বাম্পার ফলন সত্ত্বেও চরম সংকটে পড়েছেন। বাজারে পেঁয়াজের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় মাচাতেই পচছে ফসল। উৎপাদন খরচের চেয়ে বাজারদর অনেক কম হওয়ায় লোকসানে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক কৃষক। অন্যদিকে, দাম বাড়ার আশায় যারা ফসল জমিয়ে রেখেছেন, তাদের একটি বড় অংশ পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

কৃষকদের অভিযোগ, প্রতি মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা। তবে বর্তমানে বাজারে এর দাম মাত্র ৮০০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা। লোকসানের চাপ সইতে না পেরে অনেক কৃষক পেঁয়াজ পানিতে ফেলে দিচ্ছেন। অনেকের মাচায় রাখা ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পেঁয়াজ ইতোমধ্যে পচে গেছে, যা পুরো ফসলের বড় অংশকে নষ্ট করে দিচ্ছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, সালথা উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে প্রায় ৫০ হাজার কৃষক রয়েছেন। মোট আবাদি জমি প্রায় ১৫ হাজার হেক্টরের মধ্যে ৯০০ থেকে ৯৫ শতাংশ জমিতে ৩০ হাজারের বেশি কৃষক পেঁয়াজ চাষ করেন। চলতি মৌসুমে ১১ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ১১ হাজার ৫০০ হেক্টরে চাষ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২০০ হেক্টরে মুড়িকাটা এবং ৫০ হেক্টরে বীজ পেঁয়াজ চাষ করা হয়েছে।

আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হলেও বাজারদর কৃষকদের হতাশ করেছে। সম্প্রতি সালথা সদর বাজার, নকুলহাটি, ঠেনঠেনিয়া, মোন্তারমোড়, ফুলবাড়িয়া, মাঝারদিয়া, সোনাপুর ও বালিয়া বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি মণ পেঁয়াজ ৮০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মানভেদে দাম কিছুটা কম-বেশি হলেও তা উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক নিচে।

কৃষক রকিবুল ইসলাম জানান, "মৌসুমের শুরুতে পেঁয়াজ বিক্রি না করে তারা মাচায় তুলে রাখেন, যেন পরে দাম বাড়লে লোকসান পোষানো যায়। কিন্তু এবার দীর্ঘ দিন মাচায় রাখার ফলে পেঁয়াজে পচন ধরছে, ফলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ছে।"

আক্ষেপ করে কৃষক ফারহান মোল্ল্যা বলেন, "মাঠে পেঁয়াজ ফলিয়ে মনে হয়েছিল এবার ভালো দাম পাব। কিন্তু বাজারে এসে দেখি উৎপাদন খরচই উঠছে না। মাচায় রাখলে পচে যাচ্ছে, আর বিক্রি করতে গেলে দাম নেই। আমরা এখন কোথায় যাব?"

সালথা সদর বাজারের ব্যবসায়ী মো. মাসুম সরদার জানান, "বাজারে সরবরাহ বেশি কিন্তু মোকামে চাহিদা কম থাকায় দাম কমে গেছে। আজ ৭০০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা পর্যন্ত পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে। তবে ছোট আকারের পেঁয়াজের দাম ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।" তিনি আশা করেন, আগামী মাসের শুরুতে বাজার কিছুটা বাড়তে পারে।

কৃষকদের দাবি, শুধু উৎপাদন বাড়ানো যথেষ্ট নয়, ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে প্রতি বছর তাদের বড় ক্ষতি সইতে হয়। তাই মাঠপর্যায়ে ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা, কৃষি প্রণোদনা বাড়ানো, দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণাগার নির্মাণ এবং দেশীয় কৃষকের স্বার্থে আমদানির বিষয়ে সতর্ক থাকার দাবি জানিয়েছেন তারা।

সালথা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আহসানুল হাবিব আল আজাদ জনি জানান, চলতি বছর কৃষি প্রণোদনার আওতায় ৮০০ কৃষককে বিনামূল্যে বীজ ও সার দেওয়া হয়েছে। কৃষকদের অসন্তোষের কথা স্বীকার করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, দ্রুতই তারা ন্যায্য মূল্য পাবেন। পাশাপাশি সংরক্ষণাগার নির্মাণ ও প্রণোদনা বাড়ানোর বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে বলে জানান তিনি।