রাজশাহীতে আলু সংরক্ষণের হিমাগার ভাড়া যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ না হলে আলোচনা, আন্দোলন এবং আইনি লড়াই—এই তিন পথেই এগোনোর ঘোষণা দিয়েছেন আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা। আগামীকাল মঙ্গলবারের পর প্রতি কেজি আলুর সংরক্ষণ ভাড়া ৫ টাকা ২০ পয়সার বেশি আদায়ের চেষ্টা করা হলে তা প্রতিহত করার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তারা।
ব্যবসায়ীদের দাবি, বর্তমানে রাজশাহীর বিভিন্ন হিমাগারে প্রতি কেজি আলু সংরক্ষণে সর্বোচ্চ ৬ টাকা ৭৫ পয়সা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) বেলা ১১টার দিকে রাজশাহীর পবা উপজেলার তকিপুরে জেলা আলু ও কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানানো হয়। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম লিখিত বক্তব্য প্রদান করেন। এ সময় সমিতির সভাপতি আহাদ আলী শাহসহ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও আলুচাষিরা উপস্থিত ছিলেন।
ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, "রাজশাহী জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি আলু সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বস্তাপ্রতি প্রথম পাঁচ কেজি বাদ দিয়ে অবশিষ্ট আলুর জন্য প্রতি কেজিতে ৫ টাকা ভাড়া নির্ধারণের সুপারিশ করেছে।" স্থানীয় উৎপাদন ও হিমাগার পরিচালনার বাস্তব ব্যয় বিবেচনায় এই হারকে তারা যৌক্তিক মনে করছেন।
তিনি আরও জানান, দেশের ২৬টি আলু উৎপাদনকারী জেলার সুপারিশ পর্যালোচনা করে জাতীয় পর্যায়ে গড় সংরক্ষণ ভাড়া ৫ টাকা ২০ পয়সা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। রাজশাহীর জেলা কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ভাড়া হওয়ার কথা ছিল প্রায় ৪ টাকা ৬০ পয়সা। তবে জাতীয় স্বার্থে ৫ টাকা ২০ পয়সা পর্যন্ত ভাড়া মেনে নিতে প্রস্তুত চাষি ও ব্যবসায়ীরা। এর বেশি কোনো ভাড়া তারা গ্রহণ করবেন না।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক জানান, মঙ্গলবার ঢাকার খামারবাড়িতে জাতীয় পর্যায়ের ভাড়া নির্ধারণ কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে চাষি ও ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত না এলে রাজশাহীর জেলা কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৫ টাকা ভাড়া কার্যকরের দাবি জানানো হবে।
জাতীয় পর্যায়ের ভাড়া নির্ধারণ কমিটিতে রাজশাহী ও রংপুরের কোনো প্রতিনিধি না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন ইফতেখারুল ইসলাম। তার দাবি, দেশের মোট আলু উৎপাদনের প্রায় ৭০ শতাংশ আসে রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চল থেকে। অথচ এই দুই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব ছাড়া ভাড়া নির্ধারণ করা হলে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হবে না।
হিমাগারে আলু নষ্ট হওয়ার জন্য কেবল বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতিকে দায়ী করার বিষয়েও আপত্তি জানান তিনি। তার ভাষ্য, বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি হিমাগার ব্যবস্থাপনার নানা দুর্বলতার কারণেও আলু নষ্ট হচ্ছে। নির্ধারিত ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত আলু সংরক্ষণ, ওঠানো-নামানোর সময় বস্তায় আঘাত এবং দীর্ঘ সময় পরপর আলু ‘পালট’ না দেওয়াকে আলু নষ্ট হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, "বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা ছিল, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ফলে আলু নষ্ট হওয়ার পুরো দায় বিদ্যুৎ সংকটের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। হিমাগার ব্যবস্থাপনার ত্রুটিগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।"
তিনি আরও বলেন, "আমরা অনেক দিন ধৈর্য ধরেছি। এখন আলু সংরক্ষণের মৌসুম প্রায় শেষের দিকে। দ্রুত একটি যৌক্তিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। তা না হলে আলোচনা, আন্দোলন ও আইনি লড়াই—সব পথই একসঙ্গে চালানো হবে।"
হিমাগার মালিকদের উদ্দেশে তিনি সতর্ক করে বলেন, "মঙ্গলবারের পর ৫ টাকার বেশি ভাড়া আদায়ের চেষ্টা করা হলে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন। এ নিয়ে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হলে এর দায় হিমাগার মালিকদের নিতে হবে।"
তবে জাতীয় পর্যায়ে ৫ টাকা ২০ পয়সা ভাড়া নির্ধারণ করা হলে বৃহত্তর স্বার্থে সেই হার মেনে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা।