পিরোজপুর জেলার অর্ধেকের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রম ও পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অধিকাংশ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, যা শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, পিরোজপুরের সাত উপজেলায় মোট ৯৮৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ৯৮৯টি হলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৪২৪ জন। ফলে ৫৬৫টি পদ শূন্য রয়েছে। এছাড়া সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত ৪ হাজার ৯৬০টি পদের মধ্যে ৪৯৬টি পদ শূন্য।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জেলার ৯৮৯টি বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ৯৩ হাজার ৯৪১ জন। তাদের জন্য শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকের মোট পদ ৫ হাজার ৯৪৯টি, যার বিপরীতে কর্মরত আছেন ৪ হাজার ৮৯২ জন। অর্থাৎ মোট ১ হাজার ৫৭টি পদ শূন্য। এর মধ্যে ১ হাজার ৬৩ জন শিক্ষক না থাকায় স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে, অনুপস্থিতির কারণে বিভাগীয় মামলা রুজু হওয়ায় ১১ জন শিক্ষকের বেতন বন্ধ রয়েছে।

শিক্ষক সংকটের প্রভাব নিয়ে মধ্য পিরোজপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শাহিন সুলতানা বলেন, "শিক্ষক সংকটের জন্য আমাদের তো সমস্যা হচ্ছেই, সঙ্গে শিশুদেরও সমস্যা হচ্ছে। আমার ক্লাস শুরু হয় সাড়ে ৯টায় এবং শেষ হয় ১২টায়। কিন্তু দেখা যায়, এর মধ্যে তৃতীয় শ্রেণির প্রথম পিরিয়ডটাও আমাকে নিতে হয়। এই অল্প সময়ের মধ্যে বিভিন্ন ক্লাস নিতে গেলে সঠিকভাবে শিক্ষা দেওয়া যাচ্ছে না।"

মাছিমপুর-২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সালমা সুলতানা বলেন, "আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক নেই। সেক্ষেত্রে সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে একজনকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাকে অফিসের কাজের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষের কাজও করতে হয়। এতে তার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। আমাদেরও কিছু অতিরিক্ত কাজ করতে হয়। এ নিয়ে আমরা সমস্যার মধ্যে আছি।"

একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আকিকুন নেসা বলেন, "আমাদের বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। এখানে সহকারী শিক্ষক আছেন ছয়জন। তাদের মধ্য থেকে একজন প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে আছেন। আমাদের যে কাজগুলো করার কথা, সেগুলোর পাশাপাশি প্রধান শিক্ষকের কাজও তাকে করতে হয়। প্রশাসনিক কাজের জন্য তাকে বেশির ভাগ সময় বাইরে থাকতে হয়। তখন তার যে ক্লাসগুলো আছে, সেগুলো আমাদেরই নিতে হয়। আমরা দাবি করছি, খুব অল্প সময়ের মধ্যে যেন একজন প্রধান শিক্ষক পাই।"

মধ্য পিরোজপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুলতানা মমতাজ বলেন, "আমার বিদ্যালয়ে প্রতিদিন ছয়টি ক্লাস। এসব ক্লাস শেষ করে প্রশাসনিক কাজ করতে অনেক সমস্যা হয়। সে ক্ষেত্রে শিশুদের যেভাবে গুণগত মান উন্নয়ন করা দরকার, সেভাবে করা যাচ্ছে না। যদি শিক্ষকদের শূন্য পদগুলো পূরণ হয়, তাহলে আমরা আরও বেশি করে শিশুদের লেখাপড়ার মান উন্নয়ন করতে পারব।"

মাছিমপুর-২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোছা. আসমা জাহান বলেন, "দুজনের কাজ একা করতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। জরুরি ভিত্তিতে আমাদের স্কুলে প্রধান শিক্ষক প্রয়োজন। এতে বিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রমের গতি বাড়বে।"

পিরোজপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোল্লা বক্তিয়ার রহমান জানান, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ২৫৮টি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, "জেলায় মোট ৯৮৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। এসব বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে ৫৬৫টি। সরকারি যে নীতিমালা আছে, তার আলোকে ২৫৮টি প্রধান শিক্ষকের পদে সহকারী শিক্ষক থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এছাড়া সহকারী শিক্ষকের পদ ৪ হাজার ৯৬০টি। এর মধ্যে শূন্য রয়েছে ৪৯৬টি পদ। শূন্য পদগুলো থাকার কারণে আমাদের পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। তারপরও কর্মরত শিক্ষকদের মাধ্যমে পাঠদান অব্যাহত রেখেছি।"

তিনি আরও জানান, গত মাসে অনুষ্ঠিত নিয়োগ পরীক্ষায় ২৪৫ জন শিক্ষক পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। বর্তমানে তাদের পুলিশ ভেরিফিকেশন ও এনএসআই কার্যক্রম চলছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শিক্ষাবিদদের মতে, দীর্ঘদিনের এই শিক্ষক সংকট দ্রুত সমাধান না হলে দুর্বল শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং পুরো শিক্ষাব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।