পরিবেশদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে ‘সবুজ সোনা’ খ্যাত বাঁশের বহুমুখী ব্যবহার সারা বিশ্বেই জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী ও অপচনশীল প্লাস্টিক যেখানে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে, সেখানে পচনশীল, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বাঁশ হয়ে উঠছে অন্যতম প্রধান বিকল্প।
রাঙামাটিতে সাম্প্রতিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং ‘বারেং শেয়ার্ড মার্কেট’ চালুর উদ্যোগ পাহাড়ি এলাকার হাজারো কারিগরের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে।
একসময় বাঁশের ব্যবহার কেবল ঘরবাড়ি নির্মাণ কিংবা গৃহস্থালি কাজে ঝুঁড়ি-ঝাঁকা তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে আধুনিক নকশা ও প্রযুক্তির স্পর্শে বাঁশের ব্যবহারে এসেছে আমূল পরিবর্তন। সহজলভ্যতার কারণে মানুষের কাছে প্লাস্টিকপণ্যের জনপ্রিয়তা বাড়ায় বাঁশের বহুমুখী ব্যবহার অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছিল। তবে প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে নতুন করে বাঁশজাত পণ্যের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে পাহাড়ের মানুষের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে।
বাঁশ দিয়ে তৈরি হাতব্যাগ, ল্যাম্পশেড, গয়না ও শোপিস আধুনিক তরুণ প্রজন্মের নজর কাড়ছে। টিস্যু বক্স, পেনস্ট্যান্ড, ট্রে এবং পরিবেশবান্ধব ফাইল-ফোল্ডার হিসেবে প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে বাঁশ এখন বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে। এ ছাড়া গৃহস্থালির প্লাস্টিকের পাত্র, টেবিলম্যাট, বাটি ও চামচের জায়গায় এখন স্থান করে নিচ্ছে বাঁশের তৈরি আকর্ষণীয় পণ্য।
পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী বাঁশশিল্পকে বাণিজ্যিক রূপ দিতে কাজ করছে বিভিন্ন এনজিও সংস্থা। তারা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করছে।
প্রশিক্ষণার্থী অমর বিকাশ চাকমা বলেন, আগে বাসায় নিজেদের ব্যবহারের জন্য কিছু পণ্য তৈরি করা হতো। প্লাস্টিক বের হওয়ার পর সেটিও কমে আসে। তবে প্রশিক্ষণ নিয়ে নতুন নতুন ডিজাইনের বাঁশের পণ্য তৈরির কৌশল শিখেছি। যা বাণিজ্যিকভাবে কাজে আসবে বলে আশা করছি।
আরেক প্রশিক্ষণার্থী মঙ্গল কুমার চাকমা বলেন, বাঁশজাত পণ্যের কাঁচামাল পাহাড়ে অনেক রয়েছে। তাই পণ্য তৈরিতে কাঁচামালের সংকট হবে না। এসব পণ্য তৈরির চেয়ে বড় সমস্যা বিক্রি করা। আশিকা ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েটস আমাদের জন্য ‘বারেং’ নামে একটি দোকান খুলে রেখেছে।
‘বারেং’-এ পণ্য বিক্রির সঙ্গে যুক্ত নমিতা চাকমা বলেন, যারা পণ্য তৈরি করবেন, এই বাজারের মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে এবং কারিগরেরা তাদের পণ্যের ন্যায্য মূল্য সরাসরি হাতে পাবেন। তাতে পণ্য তৈরিতে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়বে।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আশিকা ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েটসের নির্বাহী পরিচালক বিল্পব চাকমা বলেন, প্লাস্টিকপণ্য ব্যবহারে পরিবেশের চরম ক্ষতি হচ্ছে। এই ক্ষতি কমিয়ে আনতে এবং বাঁশের বহুমুখী ব্যবহার বাড়িয়ে স্থানীয়দের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতেই আমাদের এই প্রশিক্ষণ। এতে এখন পর্যন্ত ২০০ জন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তারা প্রত্যেকেই ২০ প্রকার ডিজাইনের বিভিন্ন ধরনের বাঁশের পণ্য তৈরির কাজ শিখেছেন। পাহাড়ের প্রান্তিক নারী-পুরুষ কারিগরদের আর্থিক স্বাবলম্বিতা বৃদ্ধিতে এই উদ্যোগ অনন্য ভূমিকা রাখছে।
তিনি আরও বলেন, দেশীয় বাজারে বাঁশের তৈরি পণ্যের বেশ চাহিদা রয়েছে। প্লাস্টিক বর্জন করে বাঁশজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো গেলে শুধু পরিবেশ রক্ষা পাবে না, বরং পার্বত্য অঞ্চলের প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের হাত ধরে সমৃদ্ধ হবে দেশের সার্বিক অর্থনীতি।
সম্প্রতি বাঁশের বহুমুখী ব্যবহার দেখতে রাঙামাটিতে আসেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের সচিব মো. দাউদ মিয়া।
তিনি বলেন, বাঁশের তৈরি নানা পণ্য দেখলাম। পরিবেশ ধ্বংসকারী প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ করে পরিবেশবান্ধব বাঁশের নানা পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি করা গেলে নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষা পাবে।